তিনি ফরমান আলী, এখন ফুল বেকার

করোনায় কর্মহীন ফরমান আলী। গত বুধবার সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার জুড়ী বাঁধ এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো
করোনায় কর্মহীন ফরমান আলী। গত বুধবার সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার জুড়ী বাঁধ এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার জুড়ী বাঁধ এলাকা। গত বুধবার বন্যাকবলিত বাঁধের এক পাশে আনমনা হয়ে বসেছিলেন এক ব্যক্তি। কয়েকজন লোকের ভিড় দেখে হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘আমি ফরমান আলী, ফুল বেকার।’

উসখুস চেহারা। পরনে মলিন টি-শার্ট, লুঙ্গি। ফুল বেকার মানে কী? পাশ থেকে একজনের এমন প্রশ্নে ফরমান বললেন, ‘আইজ ১১২ দিন অইল, কামকাজ ছাড়া। কেউ তো কিছু না কিছু করছে। আমি কিচ্ছু করার পাইয়ার না। করোনা ফুল বেকার বানাইছে।’ এটুকু বলে কথায় খানিকটা দম নিলেন ফরমান। তারপর প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘কইনছাইন, কামের মানুষ কাম না পাইলে বাঁচেনি?’

বাগমারা গ্রামে তাঁর বাড়ি। কুশিয়ারা নদী ও হাকালুকি হাওরপারের এই গ্রাম পুরোটা বন্যাকবলিত। গ্রামে যাওয়ার পথে অথই পানি। ফেঞ্চুগঞ্জের জুড়ী নদীর মুখে বাঁধ এলাকা থেকে নৌকায় করে আসা-যাওয়া করতে হয়। বাঁধে বসে নৌকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ফরমান। করোনাকালে এখন একটি কাজই তাঁর একমাত্র চাওয়া।

মা-বাবাসহ চার ভাই ও চার বোনের বড় পরিবার। ফরমানের বয়স ২৫ বছর। ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রায় ১০ বছর আগে হোটেল-রেস্তোরাঁয় ‘পার্সেল’ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন। পাশাপাশি রেস্তোরাঁর রন্ধনশালার কর্মী হিসেবে টুকটাক কাজ করতেন। তখন দৈনিক মজুরি ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এভাবে একদিন রেস্তোরাঁর ‘কারিগর’ হন। দৈনিক মজুরি বেড়ে ৩৫০ টাকা হয়। একটানা চার বছর এ কাজ করার পর ‘দক্ষ’ হন ফরমান। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে কক্সবাজারের টেকনাফে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ পান। থাকা-খাওয়া বাদে দৈনিক মজুরি ছিল ৫০০ টাকা। সেখানে চার মাস কাজ করার পর করোনা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বন্ধ হয়ে যায় রেস্তোরাঁটি। ফরমান বাড়ি ফেরেন ২৫ মার্চ। সেই থেকেই ‘ফুল বেকার’।

জুড়ী বাঁধ এলাকা থেকে নৌকায় করে ফরমান আলীর বাড়ি যেতে প্রায় ২০ মিনিট লাগে। বাড়ির চারদিকে পানি। উঠানে নৌকা ভেড়াতেই ফরমানের চাচা ইসমাইল আলীকে পাওয়া গেল। তিনি জানান, ফরমানের বাবা আনফর আলী ফ্লাক্সে ভরে আদা ও লেবুর চা বিক্রি করেন। পাঁচ টাকা কাপ দরে কেনাবেচা হয়। বাড়িতে আনফল আলীকে পাওয়া গেল না। তিনি চা বিক্রি করতে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে গেছেন।

ইসমাইল আলী জানালেন, ফরমানের বাবা আনফর আলীর চার ছেলের মধ্যে এক ছেলে বিয়ে করে পৃথক হয়েছেন। ফরমানের রোজগারে ভর করে ১৫ শতক জায়গা কিনে বাড়ি করতে পেরেছেন তাঁরা। করোনায় বেকার ফরমান। তাই তাঁর ছোট দুই ভাই রিকশা চালান। হাঁফ ছেড়ে ইসমাইল বললেন, ‘কিতা আর করমু, কামহারা পুয়াটার মুখে দি চাইলেই খালি মায়া লাগে। যে কাম হে হিখছে (শেখা), হেই কাম ছাড়া আর কোছতা পারে না।’

চাচার কথার সঙ্গে নিজের কথা যোগ করে ফরমান জানান, অন্য কাজ করার চেষ্টাও করেছেন। একদিন একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাড়ায় নিয়ে চালান। নতুন চালক বলে যাত্রী পাননি। এখন বন্যার পানি চারদিকে। ভাড়ায় হাতে বাওয়া নৌকা চালিয়ে রোজগার চলছে। নৌকা চালানোর কাজও করতে চেয়েছিলেন। এখানেও নতুন বলে কেউ নৌকা ভাড়া দেননি।

ফরমান বলেন, ‘টেকনাফ থাকি ফিরার সময় মালিক (রেস্তোরাঁ) যে মোবাইল নম্বর দিছলা, ওই নম্বরে কল করি, কেউ ধরে না। আর লোকাল (ফেঞ্চুগঞ্জের স্থানীয়) হোটেলে আমার কারিগরি কাম চলে না। ই-কামটা শিখছিলাম যে হোটেল থাকি, সেইটাও এখন বন্ধ। করোনার আগে ফুলটাইম কাম করতাম। অখন কামকাজ ছাড়া শরীরটাও বেচেত (শক্তিহীন) লাগের।’