default-image

পোড়ামাটির খুরি, চাকতি, মোটা কাগজ, সুতা, মাটির খুদে চাকা, বাঁশের কাঠি, পশুর চামড়া—এসব দিয়ে তাঁরা রংবেরঙের টমটম, টরটরি, ঘিন্নি, বেহালা ইত্যাদি খেলা তৈরি করেছেন। কাঠের গাড়ি আর প্লাস্টিকের হরেক রকম খেলনাও বানিয়েছেন।

চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ—এই তিন মাসের মেলা মৌসুম সামনে রেখে তাঁদের এই প্রস্তুতি। অনেকে তো ধারদেনা করেও পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন। আশা ছিল, সারা দেশে খেলনা বিক্রি করবেন, গত বছরের লকডাউনজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নেবেন, মৌসুম শেষে একেকজন কারখানার মালিকের গড়ে এক লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

বলা হচ্ছে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাশ গ্রামের কথা, যেখানে আড়াই শ কারখানা প্রায় দুই কোটি টাকার খেলনার বিশাল মজুত নিয়ে বিপাকে পড়েছে। বাড়ির নারী আর কারিগরেরা কয়েক মাস ধরে দিনরাতে উৎসবের আমেজে এসব খেলনা তৈরি করেছেন, যা নিয়ে খোলাশের খেলনাপল্লিতে এখন শুধুই হতাশা। ব্যবসায়ীরা যেমন দিশেহারা পুঁজি হারানোর শঙ্কায়, তেমনি কাজ হারানোর আতঙ্কে কারিগরদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ।

খোলাশ গ্রামে খেলনা তৈরির ঐতিহ্য প্রায় ৬০ বছরের। শুরুটা ষাটের দশকে। দারিদ্র্যপীড়িত খোলাশ গ্রামের তিনজন দিনমজুর কুরানু মোল্লা, আবুল হোসেন ও সুলতান ফকির কাজের খোঁজে নীলফামারীর সৈয়দপুরে যান। সেখানে তাঁরা অবাঙালি বিহারিদের খেলনা কারখানায় কাজ নেন এবং দ্রুত সবাই পাকা কারিগর হয়ে ফিরে আসেন গ্রামে। নিজেরাই নানা ধরনের খেলনা তৈরি করতে শুরু করেন। তাঁদের তৈরি খেলনাগুলো সারা দেশে বাজার পায় এবং গ্রামীণ মেলা, উৎসব-তিথি-পার্বণে শিশুদের নজর কেড়ে নেয়। খেলনার চাহিদা বাড়ায় দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামটির অন্য মানুষেরাও খেলনা তৈরির কাজে জড়িত হন।

বিজ্ঞাপন

৬০ বছর ধরে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র—এই তিন মাস ছাড়া বছরের বাকি ৯ মাসই খোলাশ গ্রামে দিনরাত খটখট শব্দে খেলনা তৈরির কর্মযজ্ঞ চলে। বড় কারখানাগুলো চলে বৈদ্যুতিক মোটরে। বাড়ির উঠানে-আঙিনায় কারিগরদের খুলি-কাঠ, বাঁশ আর রংবেরঙের কাগজ দিয়ে টমটম গাড়ি বা টরটরি, কাঠের গাড়ি, চরকি, কাঠের পাখি, বেহালা, সারিন্দা, ঘিন্নিসহ হরেক খেলনা তৈরির ধুম। আর বাড়ির ভেতরে নারী ও কিশোরীরা ওই সব খেলনায় রং লাগানো ও কাগজে আলপনা আঁকায় ব্যস্ত।

তবে বিক্রির ভরা মৌসুম হলো চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাস। কারণ, এই তিন মাসে সারা দেশে শত শত মেলা ও উৎসব বসে। যেমন ঢাকায় রমনার বৈশাখী মেলা, আজিমপুরের মেলা ও দোহারের নুরুল্যাপুর মেলা; চট্টগ্রামের লালদীঘির জব্বারের মেলা; সানাল ফকিরের মেলা; কুষ্টিয়ার লালন মেলা; যশোরের মধুমেলা; ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া মেলা; দিনাজপুরের চরকাই মেলা, আমবাড়ি মেলা ও গোপালপুর চৌধুরী মেলা; জয়পুরহাটের গোপীনাথপুর মেলা; বগুড়ার পোড়াদহ, কেল্লাপশী ও গাংনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। সেই সঙ্গে সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ দেশের অন্যান্য এলাকার মেলায় ও বাজারে খোলাশের খেলনা যায়।

ব্যবসায়ী–কারিগরেরা জানান, তাঁদের তৈরি খেলনা যেমন সারা দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নেন, তেমনি তাঁরা নিজেরাও মেলায় মেলায় গিয়ে বিক্রি করেন। কিন্তু করোনার কারণে গত বছরের মার্চ থেকে খেলনা ব্যবসায় বিপর্যয় চলছে। টানা কয়েক মাস হাত গুটিয়ে বসে থাকার পর নতুন মৌসুম উপলক্ষে তাঁরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই আবার করোনার বাগড়া। এতে হুমকির মুখে পড়েছে খোলাশের খেলনাশিল্প।

খেলনা তৈরির পেশার সঙ্গে জড়িত কারিগরদের তালিকা তৈরি করে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
এস এম জাকির হোসেন, ইউএনও, দুপচাঁচিয়া উপজেলা, বগুড়া।

সরেজমিনে খোলাশে গিয়ে প্রবীণ কারিগর আফজাল ফকিরের (৭৭) সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর ধরে সারা দেশের বিভিন্ন মেলা ও উৎসবে খেলনা বিক্রি করে আসছি। কিন্তু করোনার কারণে এক বছর ধরে খেলনাপল্লিতে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, এ রকম দুঃসময় গত ৬০ বছরে কখনো দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, গত বছর করোনা ও লকডাউনের কারণে বিক্রি করতে না পারায় একসময় খেলনা নষ্ট হয়ে যায়। এতে কমপক্ষে এক কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

কারিগর আনোয়ার প্রামাণিক বলেন, ‘গতবার করোনা ও লকডাউনের কারণে ১০ হাজার খেলনা নষ্ট হয়েছে। এবারে ১৩ হাজার খেলনা মজুত করেছিলাম। এখন উৎসব বন্ধ হওয়ায় আবার লোকসানের মুখে পড়লাম।’ মুকুল প্রামাণিক নামের আরেকজন বলেন, ‘২২ বছর ধরে খেলনা তৈরি করে কুমিল্লা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করে আসছি। গত বছর করোনার কারণে মেলা বন্ধ থাকায় ৯০ হাজার টাকার খেলনা গুদামে নষ্ট হয়েছে। ধারদেনা করে এবার ৬০ হাজার টাকার টমটম, টরটরি, চরকি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এবারও বৈশাখী উৎসব বন্ধ করার কারণে পুঁজি হারিয়ে পথে বসার জোগাড়।’

দুপচাঁচিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জাকির হোসেন অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘খেলনা তৈরির পেশার সঙ্গে জড়িত কারিগরদের তালিকা তৈরি করে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।’

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন