default-image

মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির উচ্চহার দেখানো থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেই একবার বলেছিলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোও (বিবিএস) সাময়িক হিসাব দিয়ে জানিয়েছিল, এই হার ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।

কিন্তু ৯ মাস পার হতে চলেছে, জিডিপির চূড়ান্ত হিসাব আর বের হচ্ছে না। তবে গত বৃহস্পতিবার এ সম্পর্কে আভাস পাওয়া গেছে। সে অনুযায়ী ওই অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ বা ৪ শতাংশের খানিক বেশির কথা বলা হতে পারে। মূল বাজেটে যা ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ।

করোনাভাইরাসের থাবায় গত বছরের মার্চ থেকেই বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি। উৎপাদনের চাকা ঘোরেনি বহুদিন। নিম্ন আয়ের মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। রপ্তানি আয় কমেছে। আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। এক রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই হয়েছে নেতিবাচক। অবশ্য প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পেছনে সরকারের ঘোষিত ২ শতাংশ এবং অনেক ব্যাংকের বাড়তি আরও ১ শতাংশ প্রণোদনার বড় ভূমিকা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার আগেই দেশি-বিদেশি সব সংস্থা ও গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু বাস্তবমুখী পরামর্শ আসে। কিন্তু সবকিছু এড়িয়ে সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা এক দফা কমিয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়। এখন আরেক দফায় তা কমিয়ে ৬ শতাংশের নিচে আনা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে ধরা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব মেনে নিয়ে প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণের উচ্চাভিলাষী পথে আর যাচ্ছে না সরকার। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১ শতাংশের বেশি কমানো হবে। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকবে ৭ শতাংশের ঘরে।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, আগামী ৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সরকার নতুন বাজেটের আকার ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ধরে এগোচ্ছে, যা শেষ মুহূর্তে কিছু বাড়তে-কমতে পারে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান অবশ্য গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা অপ্রত্যাশিতভাবে এসে পড়েছে। তবে এটা ঠিক যে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত হিসাবটি এখনো তৈরি হয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এটি হয়ে যাবে।’

বাজেটকে অংশীদারিমূলক করতে প্রতিবছর যে প্রাক্-বাজেট আলোচনা হয়, গত বছরের মতো এবারও করোনার কারণে তা খুব বেশি হয়নি। অর্থ বিভাগ অনলাইনে কিছু বৈঠক করেছে। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিছু বৈঠক করেছে সরাসরি, কিছু করেছে অনলাইনে।

রাজস্ব সংগ্রহে ভাটার বাস্তবতা

বাজেটীয় আয়ের বড় অংশ আসে এনবিআরের মাধ্যমে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম আট মাস জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাকি চার মাসে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা।

করোনাকালে লক্ষ্যমাত্রার কতটা রাজস্ব আহরণ সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এবার এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য বাড়ানো হচ্ছে, যার আকার হবে ৫০ হাজার কোটি টাকার মতো।

বাজেট ব্যয়ের একটি বড় অংশ খরচ হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আগামী বাজেটে এডিপির আকার ধরা হচ্ছে ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো, যা চলতি অর্থবছরের মূল বরাদ্দের চেয়ে ১২-১৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও আগামী অর্থবছরের জন্য এডিপির আকার প্রক্ষেপণ করা আছে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

বৃহত্তম বাজেট ঘাটতি

আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ তাহলে কত হবে? চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশের সমান। অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, আগামী বাজেট হবে সম্প্রসারণমূলক। এতে ঘাটতি ধরা হবে জিডিপির ৬ দশমিক ২ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। সেই হিসাবে আগামী অর্থ বছরে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

জানা গেছে, ঘাটতি অর্থায়নের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নেওয়া হবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের চার মাস বাকি থাকতেই অবশ্য সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকার সম পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার আশা করছে অর্থ বিভাগ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজেট বাস্তবসম্মত করা উচিত। ভালো খবর যে গত অর্থবছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরেরটিও কমিয়ে আনা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরেরটিও বাস্তবসম্মত করা হচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। তাই আমার পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই।’

আহসান এইচ মনসুরও এবার বড় বাজেট ঘাটতির পক্ষে। তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি ৭ থেকে ৮ শতাংশ করলেও কোনো অসুবিধা হবে না। মানুষের হাতে ভালো টাকা নেই বলে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা নেই-এটা একদিক থেকে ভালো খবর। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগ কমে যাওয়া। এই চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটাই এখন বড় বিষয়।’

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন