বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image


স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে মোস্তফা কামালের পরিবার। মোস্তফা কামাল নিজে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। স্ত্রী বিউটি আক্তার ভাইস চেয়ারম্যান। বড় মেয়ে তাহমিনা মোস্তফা নিত্যব্যবহার্য পণ্য বা এফএমসিজি এবং মেজ মেয়ে তানজিমা মোস্তফা আন্তর্জাতিক ক্রয় ও সিমেন্ট ব্যবসা দেখাশোনা করেন। ছেলে তানভীর মোস্তফার দায়িত্বে রয়েছে প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তির দিকটি। ছোট মেয়ে তাসনীম মোস্তফা পরিচালক পদে রয়েছেন।

না খেয়ে থাকার দিন

গত বছরের মার্চের এক দুপুরে মোস্তফা কামাল শুনিয়েছিলেন তাঁর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প। শুরু করেছিলেন তাঁর শৈশবের গল্প দিয়ে। উত্তরে যেটা মঙ্গা, কুমিল্লায় সেটা রাট। প্রতিবছর অগ্রহায়ণ থেকে পৌষ পর্যন্ত চলত রাটের কাল। মোস্তফা কামাল বললেন, ‘তখন মা-বাবা না খেয়ে আমাদের খেতে দিতেন।’আরও বললেন, ‘সকালে একমুঠো চালভাজা চিবিয়ে মক্তবে যেতাম। এরপর গরুর জন্য ঘাস কেটে রেখে যেতাম স্কুলে। বিকেলে ফেরার পথে পেট ভরে কলের পানি খেয়ে নিতাম।’

মোস্তফা কামালের বাবা ছিলেন ছোট লঞ্চের কর্মচারী, যা পুলিশ ব্যবহার করত। তাঁর কাছে মানুষ বিশ্বাস করে টাকা রাখতে দিতেন। সেই টাকা একবার চুরি হয়ে গেল। তখন তাঁর বাবা ছয় মাস সংসারে টাকা পাঠানো অর্ধেক করে সেই টাকা শোধ করেন। মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বাবা মাসে ৩০ টাকার মতো দিতেন। যত দিন অর্ধেক দিয়েছেন, তখন অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।’

নূর মিয়া ও আয়েশা খাতুনের তিন সন্তানের একজন মোস্তফা কামাল। জন্ম ১৯৫৫ সালে। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম, বর্ষায় হাঁটু সমান কাদা আর শীতে কাঁপতে কাঁপতে দেড় কিলোমিটারের মতো হেঁটে শিশু মোস্তফা কামাল বিদ্যালয়ে যেতেন। কলেজ বাড়ি থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে। তা তো আর হেঁটে যাওয়া যায় না। তারপরও কয়েক মাস কলেজে গেছেন। এরপর সাইকেলের আবদার, বাবার অপারগতা, রাগ করে ঢাকায়। সে ঘটনা ১৯৭৩ সালের।

১৭৫ টাকা বেতন

ঢাকায় আসার সময় মোস্তফা কামাল বাড়ি থেকে ১০ কেজি চাল নিয়ে আসেন। বলেন, ‘সেই সময় চাল থাকা অনেক কিছু। ভাত রেঁধে নুন দিয়েও খেয়ে ফেলা যায়।’মোস্তফা কামালের এক চাচাতো ভাই পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে চাকরি করতেন। গুলিস্তানে পুলিশের একটি ব্যারাকে থাকতেন। তাঁর কাছে গিয়ে থাকার জায়গা জুটল। এরপর যাত্রাবাড়ীতে একটি বাসায় কয়েক মাস লজিং থাকার পর পরিচিত একজন পুরান ঢাকায় একটি দোকানে ১৭৫ টাকা বেতনে চাকরি জুটিয়ে দেন।

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘চাকরি তো পেলাম। চিন্তা কোথায় থাকব। বাবার লঞ্চের চাকরির সুবাদে পরিচিত একজনের কাছে গেলাম। তিনি লঞ্চের মেঝেতে চাদর বিছিয়ে থাকার সুযোগ দিলেন।’

কয়েক মাস রাতে লঞ্চে ঘুমিয়েছেন মোস্তফা কামাল। তারপর একটি মেসে ওঠেন। সেখানে নিয়ম ছিল, খাট পেতে থাকলে ভাড়া বেশি, আর মাদুর বিছিয়ে ঘুমালে কম। তিনি মাদুরকেই বেছে নিলেন। বলেন, ‘সকালে কেরোসিনের স্টোভে রান্না করতাম। একটা ডিম আনলে দুপুরে অর্ধেকটা খেয়ে বাকিটা রাতের জন্য রাখতাম।’
এভাবে দিন কাটে। দুই বছরের চাকরিজীবনে একটা জিনিস অর্জন করেছেন মোস্তফা কামাল, সেটা হলো মহাজনসহ সবার আস্থা।

ওই সময় ঢাকায় গুটিকয়েক শিল্পকারখানা ছিল। ঢাকা ভেজিটেবল, নাবিস্কো, কোহিনূর কেমিক্যালস প্রভৃতি। মোস্তফা কামাল বলেন, কোনো একটি কোম্পানির পণ্য বিক্রির অনুমোদন বা পারমিট পাওয়াই ছিল তখন বড় বিষয়। যাঁরা পারমিট পেয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে পণ্য কিনে অনেকে ঠেলাগাড়িতে করে বিক্রি করতেন। তিনিও এ ব্যবসা করে কিছু লাভ করেন।

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কী করব, মাথা ঠিক নেই। কিছু একটা করতে হবে। চাকরি ছেড়ে দিলাম। তখন পরিচিত একজন পুরোনো মাইক্রোবাস ঢাকার রাস্তায় চালাতেন। তাঁর কাছে গেলাম পরিবহন ব্যবসায় নামতে।’

পুরোনো একটি গাড়ি কিনে গুলিস্তান টু ফার্মগেট ভাড়ায় চালানো শুরু করলেন। কখনো কখনো নিজেই কন্ডাক্টর হতেন। যেহেতু কোনো রুট পারমিট ছিল না, পুলিশ খুব জ্বালাতন করত। পুরোনো বলে গাড়িতেও নানা সমস্যা। পরিবহন ব্যবসার সেখানেই ইতি।

টংদোকানে কামাল ট্রেডিং

মোস্তফা কামাল প্রথম ট্রেড লাইসেন্স করে ব্যবসা শুরু করেন ১৯৭৬ সালে। নাম ছিল কামাল ট্রেডিং। তখন তাঁর এক পরিচিতজন শেরেবাংলা নগরে হাসপাতালে ছোট চাকরি করতেন। ফাঁকে ফাঁকে টংদোকান চালাতেন। ওই দোকানের ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন করলেন মোস্তফা কামাল।

পুরান ঢাকায় দোকানে চাকরি করার সময় মহাজন প্রায়ই তাঁকে ঢাকা ভেজিটেবলে পাঠাতেন। মোস্তফা কামাল ট্রেড লাইসেন্স করে ঢাকা ভেজিটেবলে এক কর্মকর্তার কাছে গিয়ে বললেন, ভাইয়ের দোকানে একটি সাব-ডিলার দেওয়া যায় কি না। এক কর্মকর্তা গেলেন পরিদর্শনে। তাঁকে অনুরোধ করে টং দোকানের জায়গায় শুধু দোকান লিখে প্রতিবেদন জমার ব্যবস্থা করলেন।

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সাব-ডিলার হওয়াটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মাসে ১৭৫ টাকা বেতনে চাকরি করতাম। নতুন ব্যবসায় মাসে আয় দাঁড়াল দুই থেকে তিন হাজার টাকা।’

একপর্যায়ে নিজের জমানো টাকার সঙ্গে বাড়ি থেকে জমি বন্ধক দিয়ে কিছু টাকা এনে কসকো সাবানকে পণ্য সরবরাহ শুরু করলেন। একসময় মৌলভীবাজারে যৌথ অংশীদারত্বে দোকান দিলেন। ছোট ভাইকে সেখানে বসালেন। এটা আশির দশকের শুরুর দিকের ঘটনা। একটা পর্যায়ে মোস্তফা কামালের মাথায় পণ্য আমদানির চিন্তা ঢুকল। বললেন, ‘আমার বিপদের শুরু হলো। পাম তেল আমদানির ঋণপত্র খুললাম। কিন্তু পণ্য দিল নিম্নমানের, তবে খাওয়ার অযোগ্য না।’

পণ্য খালাস করতে বন্দরে বাড়তি টাকা চাইল। মোস্তফা কামাল দিতে পারলেন না। এর মধ্যেই আবার সামরিক শাসনের শুরু। প্রায় দুই বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নথি ঘোরার পর তেল খালাসের অনুমতি পেলেন মোস্তফা কামাল। খরচের তিন ভাগের এক ভাগ দামে তেল বিক্রি করে দিলেন সাবান তৈরির কারখানায়। এখন ব্যাংকের টাকা দেবেন কীভাবে? মোস্তফা কামাল বলেন, ‘তখন ব্যাংকের টাকা মেরে দেওয়ার চিন্তাও কেউ করত না। আমি ব্যাংকে গিয়ে বললাম, অন্য কেউ হলে মাল খালাস করত না। আমি বেকুব, তাই করেছি। এখন সুদ মাফ করে কিস্তির ব্যবস্থা করে দেন।’ব্যাংক সুযোগ দিল। ধীরে ধীরে আয় করে ব্যাংকের টাকা শোধ করে দিলেন।

মেঘনাপারে প্রথম কারখানা

১৯৮৭ সালের দিকে নিজের শ্যালককে নিয়ে গেলেন মেঘনা নদীর তীরে জমি দেখতে। তখন মেঘনা সেতুর কাজ চলছে। গাড়ি থামালেন। এক লোক এসে বললেন, জমি বিক্রি করবেন। ১৫ হাজার টাকা বিঘায় জমি কিনলেন মোস্তফা কামাল। ১৯৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে যাত্রা শুরু করল মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ। বিনিয়োগ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এরপর গুঁড়া দুধ রি-প্যাকিং কারখানা ও সিমেন্ট কারখানা শুরু করেন।

একসময় বড় লোকসানও হলো। ব্যাংকের টাকা বাকি পড়ল। অংশীদার কয়েক স্বজন অন্য ব্যবসা শুরু করলেন। ভাগাভাগিতে লোকসানি প্রতিষ্ঠান পেলেন মোস্তফা কামাল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার জীবনটা অনেক দুঃখের।’

যদিও সেখানে মোস্তফা কামাল থেমে থাকেননি। মেঘনার ব্যবসা এগিয়ে যেতে থাকল। একের পর এক কারখানা হলো। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের খাতিরে। যেমন দুধ বাজারজাত করতে কার্টন কিনতে হতো বাইরে থেকে। সময়মতো দিত না। মান খারাপ করত। মেঘনা নিজেই কার্টনের কারখানা করল পুরোনো একটি ছাপার যন্ত্র বা প্রিন্টিং মেশিন কিনে, যেটির বয়স ছিল ১১০ বছর। হাইডেলবার্গ ব্র্যান্ডের যন্ত্রটি এখনো চলছে।
মোস্তফা কামাল ও অংশীদারেরা নিজেদের ভোজ্যতেল কারখানার নাম দিয়েছিলেন বাগদাদ ভেজিটেবল। ওদিকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলছে। সৌদিরা ইরাকের বিরুদ্ধে। মোস্তফা কামাল সাবিনকো নামের একটি সংস্থায় ঋণ আবেদন করেছিলেন, যার বোর্ডে ছিলেন সৌদি প্রতিনিধি। সেখানে বাগদাদ নাম দিয়ে ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই নাম পাল্টে রাখলেন মেঘনা। কারণ কারখানাটি ছিল মেঘনাঘাটে।

default-image

আজকের মেঘনা

মোস্তফা কামাল শূন্য থেকে শুরু করা একজন সফল ব্যবসায়ী। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর একটি, যার যাত্রা এখনো থেমে যায়নি। বরং গতি অন্যদের তুলনায় বেশি। দেশের ৩৫ হাজার পরিবারের জীবিকার উৎস মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ।

এখন মেঘনা গ্রুপ পারিবারিক ব্যবসাকে একটি করপোরেট রূপ দেওয়া নিয়ে কাজ করছে। এ জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান

প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারসকে (পিডব্লিউসি)। মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি একটি পারিবারিক আইন করে দিয়ে যাব, যেখানে যোগ্যরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ পাবেন। সবাই মুনাফার ভাগ পাবেন। কিন্তু বিক্রি করে চলে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করব।’

মোস্তফা কামাল মাছ, ভাত, শাকসবজি ও ডাল খেতে পছন্দ করেন। তবে পরিমাণে সীমিত। দেশে-বিদেশে ঘোরাঘুরি তাঁর শখ। বিশেষ করে কারখানা দেখা। কারখানা দেখতে গেলে শহর থেকে দূরে যেতে হয়, দেশটাও দেখা হয়ে যায়। নিজে খুব কষ্ট করে বড় হয়েছেন। নিজের জন্মস্থানে শিক্ষার জন্য নানাভাবে সহায়তা করেছেন। বলেন, ‘প্রথম জীবনে জাকাত হিসেবে দরিদ্র মানুষকে শাড়ি আর নগদ টাকা দিতাম। কিন্তু বাবা কখনো সঙ্গে থাকতেন না। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, বাবা আপনি কি সন্তুষ্ট না? বাবা বললেন, একটা শাড়িতে তো কিছুই হয় না। তুমি পারলে শিক্ষার জন্য কিছু করো।’ এরপর মোস্তফা কামাল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

মোস্তফা কামালের পিতা ৬০ টন ক্ষমতার লঞ্চে চাকরি করেছেন, তাঁর ছেলে এখন ১০০টি বড় জাহাজের মালিক। বাবা তা দেখে যেতে পারেননি (১৯৯৫ সালে মারা যান)। টাকার অভাবে মোস্তফা কামালের পরিবার সাদা কেরোসিন কিনতে পারেনি, কিনতে হতো কালো কেরোসিন, যাতে ইঞ্জিন অয়েল মেশানো থাকত। ফলে হারিকেনের কাচ অল্প সময়ের মধ্যেই কালো হয়ে যেত; বিপরীতে তাঁর সন্তানেরা ইউরোপে শিক্ষা পেয়েছেন। হেঁটে ১১ কিলোমিটার দূরের কলেজে যাওয়া সম্ভব হতো না বলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মোস্তফা কামালের প্রতিষ্ঠানে এখন কয়েক হাজার গাড়ি চলে। এই যে এত সফলতা, এর রহস্য কী? মোস্তফা কামালের উত্তর, ‘চেষ্টা করে গেছি, শ্রম দিয়েছি। সঙ্গে মানুষের আস্থা আর মা-বাবা দোয়া।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন