'প্রায়ই জাম্বুরা কিনি'
‘জাম্বুরার সময় এলে প্রায়ই এটা কিনি। জাম্বুরা আমার প্রিয় ফল। পরিবারের অনেকেরই পছন্দের ফল। দামটাও সাধ্যের মধ্যে। জাম্বুরা দিয়ে নানা রকম খাবার তৈরি করা যায়। সেগুলো খেতেও সুস্বাদু।’
জাম্বুরা কেনার সময় এ কথা বললেন রেণুকা রহমান। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দেখা মেলে তাঁর। জানালেন, তুলনামূলকভাবে দামে সস্তা ও খেতে মজা বলে এই ফলের প্রতি অনেকেরই দুর্বলতা রয়েছে।
কেতাবি নাম বাতাবি লেবু, প্রচলিত নাম জাম্বুরা। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মহানগর পর্যন্ত সবখানেই এই ফলের কদর রয়েছে। শৈশবে গ্রামের মাঠে অনেকেরই ফুটবলে যাত্রা শুরু এই বাতাবি লেবুতে কিক মেরে। অন্যের গাছ থেকে লুকিয়ে জাম্বুরা পেড়ে এনে দলবেঁধে নুন-মেখে খেয়ে মজার করার মানুষও কম নেই। কম টাকায় বেশি করে ভিটামিন সি পাওয়ার এক জুতসই আধার এই ফল।
সুস্বাদু ফলটির এখন ভরা মৌসুম। বাজার, ফলের দোকান বা ফেরিওয়ালার ঝুড়িতে নজর কাড়বে রসে টসটস জাম্বুরা। গোলগাল ফলটির ব্যাস ১৫ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার। জুস, ফ্রুট সালাদ ও নানা ধরনের চকলেট তৈরিতে জাম্বুরার যথেষ্ট কদর রয়েছে। মিষ্টি স্যুপ তৈরিতেও জাম্বুরার রস বেশ কাজের। জাম্বুরার খোসা ছাড়ালেই দেখতে পাবেন টকটকে লাল, হালকা হলুদ বা গোলাপি রঙের রসাল কোয়া।
কারওয়ান বাজারের বাতাবি লেবু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার বাজারে সবচেয়ে বেশি বাতাবি লেবু আসে টাঙ্গাইল, রংপুর, পঞ্চগড়, যশোর, মাগুরা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ি, দিনাজপুর, দুর্গাপুর, জামালপুর, শেরপুর, বারোবাজার এবং কুমারখালী থেকে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কমবেশি বাতাবি লেবু চোখে পড়ে। জাম্বুরার মৌসুম সাধারণত আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস। অগ্রহায়ণেও কিছু জাম্বুরা বাজারে আসে।
জাম্বুরা ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, ‘যতটুকু জানি—মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর ও টাঙ্গাইল এলাকার জাম্বুরাই বেশি সুস্বাদু। খাওয়ার উপযোগী যেকোনো জাম্বুরাতেই রসের ঘাটতি থাকে না। স্বাদে একটু কমবেশি থাকে। তবে, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসের জাম্বুরা খুব মিষ্টি ও রসাল থাকে।’
পুষ্টিবিদদের তথ্যমতে, জাম্বুরায় রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাংগানিজ, ফসফরাস, ফলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন বি’সহ নানা রকম খনিজ উপাদান। প্রতি ১০০ গ্রাম জাম্বুরার রসে আছে ৩৮ শতাংশ কিলোক্যালরি, ভিটামিন সি ১০৫ মিলি গ্রাম, শ্বেতসার ৮.৫ গ্রাম, আমিষ ০.৫ গ্রাম, স্নেহ ০.৩ গ্রাম, ভিটামিন বি১ ০.০১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.০৪ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.২ মিলিগ্রাম, ক্যারোটিন ১২০ মাইক্রোগ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৯.২ গ্রাম, প্রোটিন ২.৪ গ্রাম, চর্বি ২ গ্রাম, ফাইবার বা আঁশ ১.২ গ্রাম এবং চিনি ৭ গ্রাম।
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ শামছুন্নাহার নাহিদ বলেন, ‘বাতাবি লেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। যা রক্তনালির সংকোচন ও প্রসারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। শরীরের ক্লান্তি দূর করে, পানিশূন্যতা কমায়। এটি ডায়াবেটিস, জ্বর, নিদ্রাহীনতা, মুখের ভেতরে ঘা, পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। জাম্বুরার রস ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ কার্যকরী। এতে থাকা বায়োফ্লভনয়েড স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করে।’
এই পুষ্টিবিদ বলেন, ‘জাম্বুরা শরীরের কোলেস্টেরলও নিয়ন্ত্রণে আনে। বাতের ব্যথায় যথেষ্ট কার্যকরী। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্ত পরিষ্কার করে। জাম্বুরার রস ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। গ্যাসের জ্বালা-যন্ত্রণা কমায়।’