default-image

ভারতের কর্ণাটকে থাকা এক আত্মীয় চুইঝালের চারা চেয়েছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার অশোক বৈরাগীর কাছে। কিন্তু তখনো চুই চারার উৎপাদন শুরু হয়নি। কীভাবে চারা উৎপাদন করা যায়, তা–ও কেউ জানতেন না।

তবে নিজের একটি ফলদ গাছের নার্সারি থাকায় সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ওই আত্মীয়ের জন্য চুইয়ের চারা তৈরির কাজে নেমে পড়েন ৫৮ বছরের অশোক বৈরাগী। তিনি প্রথমে চুইগাছের কয়েকটি ডগা কেটে মাটিতে লাগান। এর মধ্যে বাঁচে মাত্র দুটি। তাতেই তাঁর উৎসাহ বেড়ে যায়। এবারে ছোট পলিথিন প্যাকেটে মাটি দিয়ে চারা তৈরি করেন। তবে চারা বাঁচার হার ছিল তুলনামূলক কম। এভাবে চেষ্টা করতে করতে এক সময় বাণিজ্যিকভাবে চুই চারা উৎপাদনে সাফল্য পান অশোক বৈরাগী। গত বছর তিনি সাত লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন বলে জানান।

অশোক বৈরাগীর চুই চারা উৎপাদনের ওই ঘটনা ২০১২ সালের। এরপর স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায় তাঁর চারা উৎপাদনের পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে খুলনার বিভিন্ন উপজেলায়। অল্প জায়গায় স্বল্প খরচে ও খাটুনিতে ভালো লাভ হওয়ায় বেকার যুবকেরা চুই চারা চাষে আকৃষ্ট হতে থাকেন। চারা বিক্রি করতে ও প্রচার চালাতে নিজস্ব ওয়েবসাইটও খুলেছেন তাঁদের অনেকে। সব মিলিয়ে চারা বিক্রি বেশ ভালো।

বিজ্ঞাপন

এখন কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, চুইঝাল আবার কী? তাঁরা জেনে নিন, এটি একধরনের মসলাজাতীয় লতা গাছ। ঝাঁজালো ও প্রচুর ঔষধি গুণসমৃদ্ধ এই গাছের শিকড়, শাখা–প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। রান্নায় যেকোনো মাছ ও মাংসের স্বাদ বাড়াতে চুইঝালের জুড়ি নেই। একসময় শুধু খুলনায় চুইঝালের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বাইরের জেলার লোকজন খুলনা এসে চুই চারা নিয়ে যান। আবার কেউ অনলাইনে, কেউবা ফোনে অর্ডার দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে নেন।

খুলনার কৃষকদের সফলতা দেখে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ চুই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বর্তমানে চাহিদা এত বাড়ছে যে চারা উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়, খুলনা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে খুলনার পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও রূপসা উপজেলায় চুইঝালের চারা উৎপাদন হয়। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, অন্তত দুই–তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তবেই চুইঝাল উৎপাদনে নামা উচিত। তিন মাসের মধ্যেই চুই চারা বিক্রি শুরু করা যায়। একেকটি চারা তৈরিতে খরচ হয় ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১০ টাকা। আর বিক্রি হয় ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায়। হাজার পঞ্চাশেক টাকা খরচ করলে দেড় লাখ টাকার মতো চারা বিক্রি হতে পারে। জমিতে অন্য ফসলের ‘সাথি ফসল’ হিসেবেও চুইয়ের চাষ করা যায়। এক বিঘা জমিতে লাগানো যায় ৬২০টি চারা। প্রথম বছর একটি চুইগাছ থেকে ৩ কেজির মতো চুইঝাল পাওয়া যায়। তবে দ্বিতীয় বছর ৬ থেকে ৮ কেজি সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি চুইঝাল ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে।

ডুমুরিয়ার ৩১ বছর বয়সী নবদ্বীপ মল্লিক ২০১৬ সালের দিকে ২০০ টাকা পাওয়ার লোভে প্রশিক্ষণ নেন। তবে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি স্কুলের শিক্ষার্থীদের দেওয়ার জন্য ৩ হাজার চারার কাটিং করেন। এর মধ্যে এক হাজার চারা বাঁচে। তা থেকে ৬০০ চারা বিতরণ হয়। বাকি ৪০০ চারা ১২ হাজার টাকায় কিনে নেয় ডুমুরিয়া কৃষি অফিস। ব্যস, নবদ্বীপ মল্লিকের উৎসাহ বেড়ে যায়। চারা উৎপাদন শুরু করেন। তিন মাস পর ওই চারা বিক্রি করে তাঁর ৩৫ হাজার টাকা আয় হয়, যা বেড়ে গত বছর ৩০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। নবদ্বীপ মল্লিক প্রথম আলোকে জানান, চলতি বছরে তিনি ৫০ লাখ টাকার চারা উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছেন।

চুই চারা উৎপাদনই হলো এখন সবচেয়ে লাভজনক পেশা। কারণ, প্রতিটি চারা উৎপাদনে খরচ পড়ে ৩–৫ টাকা। আর তা বিক্রি হয় ৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।
পান্না মণ্ডল, চুইচাষি, বটিয়াঘাটা উপজেলা, খুলনা

বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের পান্না মণ্ডল গত বছর চারা উৎপাদনে নামেন। প্রথম বছরেই ১২ হাজারের মতো চারা বিক্রি হয়। তিনি বলেন, চুই চারা উৎপাদনই হলো এখন সবচেয়ে লাভজনক পেশা। কারণ, প্রতিটি চারা উৎপাদনে খরচ পড়ে ৩–৫ টাকা। আর তা বিক্রি হয় ৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।

ডুমুরিয়ার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, কম খরচে অধিক অর্থকরী ফসল হলো চুই। সে জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন বাণিজ্যিকভাবে চুই চাষ হচ্ছে।

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, স্বাদের পাশাপাশি ঔষধি গুণ থাকায় দিন দিন চুইঝালের কদর বাড়ছে। ছোট জায়গায় চারা উৎপাদন করা যায় বলে এটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেক বেশি। খুলনার কৃষকদের সফলতা দেখে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ চুই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। বর্তমানে চাহিদা এত বাড়ছে যে চারা উৎপাদনে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন