নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুসরণের নির্দেশ হাইকোর্টের

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে, কেন হয়নি তা জানিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধানটি ১৬ বছরেও পালন হয়নি। তাই আইনটির ৩১(ক) যথাযথভাবে অনুসরণ করতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাকে (পুলিশ) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, এ বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন করা না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি জে বি এম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন।
আইনের ২০ ধারা অনুসারে, বিচারের জন্য পাওয়ার তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচারকার্য সমাপ্ত করবেন। এই আইনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় হওয়া এক মামলা নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হওয়ায় আপিল করে মিলাদ হোসেন নামের এক আসামি জামিন চান।
জামিন আবেদনের শুনানিকালে গত ১ নভেম্বর হাইকোর্ট নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে জবাবদিহি-সংক্রান্ত আইনটির ৩১ (ক) ধারার কোনো প্রয়োগ আছে কি না, তা জানিয়ে আইনসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রতিবেদন দাখিলের পর আদেশ দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আদালত বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের পর বিধানটি প্রতিপালন করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের প্রতি সার্কুলার জারি করেছেন, আইন মন্ত্রণালয় পিপিদের চিঠি দিয়েছেন। তখন মিলাদের আইনজীবী কুমার দেবুল দে বলেন, গত ১৬ বছরেও আইনের ধারাটি বাস্তবায়ন হয়নি। একপর্যায়ে আদালত বলেন, ‘আপনারাও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চান না। এ জন্য সকলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার।’ শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট জামিন না দিয়ে আপিলকারীর (মিলাদ হোসেন) বিরুদ্ধে থাকা মামলাটি ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শহীদুল ইসলাম খান।
আদালত বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ (ক) ধারা অনুসরণ করা হলে এ আইনে হওয়া অর্ধেক মামলা এক বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি সম্ভব। আইনানুযায়ী কারোরই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। আইনে বিচারক, পিপি ও তদন্তকারী কর্মকর্তার জবাবদিহির বিধান রয়েছে।
রেজিস্ট্রার জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সালের আইনে হওয়া মামলা সংশ্লিষ্ট আইনের ২০(৩) ধারায় উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ট্রাইব্যুনাল মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ লিপিবদ্ধ করে সুপ্রিম কোর্টের কাছে সংশ্লিষ্ট আইনের ৩১ (ক) ধারা অনুসারে প্রতিবেদন দাখিল করেন না অথবা এরূপ প্রতিবেদনের অনুলিপি সরকারের কাছে পাঠানো হয় না। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটরসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এরূপ কোনো প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করেন না অথবা এর অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টে পাঠান না।
আর মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ (ক) উল্লিখিত সময়ের (১৮০ দিন) মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল থেকে কারণ লিপিবদ্ধ করত কোনো প্রতিবেদনের অনুলিপি সরকারের কাছে পাঠানো হয় না। সংশ্লিষ্ট পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এবং পুলিশ কর্মকর্তাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন সরকারের কাছে দেন না। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ সরকারের কাছে এখনো উত্থাপিতও হয়নি। সে কারণে সরকারের পক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে সারা দেশে মোট ৫৪টি পূর্ণাঙ্গ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এ ছাড়া ১৮টি জেলার জেলা ও দায়রা জজ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। ৩১ (ক) ধারা আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশ প্রদান করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে নিয়োজিত বিচারকদের নির্দেশনা প্রদান করে সার্কুলার জারি করা হয়েছে। আইনসচিবের প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটি প্রতিপালনের লক্ষ্যে দেশের সব নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে নিয়োজিত পিপিদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।