বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

ওমানে ইয়াছিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০০ জনের। এর মধ্যে ৩০ জন ওমান, ভারত ও পাকিস্তানের। বাকি সবাই বাংলাদেশি। বাংলাদেশিদের ভিসার বিনিময়ে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি তাঁর।

মোহাম্মদ ইয়াছিন চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরায়। গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবাও ছিলেন প্রবাসী। বিদেশ থেকে ফিরে তিনি এলাকায় ছোট একটি মুদিদোকান দেন। তাতেই চলত সংসার। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ইয়াছিন ছিলেন চতুর্থ। স্নাতক পাস করে ১৯৯৫ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ইয়াছিন চৌধুরী শ্রমিক ভিসায় পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে। সেখানকার সিব বাজারে আসবাবের দোকানে বিক্রয়কর্মীর চাকরি নেন। তখন একটি কক্ষে আটজন গাদাগাদি করে থাকতেন। তখন চাকরি ছেড়ে সেখানেই নিজস্ব উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সাধ্যমতো টাকা জমাতে থাকেন। দুই বছরের মাথায় নিয়োগদাতার লাইসেন্স নিয়ে প্রথমে আসবাবের সরঞ্জাম বেচাকেনার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দুবাই থেকে পণ্য কিনে নিজেই পিকআপ ভ্যান চালিয়ে তা ওমানে নিয়ে যেতেন। এভাবে ছয় মাসে বেশ ভালো লাভ হয় তাঁর। লাভের টাকায় নিজের পুরোনো কর্মস্থলের পাশেই ছোট একটি দোকান ভাড়া নেন তিনি।

ইয়াছিন চৌধুরী বলেন, ‘দোকান ছোট্ট হলেও আসবাব বিক্রি হতো প্রচুর। ফলে লাভও থাকত বেশ। কয়েক বছরের মধ্যেই ওমানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তিন কোটি টাকা জমা দিয়ে বিনিয়োগের লাইসেন্স নিই। ২০০১ সালে নিজে ৭০ শতাংশ শেয়ার রেখে নিজের পুরোনো নিয়োগদাতাকে ৩০ শতাংশ দিয়ে লিমিটেড কোম্পানি গড়ে তুলি। আসবাব বেচাকেনার এই কোম্পানির নাম দিই “আকতার আল বেলুসি ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং এলএলসি”। ওমানে আসবাবের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত সিব এলাকায় বৃহৎ শোরুম খুলি।’

প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে চীন থেকে আসবাব আমদানি করে বিক্রি করত। ইয়াছিন জানান, ভালো মুনাফা হওয়ায় দুই বছরের মাথায় আসবাবের কারখানা গড়ে তোলেন। গ্রাহকের পছন্দ ও ফরমাশ অনুযায়ী আসবাব তৈরি করে তাঁর প্রতিষ্ঠান। ওমানের রাজধানী মাসকাটসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন তাঁর ১২টি শোরুম আছে। আখতার ফার্নিচার, আল রাহা ফার্নিচার ও ইয়াছিন ফার্নিচার নামের তিনটি ব্র্যান্ডের আসবাব বিক্রি হয় এসব শোরুমে। এ ছাড়া ‘আল-ডিউক’ নামে দরজা বিক্রির আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে তাঁর।

আসবাবের ব্যবসায় সফলতা পাওয়ার পর তিনি নতুন ব্যবসা শুরু করেন। ২০১৮ সালে ‘আল কামেল এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে হিমায়িত মাছের ব্যবসায় যুক্ত হন এই প্রবাসী উদ্যোক্তা। এখন বাংলাদেশ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে মাছ আমদানি করে ওমানের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (ইউএই) হিমায়িত মাছের ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠান খুলেছেন বলে জানান ইয়াছিন চৌধুরী।

ইয়াছিন চৌধুরী ওমানে দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। তবে বিদেশে ব্যবসা করে সফল হলেও দেশকে কখনোই ভুলে যাননি। প্রথম দিকে জমি কেনার মতো অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করেছেন। এরপর অবশ্য ধীরে ধীরে কৃষি, মৎস্য ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বিদেশের মাটিতে ব্যবসা করলেও আমার শিকড় বাংলাদেশে। তবে ওমানের মতো এখানে যদি এক দরজায় সব সেবা পাওয়া যায়, তাহলে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়ত। সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ করছে। প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হলে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসত।’

ইয়াছিন চৌধুরী জানান, নিজে একসময় কর্মী হিসেবে কষ্ট করে দিন কাটিয়েছেন। সে জন্য অন্য প্রবাসীদের দুঃখ-কষ্টও তাঁকে নাড়া দেয়। সে জন্য প্রবাসীদের সহায়তা করতে ২০১৫ সালে গঠন করেছেন চট্টগ্রাম সমিতি, ওমান। সংগঠনটি থেকে এখন পর্যন্ত ১৫০ প্রবাসীর মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের চিকিৎসাসহ নানা দুর্দশায় আর্থিক সহযোগিতা দেয় এই সংগঠন। তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ ছাড়া এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তিনি।

নিজের সফলতা অর্জন সম্পর্কে ইয়াছিন চৌধুরী বলেন, কঠোর পরিশ্রম করলে ও সততা থাকলে একজন শ্রমিকও রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হতে পারেন।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন