এত পরামর্শকের কোনো কারণ আমরা দেখছি না। এত অস্বাভাবিক খরচের কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
মামুন আল রশীদ, সদস্য, পরিকল্পনা কমিশন

‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ শিরোনামের প্রকল্পটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর সময়ে বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্পটি নিয়ে মার্চের মাঝামাঝিতে পরিকল্পনা কমিশনে একটি বৈঠক হয়। সেখানে পর্যালোচনা করে সেটি ফেরত পাঠানো হয়। প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া করতে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য মামুন আল রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা। এ জন্য এত পরামর্শকের কোনো কারণ আমরা দেখছি না। এত অস্বাভাবিক খরচের কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।’

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), হাইওয়ে পুলিশ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। বাকি ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা দেবে সরকার।

দেশে দুর্ঘটনায় প্রতিবছর পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এতে নিহত হয়েছে ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছে ৭ হাজার ৪৬৮ জন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

কী কী কাজ হবে

সড়ক নিরাপত্তার প্রকল্পে বিভিন্ন সংস্থার অধীনে নানা কাজে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচিত দুটি জাতীয় মহাসড়ক জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা এবং নাটোর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত যানবাহন চলাচল নিরাপদ করতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে পরামর্শক ব্যয় ৪৪০ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো তাদের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ৭৬ কোটি টাকা খরচ করবে।

প্রকল্পটির আওতায় স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি, যা জিপ নামে পরিচিত) কেনা হবে ১২টি। ব্যয় হবে ১২ কোটি টাকা। ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হবে ২৯টি পিকআপ। অ্যাম্বুলেন্স কেনা হবে ৬০টি, খরচ হবে ৩৩ কোটি টাকা। বিদেশ সফরের জন্য রাখা আছে ৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি মাদারীপুরের শিবচরে হাইওয়ে পুলিশের জন্য একটি বহুতল ভবন নির্মাণে খরচ হবে ৪৪ কোটি টাকা।

১৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে যে সফটওয়্যার (ক্রাশ ডেটা সিস্টেম সফটওয়্যার, ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেইস সফটওয়্যার) কেনার কথা বলা হয়েছে, তা দিয়ে দুর্ঘটনার সংখ্যা, নিহত ও আহতের হিসাব রাখা হবে।

নথিপত্র অনুযায়ী, এ প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ট্রমা সেন্টার চালু হবে। সে জন্য জরুরি চিকিৎসা কক্ষ সংস্কারের জন্য ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রকল্পটির আওতায় জেলা পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা কমিটি করা হবে। ঢাকায় বনানী ও মোহাম্মদপুর এলাকায় মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ বিভিন্ন সড়কে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। জনসচেতনতা বাড়ানো হবে।

পরামর্শ নিতে বিপুল ব্যয়

‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা’ প্রকল্পের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো আলাদাভাবে পরামর্শক নিয়োগের কথা বলছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর তাদের কাজের অংশের জন্য পরামর্শকের পেছনে ২২৩ কোটি টাকা খরচ করতে চায়। বিআরটিএ ব্যয় করতে চায় ৫২ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করবে ২৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পুলিশের কাজের অংশে পরামর্শকের জন্য ৪৮ কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে পুরো প্রকল্প ব্যবস্থাপনার পেছনে পরামর্শকের জন্য ৮৭ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে।

পরামর্শকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখনো সে ধরনের দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠেনি। সে জন্য পরামর্শক নেওয়া হচ্ছে।’ বিদেশি সংস্থা থেকে ঋণ নিলে তাদের শর্ত মেনে পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে এমনটা ছিল। তবে এখন আর শর্ত মেনে পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয় না।

আবদুল্লাহ আল মামুন আরও জানান, সফটওয়্যার ব্যয় কমানো হবে।

সওজ বলছে, পরামর্শকেরা কোন রাস্তায় কী সমস্যা তা দেখবে, কোথায় কোথায় রাস্তা আঁকাবাঁকা তা বিশ্লেষণ করবে, কোন কোন সড়ক সোজা করা দরকার, তা বলবে ইত্যাদি। এ ছাড়া পরামর্শকেরা সওজের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ঢালাওভাবে পরামর্শক নিয়োগ না দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। গত বছরের ১৮ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, চোখ বন্ধ করে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

‘কিছু মানুষের পকেট ভরবে’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে ৬২ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি। চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশেরই কারণ হলো চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতি। কিন্তু সড়ক নিরাপদ করার প্রকল্পে চালকদের ক্ষেত্রেই তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৩ কোটি টাকার কিছু বেশি।

বুয়েটের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সড়কের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক না করে চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কখনো দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। আসল জায়গায় হাত না দিয়ে এ ধরনের প্রকল্প নিলে কিছু মানুষের পকেট ভরবে। কিন্তু দেশের উপকার হবে না।

অধ্যাপক সামছুল হক আরও বলেন, সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে জন্য পরামর্শকের প্রয়োজন হয় না। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এর আগেও অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার ধারাবাহিকতা থাকেনি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। দুর্ঘটনা কমেনি।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন