default-image

করোনাভাইরাসের কারণে যখন অন্য ব্যাংকগুলোর আমানতে টান পড়েছে, ঠিক তখনই এক লাখ কোটি টাকার বিশাল মাইলফলক অতিক্রম করেছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক; যা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকের জন্য নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দেশের ব্যাংক খাতের আমানতের ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকের।

জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার ব্যাংকটিতে আমানতের পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ২৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর আগে ২০১৩ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকায়।

২০১৬ সালে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি সংকটে পড়ে এবং গ্রামে-গঞ্জের আমানত টানতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। গত ছয় মাসে ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন আমানত পেয়েছে ব্যাংকটি। বদৌলতে গতকাল মঙ্গলবার আমানতে এক লাখ কোটি টাকার নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছে ইসলামী ধারার এই ব্যাংক। এর ফলে ১ কোটি ৪৩ লাখ গ্রাহকের ব্যাংকে পরিণত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক।

বর্তমানে দেশে কেবল রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের আমানত ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে ব্যাংকটির আমানতের উল্লেখযোগ্য অংশ সরকারি খাতের। আর ইসলামী ব্যাংকের আমানতের বেশির ভাগই ছোট অঙ্কের, সাধারণ গ্রাহকদের।

>দেশে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এই অর্জন নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালিকানা পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বিস্তৃত হয়েছে। করোনার মধ্যে কাউকে টাকা উত্তোলনে নিরুৎসাহিত করা হয়নি। এর ফলে আস্থা আরও বেড়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ও আমানত বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে গত ছয় মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা আমানত বেড়েছে।’

মাহবুব উল আলম আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের আমানতের বড় অংশই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীদের। সরকারি বা করপোরেট আমানত খুবই কম। আমানত সুরক্ষিত রাখতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। সরকারের নির্দেশনা মেনে সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক।’

এই অর্জনের জন্য ব্যাংকটিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইসলামি ধারা ও সেবার মানের কারণে ব্যাংকটির এই সাফল্য এসেছে। এনজিওগুলোর কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ায় গ্রামের মানুষেরাও ব্যাংকটির দিকে ঝুঁকেছে। আবার করোনার কারণে ধর্মীয় ভীতিও বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে।’

তবে সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘যত বেশি আমানত, তত বেশি ঝুঁকিও। তাই ব্যাংকটিকে ঋণের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একক ব্যক্তি, খাত, এলাকা পরিহার করতে হবে। আমানতের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও তদারকি বাড়াতে হবে। কারণ, ব্যাংকটির কোনো সমস্যা হলে পুরো খাতেই এর প্রভাব পড়বে।’

সারা দেশে ব্যাংকটির রয়েছে ৩৫৭টি শাখা, ৪৩টি উপশাখা, ১ হাজার ১০০টি এজেন্ট আউটলেট। গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৯ হাজার নতুন গ্রাহক তৈরি করেছে বাংকটি। এজেন্ট আউটলেটসমূহের গ্রাহক ৭ লাখ ৫৩ হাজার। ফলে গ্রাহক বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখ। ২০১৯ সালে হিসাব খোলায় প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের বছরগুলোতে গড়ে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তবে ২০১৪ সালে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। 

বর্তমানে দেশে প্রবাসী আয়ের ৩২ শতাংশ আসছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। সদ্য সমাপ্ত জুন মাসে এসেছে ৫৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের প্রায় ৪ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১৬ শতাংশ। দেশব্যাপী ২৫ হাজার গ্রামে চলছে এই ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস), যার সদস্য ১২ লাখ ৬৮ হাজার। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ব্যাংকটিতে আমানত বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। 

২০১৯ সাল শেষে ব্যাংকটির দেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ঋণের মধ্যে শিল্প খাতে ৫৪ শতাংশ, ব্যবসা-বাণিজ্যে ২৯ শতাংশ, আবাসনে ৭ শতাংশ ও ভোক্তাঋণ ৪ শতাংশ। দেশের ইসলামি খাতের ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই আন্তব্যাংক ঋণের জন্য ইসলামী ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। 

গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাংকটির শেয়ার ১৭ টাকা ৪০ পয়সা দরে লেনদেন শেষ হয়েছে।

২০১৯ সালে বিনিয়োগকারীদের জন্য ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

জানা যায়, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার শুরুতেই ইসলামী ব্যাংকে বিদেশিদের মালিকানা ছিল ৭০ শতাংশের মতো, যা কমে বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। শুরু থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই নির্বিঘ্নে ব্যাংকটি পরিচালনা করে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মীর কাসেম আলী ১৬ বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিনিধি হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মো. আবদুজ জাহেরও এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। 

ব্যাংকটির উদ্যোক্তা হিসেবে ইসলামী ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, বায়তুস শরিফ ফাউন্ডেশন, ইবনে সিনার প্রতিনিধি ছিলেন তাঁরা। তবে বর্তমানে কেউ পুরো শেয়ার ছেড়েছে, কারও শেয়ার রয়েছে অল্প। ২০১৭ সালে বিভিন্ন নামে ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ।

এরপর ব্যাংকটির শেয়ার ছাড়তে হয় ইবনে সিনাসহ দেশি–বিদেশি অনেক উদ্যোক্তাকে। বড় এই পরিবর্তনের পর শেয়ার বিক্রি করে দেয় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি), কুয়েতের সরকারি ব্যাংক কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসসহ আরও অনেকে। ওই সময়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উদ্বেগ জানিয়ে আইডিবি প্রেসিডেন্ট বন্দর এম এইচ হাজ্জার লিখেছিলেন, আইডিবিসহ সৌদি আরব, কুয়েতের উদ্যোক্তাদের ৫২ শতাংশ শেয়ার থাকার পরও ব্যাংকটির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0