মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে মাত্র পাঁচটি খাত। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপিতে দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৭ শতাংশ অবদান রেখেছে এসব খাত। জিডিপিতে এই খাতগুলো সাড়ে সাত লাখ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন করেছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে প্রমাণিত এই খাতগুলো হচ্ছে—উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণ।

প্রতিবছর দেশের অভ্যন্তরে পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়ে কত টাকার মূল্য সংযোজন হয়, সেটাই জিডিপির হিসাবে ধরা হয়। মোটাদাগে কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাত দিয়ে জিডিপি হিসাব করা হয়। এসব খাতকে গণনা করা হয় সব মিলিয়ে ১৫ খাত দিয়ে। গত অর্থবছরে স্থিরমূল্যে জিডিপির আকার ছিল ১১ লাখ ৫ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়ে অর্থনীতিতে সমপরিমাণ টাকার মূল্য সংযোজন করেছে। গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত সপ্তাহে জিডিপির এই চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনীতি বহুমুখী করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচটি খাতই অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখছে। এর মধ্যে উৎপাদন খাত সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে।

>

মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এখন উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণ-এই পাঁচ খাতের অবদান ৬৭ শতাংশ।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, উৎপাদন খাতের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। আমরা উৎপাদন খাতে পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে পারছি না। অন্যদিকে সেবা খাতে অপেক্ষাকৃত কম মূল্য সংযোজনকারী বেশি সেবা সৃষ্টি করছি। উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী সেবা সৃষ্টি করতে পারছি না।

উৎপাদন খাত

এই খাতে দেশের ছোট-বড় কলকারখানাগুলো অবদান রাখে। কলকারখানা থেকে যত পণ্য উৎপাদন হয়ে মূল্য সংযোজন হয়, তা জিডিপিতে যুক্ত হয়। গত অর্থবছরে উৎপাদন খাতের অবদান ছিল জিডিপির ২৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। অর্থের হিসাবে স্থিরমূল্যে এই খাতে ২ লাখ ৫৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। উৎপাদন খাতই এখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার।

খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা

সারা দেশে বছরজুড়ে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা হয়। গলির মুদিদোকান থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ কিংবা রাজধানীর চক ও মৌলভীবাজারের পাইকারি বিক্রিও জিডিপিতে যুক্ত হয়। গত অর্থবছরে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা পরিমাণে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা। এটি আগেরবারের চেয়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ খাতে আরও কিছু উপখাত আছে, যেমন গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য পণ্য, গাড়ি, মোটরসাইকেল মেরামতও খুচরা এবং পাইকারি খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়।

পরিবহন খাত

আপনি জানেন কি, পরিবহন খাত অর্থনীতিতে অন্যতম বড় মূল্য সংযোজনকারী খাত? দেশজুড়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী বাস-ট্রাক, ট্রেন, জাহাজ-নৌকা চলাচল করে। গতবার এই খাত থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকার মূল্য সংযোজন হয়েছে, যা আগেরবারের চেয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। পরিবহন খাতে যত মূল্য সংযোজন হয়, এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে সড়ক পরিবহন থেকে। এ খাতে গতবার এসেছে সাড়ে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া নৌপরিবহন থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ও আকাশপথের পরিবহন থেকে ১ হাজার কোটি টাকা এসেছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং পরিবহন খাতের আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত। ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাত থেকে গতবার ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্য সংযোজন হয়েছে।

কৃষি ও বনায়ন

কৃষি ও বনায়ন খাত থেকে জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি অর্থ আসে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। শুধু ফসল ফলিয়ে কৃষকেরা জিডিপিতে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অবদান রেখেছেন। হাঁস-মুরগি, গরুসহ গবাদিপশু পালনে আসে সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বনায়ন করে গত অর্থবছরে অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

নির্মাণ খাত

বছরজুড়ে সারা দেশে বিভিন্ন নির্মাণকাজ চলে। শুধু বাড়িঘর নয়; রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো সব নির্মাণযজ্ঞ জিডিপিতে অবদান রাখছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই খাতের অবদান ছিল ৮১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

আরও ১০ খাত

আপনি স্বপ্নের বাড়ি-ফ্ল্যাট নির্মাণ করছেন। এর মাধ্যমে নিজের অজান্তে আপনিও কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। আপনার এই অবদান যোগ হয় আবাসন খাতের নামে। এভাবে আবাসনসহ আরও ১০টি খাত জিডিপিতে ৩৩ শতাংশ অবদান রাখে। আবাসন ছাড়া বাকি খাতগুলো হলো—স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ড; শিক্ষা; সামাজিক ও ব্যক্তিগত সেবা; জনপ্রশাসন; ব্যাংক-বিমা; হোটেল-রেস্তোরাঁ; বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সরবরাহ; তেল-গ্যাস খনন এবং মৎস্য চাষ। গত অর্থবছরে এসব খাত জিডিপিতে ৩ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকার মূল্য সংযোজন করেছে।

অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের অনেকেই অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করা বা এতে বৈচিত্র্য আনার তাগিদ দেন। এ বিষয়ে সরকারের সহায়ক ভূমিকার প্রত্যাশা করেন তাঁরা।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আসবে। বৈচিত্র্য এলে এমনিতেই সব খাতের অবদান বাড়বে। সরকার এখন অবকাঠামো তৈরি করছে, জ্বালানি নিরাপত্তা দিচ্ছে। আশা করি, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সৃজনশীলতা দিয়ে বিনিয়োগ করবেন।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0