default-image

২২ বছর আগে একটি বায়িং হাউসে তিন হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা মোস্তাফিজ উদ্দিন বর্তমানে রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের সফল উদ্যোক্তা। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডে তাঁর গড়া ডেনিম এক্সপার্ট নামের কারখানা থেকে মাসে গড়ে ১৫ কোটি টাকার ডেনিম পোশাক রপ্তানি হয়। কারখানার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে সাত বছর ধরে সফলভাবে আয়োজন করছেন আন্তর্জাতিক মানের প্রদর্শনী ডেনিম এক্সপো। নিজের প্রতিষ্ঠানের নামের মতোই মোস্তাফিজ সত্যিকারের ডেনিম বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন।

এই মোস্তাফিজ উদ্দিনকে নিয়েই বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম বিবিসি ‘ট্রু কস্ট অব অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ’ শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রচার করেছে ৪ নভেম্বর। সেখানে তাঁর করোনাকালের সংগ্রাম তুলে ধরেছেন গণমাধ্যমটির প্রতিবেদক জেন কোপেসটেক।

পাখির চোখে ঢাকার শত শত দালান। মাঝেমধ্যে দু–চারটি গাছ উঁকি দিচ্ছে। হঠাৎ হাতিরঝিলের ঘোলা পানি। কারখানার ভেতরে একজন নারী শ্রমিক জিনস প্যান্ট আয়রন করছেন। তাঁর আশপাশে কাজ করছেন শত শত শ্রমিক। রাস্তায় হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক ছাতা মাথায় কারখানা থেকে বের হচ্ছেন বা ঢুকছেন।...তথ্যচিত্রের শুরুটা এমনই। প্রতিবেদক জেন কোপেসটেক প্রথমেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত সম্পর্কে সংক্ষেপে কয়েকটি তথ্য দিলেন। বলতে ভুললেন না, বাংলাদেশ বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয়। খাতটিতে কাজ করছেন ৪০ লাখ শ্রমিক। ১৩ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের তথ্যচিত্রে করোনাকালে মোস্তাফিজ উদ্দিনের কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত, কারখানায় ডেনিম কাপড় ও জিনস প্যান্টের স্তূপ, শ্রমিকদের কথা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে তরুণ এই উদ্যোক্তার দৌড়ঝাঁপ, ফ্ল্যাট ও সোনার গয়না বিক্রিসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

তথ্যচিত্র নির্মাণের পেছনের গল্প শুনতে আমরা ৮ নভেম্বর সকালে মোস্তাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছি। তখন তিনি গাড়িতে করে ব্যাংকে যাচ্ছিলেন। বললেন, ‘সর্বশেষ ডেনিম এক্সপো কাভার করতে যুক্তরাজ্য থেকে জেন কোপেসটেক ঢাকায় এসেছিলেন। তো করোনার শুরু হওয়ার পর ক্রয়াদেশ স্থগিত এবং বাতিল হওয়া শুরু হলে তিনি আমার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। প্রায় প্রতিদিনই কথা হতো। প্রতিদিন কী কী ঘটছে, তা তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইতেন।’

গত মাসে ২৬ লাখ ডলার বা প্রায় ২২ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করেছেন মোস্তাফিজ, যা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও মার্চে স্থগিত ও বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশের পণ্যও গত মাসে রপ্তানি হয়েছে।

মোস্তাফিজ উদ্দিন বললেন, ‘তথ্যচিত্রের শুটিংয়ের জন্য জেন কোপেসটেক যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন। তবে ফ্লাইট, করোনা ও ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের জটিলতার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। পরে ঢাকার বিবিসি কার্যালয়ের ৪ জন কর্মী ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে তথ্যচিত্র ধারণ করেন। তথ্যচিত্রে আগের কিছু ফুটেজও ব্যবহার করেছেন জেন।’

করোনায় মোস্তাফিজ উদ্দিনের ১ কোটি ডলার বা ৮৫ কোটি টাকার পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছিল। সেই দুঃসময় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। স্থগিত ও বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশের পণ্য ক্রেতা নিয়েছেন। সামনের দিনে আরও যাবে। কিছু পণ্য যেগুলো ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান নেয়নি, সেগুলো অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছেন।

default-image
শ্রমিকদের প্রতি আমাদের আন্তরিকতা দেখে বিদেশি ক্রেতারাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। একাধিক ক্রেতা আমাদের আগের চেয়ে বেশি ক্রয়াদেশ দিয়েছেন। আসলে আমি লেগে ছিলাম। একবারের জন্যও হাল ছাড়িনি। এই হাল না ছাড়ার কারণেই আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি
মোস্তাফিজ উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড

গত মাসে ২৬ লাখ ডলার বা প্রায় ২২ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করেছেন মোস্তাফিজ, যা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও মার্চে স্থগিত ও বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশের পণ্যও গত মাসে রপ্তানি হয়েছে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানো কীভাবে সম্ভব হলো, জানতে চাইলে মোস্তাফিজ উদ্দিন বললেন, ‘করোনাকালে শুরুতে অনেকে কারখানা লে-অফ করলেও আমরা সে পথে যাইনি। বিপদে কর্মীদের পাশে থেকেছি। তাঁদের বেতন-ভাতা শতভাগ দিয়েছি। সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ায় কাজটি অনেক সহজ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের কারণেই আমরা শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। তাঁরা অনুধাবন করেছেন, তাঁদের জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। শতভাগ বেতন-ভাতা দিতে হেন কোনো কাজ নেই, যা করিনি। তাই শ্রমিকেরাও আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে ভালো কাজ করেছেন। সে জন্য কম সময়ে অনেক পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে।’

মোস্তাফিজ উদ্দিন আরও বললেন, ‘শ্রমিকদের প্রতি আমাদের আন্তরিকতা দেখে বিদেশি ক্রেতারাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। একাধিক ক্রেতা আমাদের আগের চেয়ে বেশি ক্রয়াদেশ দিয়েছেন। আসলে আমি লেগে ছিলাম। একবারের জন্যও হাল ছাড়িনি। এই হাল না ছাড়ার কারণেই আমরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি।’

বিজ্ঞাপন
আমি অখুশি নই। এক, দুই বা তিন সপ্তাহের জন্য ক্রয়াদেশ স্থগিত হলেও সেটির ভার বহন করার সক্ষমতা আমাদের আছে। তবে ক্রয়াদেশ বাতিল হলে টেকা মুশকিল হবে।
মোস্তাফিজ উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড

এদিকে করোনার প্রথম ঢেউ শেষ না হতেই দ্বিতীয় ঢেউ চোখ রাঙাচ্ছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বেশ খারাপভাবে জেঁকে বসেছে করোনা। লকডাউনের দিকেও যাচ্ছে কোনো কোনো দেশ। তার প্রভাবে ইতিমধ্যে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়ার খবর মিলছে। যদিও আপাতত সাময়িক সময়, মানে দু–তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত হচ্ছে। তবে উদ্যোক্তাদের বড় শঙ্কা, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আগামী বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের ক্রয়াদেশ কম দিতে পারেন ক্রেতারা। সেটি হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানো কিছুটা বিলম্বিত হবে।

মোস্তাফিজ উদ্দিন বরাবরই আশাবাদী মানুষ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্রয়াদেশ স্থগিত হওয়া শুরু হলেও বললেন, ‘আমি অখুশি নই। এক, দুই বা তিন সপ্তাহের জন্য ক্রয়াদেশ স্থগিত হলেও সেটির ভার বহন করার সক্ষমতা আমাদের আছে। তবে ক্রয়াদেশ বাতিল হলে টেকা মুশকিল হবে। তারপরও লেগে থাকলে বা হাল না ছাড়লে গল্পটা সব সময়ই ভিন্ন হয়।’ কথাটি যে সত্য তা ‘ডেনিম মোস্তাফিজ’ নিজেই প্রমাণ করেছেন। তাই না!

মন্তব্য পড়ুন 0