বিজ্ঞাপন
করোনার প্রভাবে ঘরের বাইরে গমের তৈরি খাবারের চাহিদা কমেছে। গম আমদানি কমার মূল কারণ এটি। তবে করোনার প্রভাব কমলে এই চাহিদা বাড়বেই। কারণ, ভাত ছাড়া সিংহভাগ খাবারই গম থেকে তৈরি হয়।
আবুল বশর চৌধুরী চেয়ারম্যান, বিএসএম গ্রুপ

চালের পরই দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য হলো গম। চালের একমাত্র ব্যবহার ভাত ও পিঠা তৈরিতে। আর ভাতের বাইরে মানুষ যত খাবার খায়, তার সিংহভাগই তৈরি হয় গম থেকে। গমের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি রুটি, পরোটা ও বিস্কুট তৈরিতে। আর সাধারণ রেস্তোরাঁ থেকে অভিজাত রেস্তোরাঁ—সবখানেই গমের তৈরি খাবার। গমের তৈরি বিস্কুটসহ নানা খাদ্যপণ্য রপ্তানিও হয়।

খাদ্যশস্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ ও ডায়াবেটিস রোগীরা আগে যেমন ঘরে গমের তৈরি খাবার খেতেন, এখনো খাচ্ছেন। ঘরে চাহিদা সে অর্থে কমেনি। করোনার প্রভাবে ঘরের বাইরে গমের তৈরি খাবারের চাহিদা কমেছে। গম আমদানি কমার মূল কারণ এটি। তবে করোনার প্রভাব কমলে এই চাহিদা বাড়বেই। কারণ, ভাত ছাড়া সিংহভাগ খাবারই গম থেকে তৈরি হয়।

রেস্তোরাঁয় যত খাবার তৈরি হয়, তার অন্যতম উপকরণ আটা-ময়দা। করোনার সময় বিক্রি অস্বাভাবিক কমে গেছে। তাতে আগের মতো আটা-ময়দা ব্যবহার হচ্ছে না।
মনজুরুল হক কর্ণধার, বারকোড রেস্তোরাঁ গ্রুপ

দেশে চাহিদা অনুযায়ী গম উৎপাদিত হয় না। এ জন্য গমের চাহিদা মেটাতে আমদানির বিকল্প নেই। গম থেকে আটা-ময়দা ও সুজি তৈরিতে দেশের কয়েকটি শিল্প গ্রুপের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। আবার আটা-ময়দা থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরিতে ছোট থেকে মাঝারি ও বড় কারখানা রয়েছে। আর এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি হয় ফুটপাত থেকে অভিজাত রেস্তোরাঁ, মুদিদোকান থেকে সুপারশপ, বেকারি, মিষ্টির দোকান—সবখানেই। তাতে এই পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে বিপুলসংখ্যক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি করছে। গম আমদানি কমে যাওয়ার অর্থ প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়া।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গমের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয় হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বেকারিতে। করোনায় বিধিনিষেধের সময় অনেক হোটেল, রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকছে। আবার খোলা থাকলেও এখন মানুষ বাইরের খাবার কম খাচ্ছে। বেকারি পণ্যও আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না। ফুটপাতের বিক্রেতারাও জানাচ্ছেন, আটা-ময়দার তৈরির খাদ্যপণ্য বিক্রি হচ্ছে কম। আবার সাধারণ মানের পাশাপাশি অভিজাত রেস্তোরাঁর কর্ণধারদের সঙ্গে কথা বলে বিপণন কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামের অভিজাত বারকোড রেস্তোরাঁ গ্রুপের কর্ণধার মনজুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, রেস্তোরাঁয় যত খাবার তৈরি হয়, তার অন্যতম উপকরণ আটা-ময়দা। করোনার সময় বিক্রি অস্বাভাবিক কমে গেছে। তাতে আগের মতো আটা-ময়দা ব্যবহৃত হচ্ছে না। একই কথা বললেন সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসোর স্বত্বাধিকারী ও এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন। তিনি জানান, অভিজাত রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় আটা-ময়দা। করোনার সময় চট্টগ্রামে সিংহভাগ রেস্তোরাঁ বন্ধ রয়েছে। খোলা থাকলেও বিক্রি কম।

ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঘরের বাইরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হলেও ঘরে খাদ্যাভ্যাসে গমের চাহিদা খুব একটা কমেনি। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যাঁদের অনেকেই এক বেলা ভাতের পরিবর্তে রুটি খান। আবার গমের চেয়ে চালের দামের ব্যবধান বেশি হলে গরিব মানুষ গমের তৈরি খাবারে ঝুঁকছেন। খাদ্যাভ্যাসে তা এখনো ঠিক আছে। আবার গমের তৈরি খাদ্যপণ্য রপ্তানিও বেড়েছে। এই দুই জায়গায় চাহিদা কমেনি। যদিও গমের ব্যবহার এই দুই জায়গায় সামগ্রিকভাবে খুব বেশি নয়।

গমের চাহিদা কমার প্রভাব কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, করোনায় বাধ্যতামূলকভাবে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাতে দেশে গমের চাহিদা কমে গেছে। শর্করাজাতীয় খাদ্যের মধ্যে চালের চেয়ে গমের পুষ্টিমান ভালো। খাদ্যাভ্যাসে বাধ্যতামূলক এই পরিবর্তন পুষ্টিমানে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, তা নজরে রাখা দরকার।

গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, গমের ব্যবহার বৃদ্ধির ইতিবাচক দিক রয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আমদানি পণ্য হলেও আমদানি
কমায় গম প্রক্রিয়াজাত ও বিপণনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমছে। করোনার বর্তমান পরিস্থিতি কত দিন থাকবে, তার ওপর নির্ভর করছে এ কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন