২০ বছরে ৫০ বার রক্তদান রোকসানার
‘দেশের জন্য লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন। আর আমি মানুষকে বাঁচাতে একটু রক্ত দিতে পারব না!’ অনেক বছর ধরে রক্তদানের পেছনে কোন বিষয়টি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে জানতে চাইলে এ ভাবনার কথাই জানালেন ৫৪ বছর বয়সী রোকসানা বিলকিস। গত ২০ বছরে তিনি ৫০ বার রক্তদান করেছেন। এই ২০ বছরে এমন কোনো বছর নেই, যে বছর রক্তদান করেননি। তিনি এখন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন) পদে কর্মরত।
রক্তদানের শুরুর গল্পটা বলতে গিয়ে রোকসানা বিলকিস প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯৯ সালে কোর্স সমন্বয়কারী হিসেবে নায়েমে যোগ দেন। ওই সময় কোর্স শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হতো। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনিও রক্ত দেন ওই বছর। এরপর আরও দু–তিনবার রক্ত দিয়েছেন বাঁধন, রেড ক্রিসেন্টের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে। ২০০০ সালে আত্মোন্নয়ন ও সেবাদানকারী সংস্থা কোয়ান্টামে মেডিটেশনের ওপর কোর্স করেন। সেখান থেকে ২০০২ সালে যুক্ত হন কোয়ান্টামের রক্তদান কর্মসূচিতে।
রোকসানা বলেন, রক্তদানের কারণে একজন মানুষের জীবন বাঁচে, এটা মনে একধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। এ মানসিক শান্তির সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। প্রতি তিন–চার মাসের মধ্যে রক্ত দেওয়ার চেষ্টা করেন। দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ১৭ এপ্রিল, ১৫ আগস্ট এবং ১৬ ডিসেম্বর রক্তদানের জন্য তাঁর পছন্দের তারিখ। চেষ্টা করেন এই তারিখগুলোতে রক্তদান করতে। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর। কাকতালীয়ভাবে আমারও রক্তদানের সংখ্যা ৫০। এবার ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে রক্তদান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পায়ে কাটা ফুটে যন্ত্রণা হওয়ায় এবার দুঃখজনকভাবে দিতে পারছি না।’
কোয়ান্টাম ল্যাবের সংগঠক শামীমা নাসরিন প্রথম আলোকে জানান, রোকসানা ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত তিন–চার মাস পর পর রক্ত দান করেন। তিনি ২০ বছরে মোট ৫০ বার রক্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে বছরে তিনবার করে রক্ত দিয়েছেন ১১ বছর, দুবার করে রক্ত দিয়েছেন ৫ বছর, একবার করে দিয়েছেন ৩ বছর এবং ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ চারবার রক্ত দিয়েছেন। রক্ত চেয়ে কোয়ান্টাম ল্যাবে কোনো আবেদন এলে রোকসানাকে অনুরোধ করা হয়। তিনি রক্ত দিয়ে যান। তিনি জানেন না কোন রোগীর কাছে সেই রক্ত যাচ্ছে। রোগীও রক্তদাতা সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন না। তিনি বলেন, কোয়ান্টামের ৫০ জন রক্তদাতা এ বছর পর্যন্ত ৫০ বার রক্তদান করেছেন। এর মধ্যে রোকসানা একমাত্র নারী। এ ছাড়া সর্বোচ্চ ৬০–৬৯ বার রক্ত দিয়েছেন ছয়জন।
রোকসানা বিলকিস বলেন, ‘অনেকে বলেন, দেশে ৫০ বার রক্তদাতা কোনো নারী নেই। আমিই প্রথম। তবে এই তথ্য কতটুকু সঠিক তা আমি জানি না।’ রোকসানা বিলকিসের স্বামী এ কে এম মেজবাহ উদ্দিন কাইয়ুম একজন চিকিৎসক। তিনি এবার তৃতীয়বারের মতো ময়মনসিংহের ভালুকা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। একমাত্র মেয়ে আফলাহ বিনতে কাইয়ুম প্রকৌশলী। থাকেন কানাডায়।
কোয়ান্টাম ল্যাবের তথ্য অনুসারে, ২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল ল্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৩৯ হাজারের কিছু বেশি ব্যক্তি রক্তদান করেছেন। ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ লাখ ৫২ হাজার ১১৪ ব্যাগ রক্ত ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে।
কোয়ান্টাম ল্যাবের ইনচার্জ চিকিৎসক মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তি সুস্থতা সাপেক্ষে ৩ থেকে ৪ মাস অন্তর রক্ত দিতে পারেন। বোনম্যারো থেকে রক্ত তৈরি হয়। রক্তের লোহিত কণিকা তিন মাস পরপর মরে যায়। বরং এই রক্ত অন্যকে দান করলে ওই ব্যক্তির উপকার যেমন হয়, তেমনি রক্তদাতাও উপকৃত হন। যে ব্যক্তি রক্তদান করেন না, তার চেয়ে রক্তদানকারী ব্যক্তির বোনম্যারো সচল থাকে বেশি। বোনম্যারো নতুন করে কোষ তৈরি করে। রক্ত দান করলে হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমে এবং দেহের ওজন ও রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রা ঠিক থাকে।