দুবাই থেকে ফিরে নতুন নেশা পেয়ে বসে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মত না দিলেও স্বর্ণলতার চাপাচাপিতে তাঁরা আর বাধা দেননি। তবে স্বামী শুরুতে বলেই দিয়েছেন, ‘ব্যবসা অনেক কঠিন। মেয়েদের পক্ষে তা আরও কঠিন!’

জেদ চেপে যায় স্বর্ণলতার। তাই ব্যবসায় সফল হয়ে স্বামীকে দেখিয়ে দেওয়ার পণ করেন। এরপর বিউটিফিকেশনের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করে ফেললেন স্বর্ণলতা। ২০০৪ সালে চালু করেন পারলার ব্যবসা। শুরুতে নিয়োগ দেন দুজন কর্মী। ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে থাকে। দুই বছর পর চালু করেন আরেকটি পারলার।

স্বর্ণলতা রায়ের বাসা সিলেট নগরের ভাতালিয়া এলাকায়। স্বামী শেখর কুমার দাশ। তাঁদের তিন সন্তান—এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে চিকিৎসক। মেয়েদের মধ্যে একজন প্রকৌশলী ও অন্যজন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

স্বর্ণলতা জানান, তাঁর পারলারের নাম উইমেন্স ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড। সিলেট নগরের মীরের ময়দান ও লামাবাজারে প্রতিষ্ঠানটির দুটি শাখা আছে। বর্তমানে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক ৫০ জন নারী এ দুটি শাখায় কাজ করছেন। এঁদের অধিকাংশই আদিবাসী জনগোষ্ঠী। পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতোধারায় নিয়ে আসার জন্যই তাঁর প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের তরুণীদের চাকরি দেওয়া হয়েছে।

উইমেন্স ফ্যাশন ওয়ার্ল্ডের দুই শাখাতেই গ্রাহকের উপচে পড়া ভিড় থাকে সব সময়। চুল কাটা, চুল বাঁধায়, ত্বকের পরিচর্যা, মেকআপ, বউ সাজসহ নারী ও শিশুদের সৌন্দর্যবিকাশে সব ধরনের সেবা প্রদান করা হয় তাঁর পারলারে। সব খরচ বাদ দেওয়ার পর এখন ভালোই মুনাফা হয় বলে জানান স্বর্ণলতা।

স্বর্ণলতা রায় বলেন, ‘একে তো পরিবারের সমর্থন ছিল না, এর মধ্যে আবার আমার ছিল পারলার ব্যবসা। নারী হওয়ায় শুরুতে অনেকে আমাকে দোকান ভাড়া দিতে চাইতেন না। সামাজিক বাধাও ছিল। পারলারে নারীদের আসা-যাওয়ার কারণে অনেকে বিষয়টি ভালোভাবে নিতেন না। এ জন্য আমার বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ছড়ানো হয়, তা সহ্য করতে হয়েছে নীরবে। আমার কর্মীদের অনেকে আদিবাসী হওয়ায় তাঁদের বাসা ভাড়া পেতেও সমস্যায় পড়তে হয়েছিল।

এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে নারী হওয়ায় একটা সময় ব্যাংকঋণও পাইনি। পরে স্বামীর নামে ঋণ নিয়ে আমাকে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে হয়েছে। এত এত বাধা পেরিয়ে এখন আমার প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে গেছে। এখন আর কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। ব্যাংক এখন ঋণ দিতে আগ্রহী। সমাজেও কেউ আর এখন বাঁকা চোখে দেখে না।’

আলাপে আলাপে স্বর্ণলতা জানান, নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিশোরী ও নারীদের জন্য কর্মমুখী প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন এই উদ্যোক্তা। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। অনুপ্রেরণা দিয়ে সিলেটে কয়েক শ নারী উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন।

২০১৫ সালে ‘সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা ছিল স্বর্ণলতা রায়ের। তিনি চেম্বারটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। নিজের সংগঠন ও চেম্বারের মাধ্যমে স্বর্ণলতা সিলেটের প্রায় দেড় হাজার নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করেন। ২০১০ সালে বর্ষসেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁর উইমেন্স ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড জাতীয় এসএমই পুরস্কার পেয়েছে।

উদ্যোক্তা হিসেবে তো সফল হয়েছেন, আর কোনো স্বপ্ন আছে?—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বর্ণলতা রায় মুচকি হাসেন। বললেন, ‘একটা ইচ্ছে আছে আমার। সিলেটে মেয়েদের জন্য একটা আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চাই। উদ্দেশ্য এখানকার মেয়েরা কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করে উদ্যোক্তা হবেন। এ ছাড়া সিলেটের অনেক মেয়ে বিদেশে যান। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত হয়ে যেন তাঁরা বিদেশ যেতে পারেন, সে জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়টা দরকার।’

এই হলো স্বর্ণলতা রায়ের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন তিনি সফল নারী উদ্যোক্তা। সিলেটে তো বটেই, দেশের অনেকে, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তারা তাঁকে এখন ‘সিলেটের স্বর্ণলতা’ নামেই চেনেন, জানেন।