এক বছর আট মাসেই ডিএমডি!

নিয়োগ-পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনকানুন অনুসরণের ধার ধারছে না রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক।
ব্যাংকিং কাজে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও রুহুল আলম নামে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সরাসরি উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে নিয়োগ দিয়েছিল বেসিক ব্যাংক। সেটা ২০১২ সালের এপ্রিলে।এই পদে চাকরি স্থায়ী হওয়ার আগেই মাত্র সাত মাসের মাথায় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাঁকে।
পদোন্নতির কারণ হিসেবে পরিচালনা পর্ষদের নথিতে তখন ‘অতিচমৎকার কর্মনৈপুণ্যের জন্য পদোন্নতি দেওয়া হলো’ বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এসব কথা জানালেও কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে এতে চুপ থাকে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বছর না ঘুরতে এবার সেই রুহুল আলমকেই করা হলো বেসিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)। অথচ জিএম পদে পদোন্নতি পেতে গেলেই ডিজিএম পদে কমপক্ষে তিন বছরের কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং ব্যাংকিং কাজে কমপক্ষে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পর্ষদ সভায় উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, এই পদোন্নতির সিদ্ধান্তে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন বেসিক ব্যাংকে নিয়োগ করা বাংলাদেশ ব্যাংকেরই পর্যবেক্ষক অশোক কুমার দে। কোনো রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে এমন নিয়োগ এবং এত দ্রুততম সময়ে পদোন্নতির ঘটনা এটিই প্রথম বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
সব সময় উজ্জ্বল ভাবমূর্তি নিয়ে থাকা বেসিক ব্যাংক বর্তমান সরকার আমলে প্রথমবারের মতো খারাপ অবস্থায় পড়ে। অনিয়ম-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও বেনামি ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা চলে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ১৫ শর্তে এই ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে গত জুলাইয়ে। কিন্তু এসব শর্তও অমান্য করে ব্যাংকটি। বাধ্য হয়ে গত ২৭ নভেম্বর বেসিক ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ ১-এর মহাব্যবস্থাপক অশোক কুমার দে এই দায়িত্ব পান।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু এবং অশোক কুমার দে—উভয়েরই গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। অনিয়মের যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবরই বেসিক ব্যাংকের প্রতি বিশেষ আনুকূল্য দেখিয়েআসছে।
পর্যবেক্ষক নিয়োগের পর পরিচালনা পর্ষদের প্রথম বৈঠক হয় গত শনিবার। এতে রুহুল আলমসহ ব্যাংকের আরেক জিএম মো. সেলিমকে পদোন্নতি দিয়ে ডিএমডি করা হয়।
রুহুল আলমকে বেসিক ব্যাংকে ডিজিএম নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এক বছর আট মাস আগে। সাত মাসের মাথায়ই তাঁকে জিএম করা হয়। ব্যাংক পেশার সব মিলিয়ে এক বছর আট মাসের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই রুহুল আলমকে পদোন্নতি দিয়ে বসানো হয় ব্যাংকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডিএমডি পদে।
এদিকে, আরেক ডিএমডি মো. সেলিমের পদোন্নতিতেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে হয়েছে বলে বেসিক ব্যাংকেরই কর্মকর্তারা বলছেন। মো. সেলিম অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘পদোন্নতি হয়েছে দক্ষতা বিবেচনায়। আমার পদোন্নতির বিষয়টি নতুন সিদ্ধান্ত নয়। এ ব্যাপারে কয়েক মাস আগেই পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
দেশের বৃহত্তম সোনালী ব্যাংকে তিনজন ডিএমডি থাকলেও বেসিক ব্যাংকে রয়েছেন মোট ছয়জন ডিএমডি।
বেসিক ব্যাংক সূত্র জানায়, অন্য ডিএমডি আবদুল কাইয়ুম মোহাম্মদ কিবরিয়া এবং এ মুনায়েম খানকে শাস্তিমূলক বদলি করে ঢাকার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মোহাম্মদ কিবরিয়া চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং মুনায়েম খান রাজশাহী অঞ্চলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁরা দুজনও একসময় চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে ওই ব্যাংকেরই কর্মকর্তারা জানান। বাকি দুই ডিএমডি ফজলুস সোবহান ও কনক কুমার পুরকায়স্থ প্রধান কার্যালয়ে রয়েছেন।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা পর্যবেক্ষক অশোক কুমার দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। পরে মুঠোফোনে বহুবার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অবশ্য সদ্য ডিএমডি হওয়া রুহুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করছেন না। তবে নিবেদিতপ্রাণ এবং কাজের দক্ষতা বিবেচনায় ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতি অনুযায়ী পর্ষদ তাঁকে পদোন্নতি দিয়েছে। অভিজ্ঞতা না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং বিষয়ে আমি অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছি।’