কষ্ট বাড়াবে নতুন ভ্যাট আইন
>দেশি ব্র্যান্ডের কাপড়চোপড়, ভোজ্যতেল, চিনি, সুপার শপ, নির্মাণসামগ্রীর রড, বিদ্যুৎ বিল, সোনার গয়না ইত্যাদিতে আগের চেয়ে বেশি হারে মূসক দিতে হবে
নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক, যা ভ্যাট নামে অধিক পরিচিত) আইনে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে। বেশ কিছু ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে বেশি হারে ভ্যাট দিতে হবে। এই তালিকায় আছে দেশি ব্র্যান্ডের কাপড়চোপড়, ভোজ্যতেল, চিনি, সুপার শপ, নির্মাণসামগ্রীর রড, বিদ্যুৎ বিল, সোনার গয়না ইত্যাদি।
নতুন আইন অনুযায়ী, সঠিকভাবে হিসাব রেখে ব্যবসায়ীরা রেয়াত নিতে না পারলে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বহু জিনিসপত্র ও সেবায় ভোক্তা পর্যায়ে ভ্যাট বেড়ে যাবে। এতে অনেক জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাহলে সীমিত আয়ের, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসার খরচও বাড়বে। এই আইনে ভ্যাট বা মূসকের টাকা অন্তর্ভুক্ত করেই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করতে হবে।
ভোক্তা পর্যায়ে জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের অবস্থান পরস্পর বিরোধী। এনবিআর দাবি করছে, ব্যবসায়ীরা সঠিকভাবে হিসাব রাখতে পারলে দাম তো বাড়বেই না; বরং কমবে। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, জটিল এই আইনের কারণে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়বে। রেয়াত নেওয়াও কঠিন হবে।
মূসক বা ভ্যাট কখনোই ব্যবসায়ী বা বিক্রেতার দায় নয়। শেষ পর্যন্ত এটি পরিশোধ করেন ভোক্তারাই। নতুন আইনে পণ্যের আমদানি কিংবা উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি স্তরে মূল্য সংযোজন হলেই মূসক আরোপ হবে। ব্যবসায়ীরা যে মূসক দেবেন; তা পরের স্তরের কাছে বিক্রি করার সময় রেয়াত নিয়ে ফেলবেন। অর্থাৎ, ওই ব্যবসায়ী যে টাকা মূসক দিয়েছিলেন, তা কেটে রাখবেন। তাই ব্যবসায়ীর ঘাড়ে মূসক চাপবে না। শেষ পর্যন্ত মূসক ভোক্তার ওপরই চাপবে। ভোক্তাই সব মূসক দেন।
দীর্ঘদিন ধরেই এ আইনের ১৫ শতাংশ মূসক হার কমানোর জন্য ব্যবসায়ীরা দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে গত রোববার বাজেট-সংক্রান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের যৌথ পরামর্শক সভায় ব্যবসায়ীদের দাবি মানা না হলে আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন হলে তা দমনের পাল্টা হুমকিও দিয়েছেন ওই সভার প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নতুন মূসক আইন বাস্তবায়িত হলে পণ্যের দাম শুরুতেই বেড়ে যাবে, যা ভোক্তাকে বেশ ভোগাবে। মূসকের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতি হবে। অবশ্য পরে বাড়তি মূল্যেই পণ্যের দাম ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ‘রেয়াতি হারে মূসক রাখার পক্ষে আমি নই। মূসক সবক্ষেত্রেই এক হার হতে হবে। তবে ১৫ শতাংশ মূসক একটু বেশিই। এটা ১০ শতাংশ করা উচিত।’
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন মূসক আইন বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ট্যারিফ লাইনের প্রায় ৭৫ শতাংশ পণ্যের আমদানি কিংবা উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রি পর্যায়ে সরাসরি ১৫ শতাংশ মূসক আরোপিত হবে। এখন যেসব পণ্য বা সেবার ওপর দেড় থেকে ১০ শতাংশ হারে মূসক আছে, তাতেও ১৫ শতাংশ মূসক বসবে।
কিছু উদাহরণ
আড়ং, দেশি দশ, প্রবর্তনা, সাদাকালো, কে ক্রাফট, বাংলার মেলা, ঐতিহ্য—এসব তৈরি পোশাকের নামকরা দেশি ব্র্যান্ড। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও এখন উৎসব-পার্বণে এসব দেশি ব্র্যান্ডের বাহারি ডিজাইনের শার্ট, পায়জামা-পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি কেনেন। দেশি ব্র্যান্ডের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শোরুমে সেবা প্রদানের জন্য ক্রেতারা যত টাকার পণ্য কেনেন, তাতে ৪ শতাংশ মূসক দিতেও হয়তো কার্পণ্য নেই।
কিন্তু ১ জুলাই থেকে মূসক এক লাফে ১৫ শতাংশ হয়ে যাবে। এক হাজার টাকার বাজার, কাপড়চোপড় কিনলে এখন ওই সেবার বিপরীতে ৪০ টাকা মূসক দিতে হয়। নতুন হিসাবে সেটা বেড়ে ১৫০ টাকা হবে।
দেশি ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির সভাপতি ও সাদাকালোর কর্ণধার আজহারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ শতাংশ মূসক আরোপিত হলে দেশি পোশাক কেনার আগ্রহ হারাবে ক্রেতা। কেননা, এতে পোশাকের দাম বাড়বে। তাঁর মতে, কাপড় কেনার সময় তাঁতি মূসক চালান দিতে পারবেন না। আবার ওই তাঁতি উপকরণ রেয়াতও নিতে পারবেন না। কারণ ওই তাঁতি যখন সুতা, রং কেনেন; তখন তো রসিদ পান না। এভাবে প্রতিটি স্তরেই বেশি মূসক দিতে হবে; যা প্রস্তুত কাপড়চোপড়ের দাম বাড়িয়ে দেবে। এটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপবে।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে বাজার-সদাই করতে চান। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরসহ বড় বড় শহরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সুপার শপের জমজমাট ব্যবসা আছে। অবশ্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এসব সুপার শপে বাজার করলে মোট কেনাকাটার ওপর ৪ শতাংশ হারে মূসক দিতে হয়। নতুন আইনে সেখানে ১৫ শতাংশ হারে মূসক দিতে হবে।
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়; পাড়া-মহল্লায় এমন শত শত রেস্তোরাঁ আছে। এসব রেস্তোরাঁয় খাবারের বিলের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ মূসক আছে। ১ জুলাইয়ের খাবারের বিলের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক দিতে হবে। যদিও বহু রেস্তোরাঁয় গ্রাহককে এই মূসকের চালান দেওয়া হয় না।
ওপরের তিনটি খাতেই সেবার বিপরীতে মূসক আদায় করা হয়। পণ্যের ক্ষেত্রে আগে থেকেই মূসক অন্তর্ভুক্ত করে দাম হিসাব করা সম্ভব। কিন্তু ভোক্তা কতটা সেবা নেবেন বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কতটুকু সেবা সৃষ্টি করবে, তা আগে থেকে ঠিক করা সম্ভব নয়। দেশি পোশাকের ব্র্যান্ডের শোরুম, সুপার শপে গিয়ে ক্রেতা কত টাকার কেনাকাটা করেন বা রেস্তোরাঁয় গিয়ে কত টাকার বিল দিলেন, সেটাই সেবা সৃষ্টির ভিত্তি ধরা হয়। এর ওপরই ১৫ শতাংশ মূসক আরোপিত হবে।
রান্নাঘরেও ভ্যাটের প্রভাব
এবার আসা যাক পণ্যের কথায়। তেল ছাড়া রান্না করার কথা তো প্রায় চিন্তাই করা যায় না। নতুন মূসক বা ভ্যাট আইনটি ছুঁয়ে যাবে এই ভোজ্যতেলকেও। এখন সয়াবিন তেল ও পাম অয়েল আমদানিতে কোনো মূসক দিতে হয় না। ১ জুলাই থেকে ১৫ শতাংশ মূসক দিতে হবে। এতে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের আগেই বন্দর থেকে বেরোনোর আগেই ১৫ শতাংশ মূল্য বেড়ে যাবে। ভোক্তার কাছে আসা পর্যন্ত স্তরে স্তরে দাম বাড়বে। শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে বেশি দামেই ভোজ্যতেল কিনতে হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়লেও মূসকের কারণে স্থানীয় বাজারেও আনুপাতিক হারে দাম বাড়বে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় তেল ও চিনি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ ও হিসাব) বিশ্বজিৎ সাহা প্রথম আলোকে জানান, নতুন আইনে প্রতি স্তরে ভ্যাট বসলে চিনি ও তেলের দাম বেড়ে যাবে। এই উদ্বেগের কথা তাঁরা (ব্যবসায়ীরা) সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে জানিয়েছেন।
সিটি গ্রুপের কাছ থেকে সরবরাহ আদেশ (এসও) কিনে ব্যবসা করেন পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের বাণিজ্য বিতানের মালিক আবুল হাশেম। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন প্যাকেজ মূসক দিই, যা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করি না। নতুন ব্যবস্থায় টার্নওভার কর বা মূসক যা দেব, তা গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করব। এতে পণ্যমূল্য বাড়বে।’
ভ্যাট বিদ্যুৎ বিলেও: বিদ্যুৎ বিলের ওপর এখন ৫ শতাংশ হারে মূসক দিতে হয়। এর মানে হলো বিদ্যুৎ বিল ১০০ টাকা হলে মূসক ১০৫ টাকা পরিশোধ করতে হয়। নতুন মূসক আইন হলে বিদ্যুৎ বিলের ওপর মূসক ১৫ শতাংশ হয়ে যাবে। কোনো গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল এখন যদি এক হাজার টাকা হয়; তাহলে ৫০ টাকা মূসক দিতে হয়। নতুন আইন হলে ওই ব্যক্তিকে ১৫০ টাকা মূসক দিতে হবে। খরচ বাড়বে ১০০ টাকা। বিদ্যুতের দাম সরকার নির্ধারণ করে দেয়। তাই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারকে ইউনিটপ্রতি দাম কমাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকেও রেয়াত নিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য কমাতে হবে।
বাড়বে নির্মাণ ব্যয়: বাড়ি করতে চান? সেখানেও খরচ বাড়াবে এই মূসক। বাড়ি করতে রড অপরিহার্য। ট্যারিফ মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় এখন স্থানীয় পর্যায়ে এমএস রডের টনপ্রতি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলেই হয়। কিন্তু নতুন আইনে রডের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক বসবে। রডের বাজার প্রায়ই ওঠানামা করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক হিসাবে বলা হয়েছে, বর্তমান বাজারমূল্যে টনপ্রতি ২ হাজার ৮০০ টাকার মতো বাড়বে। এতে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণেই প্রভাব পড়বে না; পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পেও খরচ বাড়বে।
নতুন আইন বাস্তবায়িত হলে বেশি প্রভাব পড়বে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে এবং নির্ধারিত মূল্যের (ট্যারিফ মূল্য) ওপর যেসব পণ্য বা সেবা পর্যায়ে মূসক আদায় করা হয়, সেসব খাতে সরাসরি ১৫ শতাংশ হারে মূসক প্রযোজ্য হবে। কেননা, নতুন আইনে মূসক হার কমিয়ে বসানোর সুযোগ নেই।
এবার আসা যাক কোন কোন সেবার ওপর রেয়াতি সুবিধা আছে। বর্তমানে ১৫ ধরনের সেবায় সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে মূসক আরোপ করা হয়। এই হার দেড় থেকে ১০ শতাংশ। নতুন আইনে ওই সেবাতেই ১৫ শতাংশ হারে মূসক বসবে। এতে খরচ বাড়বে ফ্ল্যাট কেনা, আসবাবপত্র কেনা, গাড়ি মেরামত, গাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন সেবায়। এ ছাড়া বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ৮৫টি পণ্যে ট্যারিফ মূল্যের ওপর ভিত্তি করে মূসক আরোপ করা হয়। এই ব্যবস্থা উঠে গিয়ে উৎপাদন পর্যায় থেকে সরবরাহ পর্যায়ে যাওয়ার জন্য যে লেনদেন মূল্য থাকবে, এর ওপরই মূসক বসবে। যেমন চিনি আমদানি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রড ও সয়াবিন তেল ছাড়া কোনো পণ্যের দামই বাড়বে না। এটা গবেষণা করে দেখানো যাবে। তিনি আরও জানান, নতুন আইনে পণ্যের খুচরা দাম ঠিক করতে হবে মূসকের টাকা অন্তর্ভুক্ত করেই। আলাদা করে মূসক নেওয়া যাবে না। ভোক্তার পকেট থেকে এক টাকাও বাড়তি যাবে না। বিষয়টি নির্ভর করবে ব্যবসায়ীর ব্যবসায় নৈতিকতা এবং সঠিকভাবে হিসাব রেখে রেয়াত নেওয়ার ওপর।
ছাড়: আইনে মৌলিক খাদ্য, নির্ধারিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহনসেবা, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মৎস্য চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবা—এসব ক্ষেত্রে মূসক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বাকি সব ক্ষেত্রেই আমদানি বা উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রি পর্যায়ে মূসক বসবে।
এনবিআরের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন মূসক আইন হলে ট্যারিফ লাইনের ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক আরোপিত হবে। বর্তমানে ট্যারিফ লাইনে ৬ হাজার ৪৭৩ ধরনের পণ্য আছে। সেই হিসাবে ৪ হাজার ৮১৬ ধরনের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ হারে মূসক বসবে। বর্তমানে ১ হাজার ৯৮৩টি পণ্য ও সেবায় মূসক দিতে হয় না।