>ব্যবসায় জগতের সফল ব্যক্তিত্ব, উদ্যোক্তা বা সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তাঁদের সাফল্যের মন্ত্র, আজকের তরুণদের জন্য তাঁদের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান ‘এমটিবি প্রেজেন্টস টপ টক’। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সহযোগিতায় প্রথম আলোর এই বিশেষ অনুষ্ঠান এমটিবি টপ টকের দ্বিতীয় পর্বে কথা বলেছেন ইকবাল কাদির। তিনি গ্রামীণফোনের প্রতিষ্ঠাতা; সিনিয়র ফেলো, হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল; এবং প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক, লেগাটাম সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, এমআইটি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন মুনির হাসান।

সাফল্য এবং টাকার পেছনে না ছুটে সমাজ ও মানুষের সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে তরুণদের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন ইকবাল কাদির। তিনি বলেছেন, সমস্যার সমাধান বের করতে পারলেই সাফল্য এমনিতেই ধরা দেবে। গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর ভাবনা, বাংলাদেশের তরুণদের জন্য পরামর্শ, অর্থনীতির উন্নয়ন, ব্যবসায় জগৎ ও প্রযুক্তিবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন তিনি।

আলোচনার শুরুতে ইকবাল কাদিরের কাছে জানতে চাওয়া হয় গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠার চিন্তা তাঁর মাথায় কীভাবে এল? ইকবাল কাদির বলেন, তিনি অনেক দিন থেকেই যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে চিন্তা করছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই তিনি তিনটি পর্যবেক্ষণ করেন—প্রথমত, দিন দিন কম্পিউটারের দাম কমে যাচ্ছে, মানে প্রযুক্তি গরিব দেশের দিকে যাচ্ছে। যার রোজগার কম, সে–ও কম্পিউটার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের জন্য যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যোগাযোগ করতে পারলেই মানুষ লেনদেন করতে পারে, একটা বাজার সৃষ্টি করা যায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। তৃতীয়ত, যোগাযোগ যেহেতু উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, তাই শুরুতে ক্রয়ক্ষমতা না থাকলেও উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়ে, পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং পণ্য আবার সেই ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই চলে আসে।

কথা প্রসঙ্গে ইকবাল কাদির ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘গ্রামীণফোন তৈরির সময় অনেকেই বলেছিল বাংলাদেশের মানুষের তো মোবাইল কেনার ক্ষমতাই নেই, তাহলে এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে সফল হবে? কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ থেকে আমি চিন্তা করতে পেরেছিলাম, যে মানুষের যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা পাওয়ার চাহিদা আছে, তাই উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং বিশ বছর পরে ১০০০ টাকার মোবাইল ১ টাকায় অর্থাৎ বেশির ভাগ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে। মূলকথা, সময়ের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং পণ্যের দাম কমবে।’

default-image

উদ্যোক্তাদের কথা মাথায় রেখে ইকবাল কাদিরকে প্রশ্ন করা হয়, ঝুঁকি কমানোর জন্য এবং কোনো প্রকল্প সফল হবে কি না, সেটা বোঝার জন্য উদ্যোক্তাদের প্রথমে ছোট পরিসরে পাইলট প্রকল্প বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প করতে বলা হয়। কিন্তু ইকবাল কাদির শুরুতেই ৫০ হাজার গ্রাম নিয়ে তাঁর গ্রামীণফোনের কাজ শুরু করেছিলেন। একবারে এমন বড় প্রকল্প শুরু করার ব্যাপারে তাঁর চিন্তা কেমন ছিল? ইকবাল কাদির বলেন, ‘আসলে এই প্রকল্প শুরুর সময় আমি অনেকগুলো ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করেছিলাম। যেমন শুধু আমার একার যদি মোবাইল থাকে কিন্তু আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজনদের যদি মোবাইল না থাকে, তাহলে আমার মোবাইল দিয়ে আমি খুব বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব না। তাই বেশির ভাগ মানুষের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। এরপর আর একটি ব্যাপার, যেমন বাংলাদেশের মানুষের মোবাইল কেনার ক্ষমতা আছে কি না। তখন আমি এক পর্যবেক্ষণ থেকে বুঝেছিলাম, গরিব মানুষ আসলে তাঁর প্রয়োজন থাকলে টাকা খরচ করতে চিন্তা করে না, তারা যথার্থ সেবাটা পেতে চায়, কারণ সেবাটা না পেলে হয়তো অসুবিধায় পড়ে তাদের আরও বেশি অর্থ খরচ হয়ে যায়। এ রকম বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ আমি চিন্তা করেছিলাম। মানুষের সেরা বৈশিষ্ট্য হলো তারা মাথার মধ্যেই চিন্তা করে ভবিষ্যৎ ফলাফল নিয়ে ভাবতে পারে, তাই পাইলট আমি করছিলাম মাথার মধ্যেই গ্রামীণফোন শুরুর চার বছর আগে থেকেই।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই সহজে ভাবতে পারে না। বর্তমানে বসে ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার মতো দূরদৃষ্টি থাকা বা এ রকম চিন্তাভাবনা একজন মানুষের মধ্যে কীভাবে গড়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে ইকবাল কাদির বলেন, ‘আসলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করার প্রথম ধাপ হলো বর্তমানের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করা এবং সমস্যার সমাধান নিয়ে চিন্তা করা। আমি বর্তমানে কোথায় আছি এবং এখান থেকে ভবিষ্যতে আমি কোথায় যেতে চাই—এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য হলো সমস্যা। এবার সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করব—এভাবেই চিন্তা করতে করতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা যায় বলে আমার মনে হয়।’

এভাবেই জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলে। কথা প্রসঙ্গেই ইকবাল কাদির আলোকপাত করেন সামনের দিনগুলোয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন হয়ে যাবে অনেকটা বিদ্যুতের মতো। আপনি যে কাজই করুন না কেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ইন্টারনেট আপনার লাগবেই। তাই এখন থেকেই ব্যবসায়, শিক্ষা, চিকিৎসা বা যেকোনো কাজেই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে হবে।’

এ আলোচনা অনুষ্ঠানের শেষের দিকে ঝটপট প্রশ্নোত্তরের ‘র‍্যাপিড ফায়ার’ পর্বে ইকবাল কাদির জানান, কাউকে বই উপহার দিলে তিনি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি দেন। আর তাঁর প্রিয় বইয়ের মধ্যে আছে রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’, কার্ল পপারের ‘ওপেন সোসাইটি’। আর একটি দারুণ প্রশ্নোত্তর যেমন অনেক বড় বোর্ডে সবার জন্য কোনো লেখা লিখতে বললে তিনি লিখবেন, ‘একজন মানুষ যেন আগামী পাঁচ বছরে আরও ১০ জন মানুষের উপার্জন দ্বিগুণ করানোর দায়িত্ব নেয়।’ এভাবে সবাই যদি অন্যের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে দেখা যাবে এক লাখ মানুষ আরও ১০ লাখ মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারবে। আর তরুণদের জন্য তাঁর পরামর্শ, ‘সাফল্য ও টাকার পেছনে না ছুটে বরং সমাজ ও মানুষের সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা উচিত। সমস্যার সমাধান বের করতে পারলেই সাফল্য এমনিতেই ধরা দেবে।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন