বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমরা বলতে এসেছি হাতিলের কথা, আর এর পেছনের মানুষটির কথা । ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি শুরুর দিকে কেবল দরজা বানাত। তখনো রেডিমেড বা তৈরি দরজায় মানুষ অভ্যস্ত ছিল না। তবে ধীরে ধীরে মানুষও বানানো দরজা পছন্দ করতে লাগল। বিক্রিও বাড়ছিল। একসময় মানুষই বলতে শুরু করল, দরজা পারলে আসবাবে কেন নয়? হাতিলের পেছনের মূল মানুষটি নিজেও ভাবলেন। তাই তো! দরজা বানাতে পারলে আসবাবেও সম্ভব। ১৯৯৫ সালে দরজার পাশাপাশি আসবাব বানানো শুরু হলো। তারপর আর পেছন ফিরতে হয়নি। তিন দশকের যাত্রায় হাতিল এখন শুধু দেশি নয়, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড।

একনজরে

হাতিল

প্রতিষ্ঠাকাল

১৯৮৯ সাল

সহযোগী প্রতিষ্ঠান

এইচ এ টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ, হাতিল হোল্ডিংস, হাকিল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস এবং হাতিল আইটি

কর্মী

৩,০০০

বার্ষিক লেনদেন

৪০০ কোটি টাকা

দেশে বিক্রয়কেন্দ্র

৭২টি

বিদেশে বিক্রয়কেন্দ্র

ভারতে ১৫, ভুটানে ২টি

আবার সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও হাতিল ভালো জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে পাবনায়। সেখানে কর্মরত রাশিয়ান নাগরিকদের জন্য ১৬টি ভবন নির্মিত হয়েছে। যেসব ভবনে পুরো আসবাব গেছে হাতিল থেকে।

হাতিলকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনের মূল কারিগর সেলিম এইচ রহমান। বললেন, ‘আমরা ক্রেতাদের যেটা বলেছি, সব সময় সেটিই দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কখনো এক কাঠ দিয়ে আসবাব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য কাঠ দিইনি। পণ্য কেনার পর সমস্যা হলে সেটি সমাধানের চেষ্টা করেছি। বিক্রি করেই দায়িত্ব শেষ করিনি। একজন ক্রেতা যখন আমাদের পণ্য কিনে সন্তুষ্ট হয়েছেন কিংবা বিক্রয়-পরবর্তী সময়ে সেবা পেয়েছেন, তখনই তাঁরা আরেকজনকে কাছে হাতিলের প্রশংসা করেছেন। এভাবেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও আমাদের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।’

বর্তমানে সারা দেশে হাতিলের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে ৭২টি। দেশের বাইরে ভারতে ১৫টি ও ভুটানে ২টি বিক্রয়কেন্দ্র আছে। দেশ দুটোতে বাংলাদেশের মতো হাতিল ব্র্যান্ড নামেই পণ্য বিক্রি হয়। হাতিলের কর্মী সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। বার্ষিক লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা।

বাবা হাবিবুর রহমানের কাছেই সেলিম এইচ রহমানের ব্যবসায় হাতেখড়ি। বাবা ১৯৬৬ সাল থেকে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের উল্টিনগঞ্জ লেনে কাঠের ব্যবসায়ী ছিলেন। সেই সুবাদে গেন্ডারিয়ায় বড় হওয়া। ছোটবেলা থেকেই বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা। পড়াশোনা শেষ করে তরুণ সেলিম এইচ রহমান বাবার কাঠের ব্যবসায় বসেছেন। বসেছেন বললে ভুল হবে, মূলত তাঁর কাজ ছিল কাঠ মাপজোক করা। তবে তাতে নতুনত্ব না থাকায় কোনো আগ্রহ পাচ্ছিলেন না। একদিন বাবাকে বললেন, কাঠের ব্যবসায় থাকতে চান না। নতুন কিছু করতে চান। সায় দিলেন বাবা। এরপরেই প্রথমে দরজা, তারপর আসবাবের ব্র্যান্ড হিসেবে হাতিলকে প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৯৩ সালে কুড়িলের ৫ হাজার বর্গফুটের একটি কারখানা ভাড়া নিয়ে হাতিলের আসবাব বানানো শুরু হয়। সেখানেই বেশ কয়েক বছর চলল। তবে নতুন নতুন বিক্রয়কেন্দ্র চালু ও আসবাবের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ২০০৩ সালে পুরান ঢাকার শ্যামপুর শিল্পনগরে আরেকটি কারখানা ভাড়া নেওয়া হলো। তাতেও চাহিদা অনুযায়ী জোগান দেওয়া যাচ্ছে না। পরে ফরাশগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় তিন-চারটি শেড ভাড়া করে কারখানা করেন সেলিম এইচ রহমান।

তত দিনে ব্র্যান্ড হিসেবে ভালোভাবে দাঁড়িয়ে গেছে হাতিল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কারখানাগুলো এক জায়গায় নিয়ে আসা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই সাভারের জিরানীতে বাবার ১২ বিঘা জমি কিস্তিতে কিনে কারখানার কাজ শুরু করেন সেলিম এইচ রহমান। ২০০৮ সালে নতুন কারখানায় যাত্রা শুরু করে হাতিল। বর্তমানে মোট ৬৫ বিঘার ওপর তাঁদের দুটি কারখানা।

নতুন কারখানা করেই থেমে যাননি সেলিম এইচ রহমান। সেই কারখানায় জার্মানি, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি, এমনকি রোবটও স্থাপন করেছেন। কারখানার একটি ছাড়া সব ইউনিট কাঠ বা বোর্ডের গুঁড়ামুক্ত করেছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কাজ করছেন স্বচ্ছন্দে। তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে গেছে অনেকটাই। সব মিলিয়ে বর্তমানে এটিই দক্ষিণ এশিয়ায় কাঠের আসবাব তৈরির আধুনিক কারখানাগুলোর একটি।

শুরুতে সেগুন কাঠের আসবাব তৈরি করলেও দেশে বনভূমির স্বল্পতার কথা ভেবে সেখান থেকে সরে আসেন সেলিম এইচ রহমান। ২০০৯ সাল থেকে সেগুনের বদলে আমদানি করা ওক কাঠ দিয়ে আসবাব বানানো শুরু করেন। পরবর্তীকালে জার্মানভিত্তিক দ্য ফরেস্ট স্টিওয়ার্ডশিপ কাউন্সিলের (এফএসসি) সনদপ্রাপ্ত ওক এবং বিচ ওক কাঠ দিয়ে আসবাব উৎপাদনে উদ্যোগী হয় হাতিল। পরিবেশের ক্ষতি না করে যেসব কাঠ উৎপাদিত হয়, সেগুলোকেই সনদ দেয় এফএসসি। বর্তমানে এফএসসি সনদপ্রাপ্ত কাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বোর্ড ও ইস্পাত ব্যবহার করছে হাতিল। তাদের কারখানাটিও এফএসসি সনদপ্রাপ্ত।

২০০২ সালে হাতিল দেশে প্রথম লেকার ফিনিশড (একধরনের বার্নিশ, যা যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়) নিয়ে আসে। সাধারণ বার্নিশের চেয়েও সেটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। পরবর্তী সময়ে অন্যরা সেটি অনুসরণ করলে আরও উন্নত মানের লেকার ফিনিশড নিয়ে আসে হাতিল কর্তৃপক্ষ।

আবার বিক্রয়কেন্দ্রের জায়গার দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ার কারণে ২০১৭ সালে ভার্চ্যুয়াল স্টোর চালু করে হাতিল। ফলে ছোট বিক্রয়কেন্দ্রে সব আসবাব প্রদর্শনের ব্যবস্থা না থাকলেও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ভার্চ্যুয়াল স্টোরে হাতিলের সব আসবাব ত্রিমাত্রিকভাবে দেখে পছন্দ করে নিতে পারেন ক্রেতারা।

আসবাবের নকশায় হাতিল সব সময় ক্রেতাদের বিশেষ নজর কাড়ে। সেটির পেছনেও গল্প আছে। নকশায় আধুনিকতা আনার ধারাবাহিক চেষ্টার অংশ হিসেবে ২০০৪ সালে হাতিল ফার্নিচার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তাতে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসবাবের নকশা দেন। দুই বছর পর একই ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও পাকাপাকিভাবে আসবাবশিল্পে কাজ করতে আগ্রহী হলেন না শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নকশাবিদ বা ডিজাইনার খুঁজে বের করার চেষ্টা অনেকটা ব্যর্থই হলো। দমলেন না সেলিম এইচ রহমান। ২০১০ সালে তিনজন অভিজ্ঞ ব্রিটিশ নকশাবিদকে নিয়ে এলেন। তাঁদের সঙ্গে হাতিলের কর্মীরাও যোগ দিলেন। টানা ছয় মাস আসবাবের নকশা করে তা প্রস্তুত করলেন বিদেশি তিন নকশাবিদ। সেগুলো ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় প্রদর্শন করা হলো। ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়ে উৎপাদন শুরু করে হাতিল।

সেলিম এইচ রহমান কাজপাগল লোক। দিনের বড় অংশই কাটান কারখানায়। আসবাবের নিত্যনতুন নকশার জন্য কাজ করেন প্রতিদিন। কারখানায় তাঁর অফিস কক্ষের পাশেই আছে সব সরঞ্জাম। সেখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সময় কাটান। হাতিলের ডিজাইনার টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন সেলিম এইচ রহমান।

করোনাকালে দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আবার টিকে থাকতে কর্মীর বেতন কর্তন করেছে। তবে মহামারির মধ্যে সরকারঘোষিত বিধিনিষেধের কারণে দীর্ঘদিন বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ ছিল। আগের বছরের তুলনায় গতবার ৫০ শতাংশ ক্রয়াদেশ কমেছিল। তারপরও কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাটেনি হাতিল।

এ প্রসঙ্গে সেলিম এইচ রহমান বললেন, ‘হাতিল একটি পরিবার। পরিবারের কারও যদি অসুখ হয়, তাকে কি ফেলে দিতে পারি? পারি না। সমস্যা আসবে। সম্মিলতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। ব্যাংক সহযোগিতা করেছে। ব্যাংক থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছি। সে টাকা দিয়ে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে।’

আসবাব নিয়ে সেলিম এইচ রহমানের স্বপ্নের শেষ নেই। তাঁর চোখে আসবাবে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা। বললেন, বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনের কাছ থেকে আসবাব নিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। অনেক ব্যবসায়ী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু আমরা তাঁদেরকে আসবাব দিতে পারছি না। কারণ, তাঁদেরকে আসবাব দিতে গেলে কাঁচামাল আমদানিতে যে পরিমাণ শুল্ক দিতে হয়, তা দিয়ে মুনাফার চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি। আর শুল্ক না কমলে বাজারটি ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে চলে যাবে। তবে এখনো সুযোগ আছে।

করোনা মহামারি এখনো বিদায় নেয়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে সেলিম এইচ রহমান বললেন, এখনই নতুন করে বাজার সম্প্রসারণে যাচ্ছি না। আপাতত কর্মীদের নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। ভারত ও ভুটানে রপ্তানি ভালো হচ্ছে। রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। যন্ত্রপাতি আনতে হবে।

বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী একটি ব্যবসায় সফল হলে নিত্যনতুন ব্যবসায় নামেন। সেটিরও দরকার আছে। তবে এখানে ব্যতিক্রম সেলিম এইচ রহমান। শুরু থেকেই কাঠ ও আসবাবেই ডুবে আছেন। তাঁর কথা, কয়েক জায়গায় মাঝারি অবস্থানে না থেকে এক জায়গায় শীর্ষ থাকা অনেক জরুরি। সেলিম এইচ রহমানের এই দর্শনের কারণে বাংলাদেশ পেয়েছে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। তাঁর দেখানো পথ ধরে অন্যরাও হাঁটছে আসবাব রপ্তানিতে।

আরিফুর রহমান: প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন