চিনি মিষ্টি, দাম তেতো

চিনির দাম বাড়ছে, সরকারের আয়ও বাড়ছে, বাড়তি খরচ হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের

রাজধানীর বাজারে আবারও বেড়েছে নিত্যপণ্য চিনির দাম। কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে চিনির দর উঠেছে ৭৩ থেকে ৭৫ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, ঠিক এক বছর আগের তুলনায় এখন চিনির দাম ৭৫ শতাংশ বেশি।

আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দামও একটু বেশি। তবে এর চেয়েও বেশি দামে চিনি কিনে খেতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সরকারি চিনিকলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকার চিনির ওপর করও বাড়িয়ে রেখেছে। সরকার এখন প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা করে কর পাচ্ছে। ফলে চিনি কিনতে ভোক্তাদের অস্বস্তি বাড়লেও আয় বাড়ছে সরকারের। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি চিনি থেকে সরকারের মোট রাজস্ব আয় ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের (বিটিসি) এক প্রতিবেদনে।

এদিকে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) তাদের মিলে উৎপাদিত চিনির দামও কেজিতে ১২ টাকা বাড়িয়েছে। এখন থেকে তারা মিল থেকে ৪৮ টাকার বদলে ৬০ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি করবে। অন্যদিকে তাদের প্যাকেটজাত চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ঠিক করা হয়েছে কেজিপ্রতি ৭০ টাকা, যা আগের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি।

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দাম আরও বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো। আজ বৃহস্পতিবার ট্যারিফ কমিশনে ভোজ্যতেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে একটি বৈঠক আছে। সেখানে চিনির দাম সমন্বয়ের বিষয়টিও তোলা হবে বলে জানান দেশের শীর্ষস্থানীয় চিনি আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির টনপ্রতি দর ৫৪০ ডলারে উঠেছে, যা একসময় ২৮০ ডলার ছিল।

গত দুই দিন রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিকেজি খোলা চিনি ৭৩ টাকা চাচ্ছেন বিক্রেতারা। ছোট বাজার ও পাড়া-মহল্লার যেসব মুদি দোকানে নতুন করে চিনি তোলা হয়েছে, সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬ টাকা দরে। বিক্রেতারা বলছেন, কিছুদিন আগেও চিনির দর কেজিপ্রতি ৬৮ টাকা ছিল।

চলতি বছর চিনির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল গত রমজান মাসকে কেন্দ্র করে। রোজা ও রোজার আগে দুই মাসে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা কেজির চিনি ৭৫ টাকায় উঠেছিল। রোজার পরে দাম কমে কেজিপ্রতি ৬৬ টাকায় নামলেও এখন আবার তা বাড়ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার চিনির দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে আমদানির শুল্ক কমানোর চিন্তা করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এ ক্ষেত্রে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ট্যারিফ কমিশনকে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

সরকারের আয় কত: ২০১৫ সালের আগস্টে চিনি আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য (ট্যারিফ ভ্যালু) টনপ্রতি ৩২০ ডলার নির্ধারণ করে এর ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরে ডিসেম্বরে ট্যারিফ ভ্যালু বাড়িয়ে টনপ্রতি ৩৫০ ডলার করা হয়। এ ছাড়া প্রতি টন চিনিতে আমদানি শুল্ক আছে ২ হাজার টাকা ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আছে ১৫ শতাংশ।

ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনির আমদানি মূল্য টনপ্রতি গড়ে ৪৫০ ডলার ধরে বর্তমান কর কাঠামোতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আসবে ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে সরকার রাজস্ব পাবে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। আর মূসক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নিলে সরকারের রাজস্ব আসবে ২৭৬ কোটি টাকা।

সরকারি চিনির হাল: বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের কাছে এখন ৬০ হাজার টন চিনি মজুত আছে। কেজিপ্রতি ১২ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে পারলে তাদের বাড়তি আয় হবে প্রায় ৭২ কোটি টাকা। আগামী নভেম্বর থেকে নতুন মৌসুমের চিনি আসতে শুরু করবে। সেই চিনিরও বেশি দাম পাবে প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মূল্য বৃদ্ধি করতে পারায় রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের লোকসান অনেক কমবে। পাশাপাশি সরকারও তিন হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব পাবে।

গত বছরের মাঝামাঝিতে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দামে ব্যাপক পতন ঘটে। তখন ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম নেমেছিল ৩৫ টাকায়। এতে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন ব্যাপক লোকসানে পড়ে। তাদের সুরক্ষা দিতেই সরকার চিনি আমদানিতে কর বাড়িয়ে দেয়। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে চিনির ওপর বাড়তি কর আরোপের আগে চিনি শিল্প করপোরেশনের চিনির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩৭ টাকা। এরপর তারা দর বাড়িয়ে প্রথম দফায় কেজিপ্রতি ৪৪ টাকা, দ্বিতীয় দফায় ৪৮ টাকা নির্ধারণ করে। সর্বশেষ ৬০ টাকা করল।