মা সৈয়দা ফেরদৌস বেগম ও মেয়ে তাসফিয়া রহমান মীমের নামের আদ্যক্ষর এফ ও এম নিয়ে তৈরি করেছিলেন কোম্পানি। এখন তা ৩০ কোটির বেশি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে তৌহীদের গল্পটা মোটেই সাফল্যগাথায় ভরা নয়, বরং বাধা পাওয়ার, হেরে যাওয়ার, থেমে যাওয়ার এবং হাল ছেড়ে দেওয়ার। বলা যায়, বিফলতাই তৈরি করেছে আজকের এফএমকে।

তৌহীদ লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে। ১৯৯৫ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন, তখন থেকেই ভাবতেন উদ্যোক্তা হবেন। কিন্তু পরিবারের কারও সায় নেই তাতে, ভালো ডিগ্রিতে অনায়াসে পাওয়া যাবে ভালো চাকরি। শুধু শুধু কেন বাপু ব্যবসার অনিশ্চিত পথ মাড়ানো?

পরিবারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তৌহীদ শুরু করলেন নানান ব্যবসা। কিন্তু বাড়িতে থেকে বাড়ির বিরুদ্ধে আর কতই-বা যাওয়া যায়, তাই ঢুকলেন একটা বায়িং হাউসে। নিয়মিত চাকরিতে ঢুকেই অস্থিরতা বাড়তে থাকল তাঁর। বছর না ঘুরতেই ফিরে এলেন ব্যবসায়। উদ্যোক্তা হওয়ার ভূত মাথা থেকে নামাতে ছেলেকে বিয়ে দিলেন বাবা, বাড়ল স্থায়ী চাকরির চাপ। ঢুকলেন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা হিসেবে, সময়টা ২০০২।

স্থায়ী চাকরি তৌহীদকে ভীষণ পীড়া দিত। তত দিনে জীবনের সাত বছর নষ্ট হয়ে গেছে ব্যবসার চেষ্টায়। মাথার ওপর বস হয়ে কাজ করছেন সহপাঠী ও অনুজরা। তবু দাঁতে দাঁত চেপে পাঁচ বছর টিকে থাকলেন। পাঁচ বছর পর ছোট্ট একটা সুযোগ আসে। এক গ্রাহক চেষ্টা করছিলেন বিস্কুটের প্যাকেটের ভেতরের প্লাস্টিকের ট্রে বানাতে। সেই ট্রের ব্যবসা খুব মনে ধরে তৌহীদের। চাকরি ছেড়ে বের হয়ে আসেন ট্রে বানানোর ব্যবসা ধরতে।

বাজারে সবাই জানতেন একমাত্র তৌহীদ পারেন যেকোনো আকারের পণ্য বানাতে। সেই সংযোগ ধরে আরব আমিরাত থেকে এল খাবারের ট্রে বানানোর বিশাল অর্ডার। ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা নিয়ে সেই কাজ করতেও অপচয় হলো অনেক টাকা। কিন্তু সাহস করে শেষ করায় নামটা রটে গেল আন্তর্জাতিক বাজারেও।

সামান্যই ব্যবসা, খুব যে মূলধন লাগবে, এমনও নয়। সরল বিশ্বাসে তৌহীদ তাঁর সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দেন তাতে। ভুলটা করেন সেখানেই। তখনো দাপ্তরিক কাগজে কোনো চুক্তি হয়নি। একদম হাসতে-খেলতে টাকাটা আত্মসাৎ করেন তাঁর ব্যবসার অংশীদার।

তৌহীদ ভাবেন, যা গেছে তো গেছে, এর পেছনে ছুটে আর সময় নষ্ট করা কেন? ব্যবসা শুরু করার চেষ্টায় তিনি সংযোগ করেছিলেন মেশিন নির্মাতাদের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গেই মিলেমিশে বানিয়ে ফেলেন বিস্কুটের ট্রে তৈরির মেশিন। বাজারে তখনো সবাই এক মোল্ডে বানায় ট্রে। তৌহীদ ভাবলেন, কাজ করতে হবে এখানে। বানিয়ে ফেলেন একটি ছাঁচ বানানোর কারখানা। ফলে যে যা ফরমাশ নিয়ে আসুক, তৌহীদ একদম তৈরি। এটিই এগিয়ে দেয় তাঁকে।

বাজারে সবাই জানতেন একমাত্র তৌহীদ পারেন যেকোনো আকারের পণ্য বানাতে। সেই সংযোগ ধরে আরব আমিরাত থেকে এল খাবারের ট্রে বানানোর বিশাল অর্ডার। ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা নিয়ে সেই কাজ করতেও অপচয় হলো অনেক টাকা। কিন্তু সাহস করে শেষ করায় নামটা রটে গেল আন্তর্জাতিক বাজারেও।

মাত্র তিন বছরে আমেরিকার এক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান সেধে পুঁজি বিনিয়োগ করে তৌহীদের এফএমে। সেই টাকা সময়মতো ফেরত দিতে পারায় ৩৮ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় কোম্পানিটি—এভাবেই উড়তে শুরু করে তৌহীদের স্বপ্নের উড়োজাহাজ।

বিস্কুটের ট্রে তো বটেই, প্লাস্টিক দিয়ে বানানো সম্ভব, এমন কোনো একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্য নেই, যা তৈরি করছেন না তৌহীদ। তিনি এখন শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, উদ্যোক্তাদের নেতাও বটে। হাতে ধরে তুলে আনেন নবীনদের। ২০১৯ থেকে কাজ করছেন এসএমই ফাউন্ডেশনের সাধারণ পরিষদ সদস্য হিসেবে।

এতটা সফল হয়েও কিছু বিষয়ের রাশ ধরে রেখেছেন নিজের হাতেই। আজও কোনো গ্রাহকের কাছে যান না এফএমের কোনো বিক্রয়কর্মী। তৌহীদ নিজে যান গ্রাহকের কাছে তাঁদের প্রয়োজন জানতে। তৌহীদের মতে, আমি নিজের আরামের কথা ভেবে আমার অংশীদারদের আরাম নষ্ট করি না। চেষ্টা করি যেন আমার কর্মী, ক্রেতা, বিনিয়োগকারী—সবাই তাঁদের প্রাপ্যটা সময়মতো বুঝে পান। ফলে তাঁরা তাঁদের দায়িত্বটাও পালন করেন সুনিপুণভাবে। এটাই আমাকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

সামনে তৌহীদের লক্ষ্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন