এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, উৎসে করের টাকা ফেরত না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মুনাফার টাকা আটকে যাচ্ছে। এনবিআরে মাসের পর মাস রিফান্ডের টাকা আটকে থাকে। এতে ভোগান্তি বাড়ে উদ্যোক্তাদের। এই উৎসে কর উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘ফেরতযোগ্য উৎসে করের টাকা চাইলে কর কর্মকর্তাদের ভাবসাব এমন থাকে যেন, তাঁরা সরকারের টাকা দিচ্ছেন। আমি মনে করি, উৎসে করের টাকা যদি ফেরত দেওয়ার বিধান থাকে, তাহলে এই টাকা নেন কেন? উৎসে কর উঠিয়ে দেওয়া উচিত।’ ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনবিআরসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এ নিয়ে বৈঠকও হয়েছে বলে তিনি জানান।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আয়করের প্রায় ৬০ শতাংশের মতো আসে উৎসে কর থেকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই খাত থেকে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা এসেছে। ওই বছর রিফান্ড দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৩৬ কোটি টাকা। এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানান, নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রিফান্ডের টাকা আটকে যায়।

যেভাবে আটকে যায়

এবার দেখা যাক, কীভাবে উৎসে করের টাকা আটকে থাকে। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, প্লাস্টিক প্যাকেজিং খাতে গ্রস প্রফিট (জিপি) নির্ধারণ করা আছে ১৩ শতাংশ। অবশ্য প্রতিটি খাতের জন্য একেক হারে জিপি নির্ধারণ করা থাকে। প্লাস্টিক প্যাকেজিং খাতের পণ্য বানিয়ে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে যদি ১০০ টাকা খরচ হয়, তাহলে কাঁচামাল, বেতন–ভাতা, পরিচালনা খরচ, বিদ্যুৎ পরিষেবা বিলসহ খরচ হয় ৮৭ টাকার মতো। বাকি ১৩ টাকা গ্রস প্রফিট নির্ধারণ করে দেন কর কর্মকর্তারা। এরপর ব্যাংক সুদ, বিক্রিসংক্রান্ত খরচ, প্রশাসনিক ব্যয় এসব বাদ দিয়ে নিট মুনাফা ঠিক হয় ৫ টাকা। এই ৫ টাকার ওপর ৩০ শতাংশ বা দেড় টাকা করপোরেট কর দিতে হবে। কিন্তু ওই প্লাস্টিক প্যাকেজিং উদ্যোক্তা কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ এবং সরবরাহ পর্যায়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম দিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে গড়ে শতকরা ১২ টাকা অগ্রিম কর হিসেবে এনবিআরে জমা থাকে। ওই উদ্যোক্তার মুনাফা ৫ টাকা হলেও দ্বিগুণ টাকা আটকে যায়।

ইউনিলিভার, বার্জার, রেকিট বেনকিজারসহ বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির সংযোগ শিল্প হিসেবে কয়েকটি দেশি কোম্পানি কাজ করে। বহুজাতিক কোম্পানিকে তাদের পণ্যের কৌটা সরবরাহ করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান এক্সক্লুসিভ ক্যান লিমিটেড।

এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, সরবরাহ ও আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর হিসাব করে
পণ্যের দাম ধরতে হয়। ক্রেতারা নিজেরা বানালে এই কর দিতে হয় না, তাই নিজেদের খরচ কমাতে নিজেরাই এখন কৌটা বানানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে এই অগ্রিম কর ও ভ্যাটের জন্য ক্রমবর্ধমান সংযোগ শিল্প উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

করপোরেট করেও ভুগতে হবে

এবার করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করপোরেট করহার ২০ শতাংশ। আর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ। কিন্তু শর্ত হলো বছরে ১২ লাখ টাকার বেশি খরচ ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে। এর মানে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ টাকার বেশি নগদে খরচ করা যাবে না।

এখানেও সমস্যা আছে। যেমন বহু কোম্পানি তাদের কর্মী ও শ্রমিকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। এসব খাবার নিজেদের ক্যানটিনে রান্না করা হয়। প্রতিদিন বাজারও করা হয়। ফলে প্রতিদিনই কয়েক লাখ টাকার বাজার করতে হয়। করপোরেট করের সুবিধা পেতে হলে বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস, সবজি ইত্যাদি নগদ টাকায় কেনা যাবে না।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি অবাস্তব শর্ত। এ শর্তের কারণে ব্যবসায়ীরা করপোরেট কর কমানোর সুবিধা নিতে পারবেন না।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন