‘মাকে খুব কষ্ট দিয়ে মেরেছে। আপনার কাছে দড়ি আছে না? দড়ি দিয়ে আমার বাবাকে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধবেন। তারপর আপনাদের কাছে লাঠি আছে না? সেটা দিয়ে মারতে মারতে মেরে ফেলবেন।’ কথাগুলো পাঁচ বছরের এক শিশু বলেছে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে। গত বছরের ৮ আগস্ট সে জবানবন্দি দেয়।
গত বছর জুনে সে মাতৃহারা হয়েছে। তার মা সামিয়া লায়লা আরজুমান খান (৩৮)। তাঁকে হত্যা করার অভিযোগে মামলা হয়। শিশুটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তবে সেই মামলার তদন্ত থেমে আছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গঠিত কমিটির মতামত না পাওয়ায়।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৭ জুন রাতে রাজধানীর মিরপুর থানার কল্যাণপুরের গৃহবধূ সামিয়া লায়লাকে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মো. ফরহাদ হোসেন মিরপুর থানায় মামলা করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, স্বামী মো. আলমগীর হোসেন ওরফে টিটু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের সহায়তায় ও তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ইসরাত জাহান ওরফে মুক্তার পরোক্ষ ইন্ধনে সামিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন। আলমগীর কারাগারে আর ইসরাত জামিনে মুক্ত আছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সামিয়ার লাশের ময়নাতদন্ত হয়। গত বছরের ৮ আগস্ট সামিয়ার শিশুপুত্র (৫) আদালতে জবানবন্দি দেয়। ১৩ নভেম্বর গাড়িচালক কামাল হোসেনও আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক নাছির উদ্দিন। প্রথম তদন্ত করেন মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নওশের আলী। হাইকোর্টের নির্দেশে নওশের আলীকে বাদ দিয়ে পিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হয়।
সূত্র বলেছে, ২০১৭ সালে দেওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সামিয়া আত্মহত্যা করেছেন মর্মে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নজরে আনা হলে হাইকোর্ট প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসককে তলব করেন। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত এক আদেশে বলেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা উচিত। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কেস ডকেট অনুসারে প্রতীয়মান হয়, পুনরায় মতামত নেওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। হাইকোর্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে সামিয়ার মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করে মতামতসহ তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাকে পরিবর্তন করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
এ বিষয়ে মামলার বাদীর আইনজীবী খন্দকার মহিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে হাইকোর্টের রেজিস্টার শাখা থেকে আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়, যার মেমো নম্বর ৮৮। তবে এখনো কোনো প্রতিবেদন না দেওয়ায় মামলার তদন্ত ঝুলে আছে।
বাদী ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্ট বলেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালককে কমিটি গঠন করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে মতামতসহ প্রতিবেদন দিতে। অথচ এখনো তা পাওয়া যায়নি। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিচালকের কাছে না গিয়ে আগের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের কাছে মতামত চেয়েছেন।
বাদীর ভাই আনিস বলেন, আসামি আলমগীর প্রভাবশালী। তিনি শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সঠিক তদন্ত হলে মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক নাছির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি নিজে গিয়ে ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সোহেল মাহমুদের সঙ্গে দেখা করেছেন। হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো প্রতিবেদন দেয়নি। বিষয়টি মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিয়ে অবহিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর আর কী করার আছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ময়নাতদন্তের বিষয়টি দেখে মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগ। মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বলেছেন, সম্প্রতি হাইকোর্টের আদেশ পেয়েছেন। কমিটি গঠন করে অচিরেই প্রতিবেদন দেবেন।
সামিয়ার সঙ্গে ২০০৯ সালে আলমগীরের বিয়ে হয়। তাঁদের পাঁচ ও দুই বছরের দুটি সন্তান রয়েছে। আলমগীর পরে ইসরাত জাহানকে বিয়ে করেন।