বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
ইপিজেড মানেই এখন শুধু তৈরি পোশাক কারখানা নয়। পুতুল, ক্যামেরার বেল্ট, চিরুনি, চুলের ক্লিপসহ বাহারি সব পণ্য উৎপাদনের কারখানাও থাকে সেখানে

অলিম্পিকের উপহার

কুমিল্লা ইপিজেডে জাপনি কোম্পানি হাসি টাইগার লিমিটেড বাচ্চাদের খেলনা বানায়। ২০২০ সালে জাপানের টোকিও অলিম্পিকের অতিথিদের উপহার দেওয়ার জন্য দুই লাখ ডলারের পুতুল তৈরির কার্যাদেশ পেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু গত বছরের এপ্রিল মাসে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সবকিছু বন্ধ করে দেয় সরকার। আবার অলিম্পিক গেমসও এক বছর পিছিয়ে যায়। তখন জাপানি ক্রেতা ক্রয়াদেশটি স্থগিত করে দেয়। ক্রেতা আর যোগাযোগ না করায় শেষ পর্যন্ত রপ্তানি আদেশটি বাতিল করতে হয়। করোনার কারণে হাসি টাইগারের একাধিক ক্রয়াদেশ বাতিল হয় বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, চাহিদা কম থাকায় হাসি টাইগারের কারখানায় গত বছর এপ্রিল থেকে দুই থেকে তিন মাস কোনো কাজই হয়নি। এরপর এক বছর ধরে আগের উৎপাদনে যেতে লড়াই করছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসি টাইগার মূলত বাচ্চাদের খাবার প্লেট, মগ, পানির বোতল, শোপিস ও নানা ধরনের পুতুল বানায়। কোম্পানিটি সাধারণত প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ ডলারের পুতুল রপ্তানি করে থাকে। তবে করোনার কারণে গত এক বছরে রপ্তানি কমে ১০ লাখ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তবে সুখবর হলো, দুই-তিন মাস ধরে আবার ক্রয়াদেশ বাড়ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, চারতলা ভবনের প্রতিটি তলায় নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা পূর্ণোদ্যমে কাজ করছেন। কাজের পরিবেশও বেশ ছিমছাম। মেশিনেও খুব বেশি শব্দ হয় না। এক তলায় ডাইস থেকে প্লাস্টিকের পুতুলের অবয়ব বানানো হয়। অন্য ইউনিট জোড়া লাগায়। আরেক তলায় চলে রঙের কাজ। প্যাকেজিং করা হয় আরেক জায়গায়। এই কারখানায় সব মিলিয়ে দেড় শর মতো শ্রমিক কাজ করেন।

হাসি টাইগারের ব্যবস্থাপক নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বছরের দ্বিতীয়ার্ধে জাপানে পুতুলের চাহিদা কম থাকে। কিন্তু এবারে অবশ্য চাহিদা বেশ। আশা করি, আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসের মধ্যে প্রতি মাসে আগের মতো দুই লাখ ডলারের পুতুল রপ্তানি করতে পারব।’ তিনি জানান, হাসি টাইগারের তৈরি খেলনার ৮০ শতাংশই জাপানে রপ্তানি হয়। বাকি ২০ শতাংশ কোরিয়া ও তাইওয়ানে যায়।

নাইকন-প্যানাসনিকে বাংলাদেশি বেল্ট

কুমিল্লা ইপিজেডে জেবি নেটওয়ার্কস নামে একটি কারখানায় বিশ্বখ্যাত নাইকন ও প্যানাসনিক ক্যামেরার বেল্ট তৈরি হয়। মোটাদাগে বলা চলে, ফটোগ্রাফার তথা চিত্রগ্রাহকের গলায় যে বেল্টের সাহায্যে ক্যামেরা ঝুলে থাকে, সেটি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। এই কারখানায় সুতা থেকে বুননসহ ক্যামেরার বেল্ট তৈরির সব কাজই হয় যন্ত্রের সাহায্যে। একই সঙ্গে কারখানাটিতে ক্যামেরার ব্যাগ আর লেন্স রাখার ব্যাগও বানায় জাপানের এই কোম্পানি।

সরেজমিন দেখা গেছে, কোম্পানিটির তিনতলা কারখানা বেশ পরিপাটি। প্রতিটি তলায় একেকটি পণ্যের ইউনিট। এই কারখানায় প্রায় ৬০০ কর্মী কাজ করেন। জানা গেছে, কারখানাটিতে প্রতিদিন গড়ে ক্যামেরার তিন হাজার বেল্ট বানানোর সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১৪-১৫ লাখ ডলারের বেল্ট রপ্তানি করে।

২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জেবি নেটওয়ার্কস করোনার সময়ে বিপাকে পড়েছিল। গত বছরের এপ্রিল থেকে তিন মাস কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। কয়েক মাস হলো ক্রয়াদেশ থাকায় পূর্ণোদ্যমে উৎপাদন চলছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, করোনার ধাক্কা সামাল দেওয়া গেছে। এখন আবার আগের মতো ক্রয়াদেশ আসছে। সব মেশিন পুরোদমে চলছে। তাঁর মতে, করোনার দুঃসময়ে বিদেশিদেরও আয় কমেছে। তখন ক্যামেরার মতো শৌখিন পণ্য কেনার মানসিকতাও ছিল না তাদের। এখন সব দেশেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হচ্ছে, আয় বাড়ছে। ফলে তাদের তৈরি ক্যামেরার বেল্ট-ব্যাগও রপ্তানি হচ্ছে।

চীনা নারীদের চিরুনি, চুলের ক্লিপ

চীনা বিনিয়োগে এক দশক গে কুমিল্লা ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত হয় তুং হিং (বাংলাদেশ) ম্যানুফ্যাক্টরি লিমিটেড। সাততলাবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই বিশাল কারখানায় বানানো হয় নারীদের চুলের যত্ন নেওয়ার জন্য অতিপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। এই তালিকায় আছে চিরুনি, চুলের ব্যান্ড-রিবন-ক্লিপ, শাওয়ার ক্যাপ, চুল শুকানোর তাওয়েল ইত্যাদি। এসব সামগ্রীর সবই চীনে রপ্তানি হয়। কারখানাটিতে এক হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন।

চীনের আরেক কোম্পানি সুন হো বানায় প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের চামচ, গ্লাস, থালা-বাটিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রোকারিজ সামগ্রী। কুমিল্লা ইপিজেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এই দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানও করোনার সময়ে বেশ ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু তা কাটিয়ে উঠেছে। কারণ, বন্ডেড প্রতিষ্ঠান হওয়ায় শুল্ক-করমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আনার সুযোগ আছে তাদের। কিছুদিন ধরে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি কয়েক গুণ বেড়েছে। উৎপাদনও চলে কয়েক শিফটে, মানে পালায়।

সার্বিক রপ্তানি বেড়েছে ৩৩%

কুমিল্লা ইপিজেডের কারখানাগুলো থেকে যত পণ্য রপ্তানি হয়, তার ৯৫ শতাংশ তৈরি পোশাক। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে সব মিলিয়ে এখান থেকে ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ৮৮ টাকা ধরে)। এর আগের বছর রপ্তানি হয়েছিল ৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি ১৯ কোটি ডলার বা ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে বেশি পোশাক রপ্তানি হয়।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন