বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেশি, যা শিগগিরই কমবে বলে মনে হয় না। এতে সরকারের ভর্তুকি আরও বাড়বে। আবার মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।
জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক, ঢাকা কার্যালয়

অর্থমন্ত্রীর বড় চিন্তা অবশ্য আয় নিয়ে। বছর ঘুরলেই বাজেট বড় হচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু পাল্লা দিয়ে আয় বাড়ছে না। আয় বৃদ্ধির নতুন কোনো উদ্ভাবনও নেই তাঁর মন্ত্রণালয়ের কারও। অপচয় এবং অপরিকল্পিত ব্যয় কমানোরও কোনো উদ্যোগ নেই।

সামনে যেহেতু নির্বাচন, ফলে আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটটি এক হিসাবে জনতুষ্টিমূলক বাজেট হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটিও একটি গতানুগতিক বাজেটই হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ২৮ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বাজেট করতে যাচ্ছেন। যত কিছুই হোক না কেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁর কৌশল থাকবে এবং এতে সফল হবেন বলে তিনি আশাবাদী। ‘যত কিছু’ বলতে দুই বছরের বেশি সময় ধরে করোনার আঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়াকে বুঝিয়েছেন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

১০০ পৃষ্ঠার বেশি বাজেট বক্তৃতাটির প্রতিবছরই একটি শিরোনাম দেন অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরের জন্য ছিল ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’। আগামী অর্থবছরের জন্য ‘সবকিছুর পরও এগোচ্ছি আমরা’জাতীয় শিরোনাম থাকতে পারে বলে ধারণা দেন অর্থমন্ত্রী।

আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘাটতি

ঈদের দুই সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হারসংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিল ও সম্পদ কমিটির বৈঠকের তথ্য এবং বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী বাজেটে ঘাটতি থাকতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে ঘাটতি বাড়বে ২৮ হাজার কোটি টাকা। দেশীয় উৎস ও বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে এ ঘাটতি মেটানো হবে। দেশীয় উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রিই প্রধান।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণ নিয়ে হলেও ব্যয় করতে হবে। ব্যয় করলেই অর্থের চলাচল হয় এবং অর্থনীতি সচল থাকে।

মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৫.৫%

আগামী অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হচ্ছে বলে জানা গেছে। চলতি অর্থবছরে যা ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বছর শেষ হলে প্রকৃতপক্ষে কত দাঁড়াবে, তা বোঝা যাবে। এরই মধ্যে বাড়তি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, যা ১৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অর্থমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী করব? জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা—বিশ্বের এসব উন্নত দেশেও মূল৵স্ফীতি বাড়তি। সারা বিশ্বেই এই প্রবণতা। আমরা নিজেদের মতো করে ব্যবস্থাপনা করব। নিত্যপণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি করব এবং বিলাসদ্রব্য আমদানি নিরুৎসাহিত করব।’

এনবিআরের জন্য বাড়তি লক্ষ্য

আগামী অর্থবছরে মোট আয় ধরা হতে পারে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মোট আয় বাড়িয়ে ধরা হচ্ছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, মোট আয়ের মধ্যে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হচ্ছে আগামী অর্থবছরে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। আগের অর্থবছরেও একই লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল সংস্থাটিকে। সে হিসাবে এনবিআরের আদায় লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।

ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় যে তেমন বাড়ানো যাচ্ছে না—এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, এনবিআরের যথেষ্ট আদায় সক্ষমতার বিষয়টির আরও সময় লাগবে। বিভিন্ন কারণেই কাজটি হয়নি। তবে সংস্থাটির এবারের আদায় প্রবৃদ্ধি ভালো। এ হার ১৪ শতাংশ।

নতুন এডিপি চূড়ান্ত

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হতে পারে ২ লাখ ৪৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। এটা ধরেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নতুন এডিপি তৈরি করছে। ভালো দিক যে আগামী অর্থবছরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য আর বরাদ্দ লাগবে না। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় নতুন এডিপি অনুমোদিত হতে পারে। আগামী এডিপিতে দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থায়ন হবে দেশীয় উৎস থেকে।

চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা থাকলেও সংশোধন করে তা ২ লাখ ১৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা করা হয়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ের বাস্তবায়ন ছিল ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ।

ভর্তুকির চাপ

আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ভর্তুকি ১৮ হাজার কোটি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি মূল্য পরিশোধ ও প্রণোদনা প্যাকেজের সুদ ভর্তুকি ১৭ হাজার ৩০০ কোটি, খাদ্য ভর্তুকি ৬ হাজার ৭৪৫ কোটি এবং কৃষি প্রণোদনা বাবদ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হতে পারে। বিদ্যুৎ, সার ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করা না হলে অর্থাৎ এগুলোর দাম না বাড়ালে এ পরিমাণ ভর্তুকি লাগবে।

সরকার কৃষকদের সার, বিদ্যুৎ, কৃষি উপকরণ ও উন্নতমানের বীজ কেনাবাবদ ভর্তুকি দেয়। আর প্রণোদনা বেশি দেওয়া হয় পাট ও পোশাক রপ্তানি খাতে। নগদ ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইত্যাদি সংস্থাকে।

এলএনজি খাতে ভর্তুকির বিষয়ে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রকৃত দামের চেয়ে কম দামে এলএনজি বিক্রি করতে হবে বলে এ ভর্তুকি লাগবে। সরকার হিসাব করে দেখেছে, যে দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, সেই দামে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছে বিক্রি করলে তাঁদের পণ্য উৎপাদন খরচ বেশি পড়বে। তাই গ্যাস ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এখানে ভর্তুকি দিতে যাচ্ছে।

বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার জন্য পিডিবিকে ঋণ দেয় সরকার। ফলে বিপিসি ও পিডিবিকে দেওয়া ঋণও একধরনের ভর্তুকিই। কারণ, এসব ঋণ সরকার ফেরত পায় না এবং পরে পুরো ঋণই ভর্তুকিতে রূপান্তরিত হয়।

সামগ্রিক বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এবার অর্থমন্ত্রীর সামনে দুই ধরনের নতুন চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত, বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যে বড় ঘাটতিতে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় মুদ্রা বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এটা সামাল দিতে বাজেটে উদ্যোগ থাকতে হবে। অতি সম্প্রসারণমূলক বাজেট দিলে প্রকল্প খরচ বাড়বে, আমদানি খরচও বাড়বে। তাই সব চিন্তা করে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেশি, যা শিগগিরই কমবে বলে মনে হয় না। এতে সরকারের ভর্তুকি আরও বাড়বে। আবার মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় সবাই শুধু কর ছাড় চেয়েছেন। অর্থমন্ত্রীকে এই ব্যবসায়ী শ্রেণিকেও খুশি করতে হবে। ফলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির জায়গা সীমিত থাকবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে কর ভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য বড় সংস্কার দরকার। কিন্তু করদাতার সংখ্যা কিংবা মূসকের ভিত্তি এক দিনে বাড়ানো সম্ভব নয়। কর ভিত্তি বাড়ানোর জন্য সংস্কারে এনবিআর অনেক পিছিয়ে আছে।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন