কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে চানপুরে চলছে হালিমা টেলিকমের তৈরি ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও চার্জার তৈরির কাজ
কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে চানপুরে চলছে হালিমা টেলিকমের তৈরি ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও চার্জার তৈরির কাজছবি: এম সাদেক, কুমিল্লা

কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে তৈরি হচ্ছে মুঠোফোন, মুঠোফোনের ব্যাটারি, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংকসহ ইলেকট্রনিকসের নানা পণ্য। মাত্র তিন হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে স্বপ্নবান এক যুবক এক দশক আগে গড়ে তোলেন বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। দেশে মুঠোফোনের ব্যাটারি, চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক তৈরিতে এক অগ্রগণ্য প্রতিষ্ঠান হালিমা টেলিকম। কর্মবীর ওই যুবকের নাম আবুল কালাম হাসান ওরফে টগর। স্বল্প পুঁজি নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন তিনি। দেশের ৬৪ জেলায় তাঁর প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রনিকসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ব্যবসা নয়, পাড়া–মহল্লায় যেসব মেয়ে অন্যের বাসায় কাজ করে সামান্য টাকা পেতেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি কারখানায় কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর এ প্রতিষ্ঠানে এখন অন্তত ৯০০ ছেলেমেয়ে কাজ করছেন। এখন তাঁর স্বপ্ন কারখানার তৈরি সামগ্রী বিদেশে ব্যাপকভাবে রপ্তানি করা।

জীবনসংগ্রামের শুরু

সময়টা ছিল ১৯৯৮ সাল। আবুল কালাম হাসানের বয়স তখন ২২ বছর। একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে হোটেল বয় হিসেবে কাজ নেন সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলে। একপর্যায়ে মনে হলো, এভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। জমানো তিন হাজার টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। রাজধানীর ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণফোনের মোবাইলের প্রিপেইড কার্ড বিক্রি শুরু করেন। এই সময়েই ঢাকায় গ্রামীণফোনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি তাঁকে নিজ শহর কুমিল্লায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে গ্রামীণফোনের অনুমোদিত সাব–ডিলার করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৯৯ সালে আবুল কালাম হাসান নিজের শহর কুমিল্লায় ফিরে আসেন এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে গ্রামীণফোনের সঙ্গে যুক্ত হন। গ্রামীণফোনের সিম বিক্রির ব্যবসা শুরুর প্রথম দিনই চালু হয় গ্রামীণফোনের প্রিপেইড প্যাকেজ। ওই সিমের চাহিদা ছিল ব্যাপক। তখন একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাড়তি টাকা নিয়ে সিম বিক্রি করত। কিন্তু আবুল কালাম হাসান নির্ধারিত দামেই সিম বিক্রি করতেন বলে মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা বেড়ে যায়। পরে তিনি গ্রামীণফোনের ডিস্ট্রিবিউটর হন। গ্রামীণফোন থেকে তখন সেরা বিক্রেতারও পুরস্কার পেয়েছেন।

গ্রামীণফোনের সিমের ব্যবসা করতে গিয়ে পুরো জেলার মোবাইল ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছে মোবাইল ফোনের আনুষঙ্গিক পণ্য বা অ্যাকসেসরিজ এনে দেওয়ার দাবি তোলেন। এরপর ঢাকা থেকে মুঠোফোনের যন্ত্রপাতি এনে ব্যবসাটা আরও বাড়ান তিনি। একটি সাইকেল কেনেন তিনি। সাইকেলে করে দোকানে দোকানে গিয়ে মুঠোফোনের চার্জারসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করা শুরু করেন। এ সময়েই আবুল কালাম হাসানের মাথায় নিজেই কিছু করার কথা এল। ওই ভাবনা থেকে ২০১০ সালে পাড়ি জমান চীনে। সেখানে মোবাইল ব্যাটারি, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক তৈরির বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করেন, একই সঙ্গে জেনে নেন মোবাইলের অ্যাকসেসরিজ তৈরির কৌশল। আবুল কালাম হাসান জানান, ‘চীনে গিয়ে দেখতে পেলাম বাংলাদেশে সবাই নকিয়া ও স্যামসাংয়ের তৈরি পণ্য এনে বিক্রি করে। এতে মুনাফা কম হয়। এরপর দেশে এসে স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১০ সালেই মায়ের নামে চালু করি হালিমা টেলিকম।’

বিজ্ঞাপন
default-image

যেভাবে শুরু

২০১০ সালে চীন থেকে ফেরার সময় কিছু কাঁচামাল নিয়ে আসেন টগর। এরপর তিনি চারজনকে নিজেই প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণের পর মোবাইল চার্জার ও ব্যাটারি বানানো শুরু করেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি বা কারিগরি দিক সম্পর্কে কারও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। ফলে সামান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু হতাশ না হয়ে চারজনকে নিয়েই আবার শুরু করেন তিনি। এবার মোবাইল ফোনের চার্জার ও ব্যাটারি ভালো বাজার পায়। আর তিনিও কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে শুরু করেন। ব্যবসাও বাড়তে থাকে। দেশে হালিমা টেলিকমের ব্যাটারি ও চার্জারের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে আবুল কালাম হাসান গোমতী নদীর তীরে চানপুর এলাকায় জায়গা কেনেন। সেখানে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করেন। ৩০ হাজার বর্গফুটের ওই ভবনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে ব্যাটারি, চার্জার ও পাওয়ার ব্যাংক তৈরির কাজ। প্রতিদিন ওই কারখানায় গড়ে ৫০ হাজার মোবাইল চার্জার, ২০ হাজার ব্যাটারি ও দুই হাজার পাওয়ার ব্যাংক তৈরি হয়। এরপর নিজস্ব গাড়িতে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ওই সামগ্রী বাজারজাতকরণের জন্য পৌঁছানো হয়। আবুল কালাম হাসান বলেন, ‘আমার কারখানায় ৩.৪ / ২.৪ / ২ এমএএইচ চার্জার, ১০০০ এমএএইচ থেকে শুরু করে ২৬০০ এমএএইচ ব্যাটারি ও ১০ হাজার এমএএইচ পর্যন্ত পাওয়ার ব্যাংক বানানো হচ্ছে।’

কারখানার শ্রমিক নুসরাত জাহান, ইমরান হোসেন, মিলি বেগম একই পরিবারের সদস্য। তিনজনেই ২৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন পান। তাঁরা বলেন, ‘আগে আমরা অতি নিম্নমানের কাজ করতাম। এখন হালিমা টেলিকমে কাজ করে ভালো বেতন পাচ্ছি। পরিবারকে টাকা নিয়ে ভালোভাবেই চলতে পারছি।’

২০১৫ সালেই সারা দেশে আমার প্রতিষ্ঠানের তৈরি চার্জার, ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাংক এক নম্বরে চলে আসে। সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে আমাকে পুরো দেশ অন্তত ৫০ বার ঘুরতে হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ৩৭৫ জন ডিলার, ৪০০ বিক্রয়কর্মী মাঠে আছেন।
আবুল কালাম হাসান

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সালমা বেগম বলেন, এই কারখানার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এখানে পিছিয়ে পড়া ও অনগ্রসরমাণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী বানানো হয়। শুধু ব্যবসা নয়, সমাজের মানুষের জন্য কাজ করা হয়। এটা একধরনের সামাজিক ব্যবসা। গ্রামের মেয়েরা ইলেকট্রনিকসের কাজ করছে। এটা অনেক বড় ব্যাপার।

default-image

আবুল কালাম হাসান যা বলেন

চারজন দিয়ে কারখানা শুরু করি। এখন মোবাইল চার্জার, ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাংক তৈরি করছে ২৭৫ জন মেয়ে ও ১৭৫ জন ছেলে। এদের প্রশিক্ষণ আমিই দিই। এদের মধ্য থেকে অতি প্রতিভাবান একজনকে নেতৃত্বে আনি, যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সবাই মিলে দক্ষ কর্মী তৈরি করি। এই কারখানার কর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী করা হয়। হালিমা আমার মায়ের নাম। ওই নামেই আমি ব্র্যান্ডিং শুরু করি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নাম নিয়ে কেমন জানি করত। পরে আমি ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ দিয়ে বাজারজাত শুরু করি। পুরো দেশের আনাচকানাচে ঘুরে আমার তৈরি জিনিস কেনার জন্য ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করি।

আবুল কালাম হাসান আরও বললেন, ২০১৫ সালেই সারা দেশে আমার প্রতিষ্ঠানের তৈরি চার্জার, ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাংক এক নম্বরে চলে আসে। সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে আমাকে পুরো দেশ অন্তত ৫০ বার ঘুরতে হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ৩৭৫ জন ডিলার, ৪০০ বিক্রয়কর্মী মাঠে আছেন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমি কুমিল্লা অঞ্চলে সেরা করদাতার পুরস্কার পাই। এখন আমার স্বপ্ন, হালিমা গ্রুপের পণ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও থাইল্যান্ডে রপ্তানি করা। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার। কেননা আমার দেশে তৈরি পণ্যের মান ভালো, টেকসই ও মজবুত।

আবুল কালাম হাসান হালিমা ইলেকট্রনিকস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুপি ইউনিয়নের পিড়াতলি এলাকায় ৪০ হাজার বর্গফুটের জায়গা নিয়ে এই কারখানা। কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি এনে এলইডি লাইট, এনার্জি লাইট, ক্লিয়ার বাল্ব, টিউবশেট, ব্যাকলাইট, গ্যাং ও পিয়ানো সুইচ, সার্কিট ব্রেকার ও হোল্ডার তৈরি করা হয়। সেখানেও ৩০০ জন মেয়ে ও ১৫০ জন ছেলে কাজ করছেন। হালিমা টেলিকম থেকে ব্যবসা বাড়িয়ে আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান করা হয়। এগুলো হচ্ছে হালিমা ইলেকট্রনিকস, হালিমা ট্রেডার্স, হালিমা ওয়ার্ল্ড, এইচটিই ও নিউক্লিক গ্লোবাল। আবুল কালাম হাসান বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে তাঁর উৎপাদিত পণ্য নিয়ে কাতার ও থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেন।

সর্বশেষ খবর হচ্ছে, হালিমা টেলিকম চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বাজারে নিয়ে এসেছে মুঠোফোন সেট। এর দামও নাগালের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন
উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন