বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

একনজরে

ওয়ালটন

প্রতিষ্ঠাতা

এস এম নজরুল ইসলাম

প্রতিষ্ঠাকাল

১৯৭৭ সালে ছিল রেজভি অ্যান্ড ব্রাদার্স

২০০৮ সালে ওয়ালটনের ফ্রিজ উৎপাদন শুরু

বাজার মূলধন

৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার

বার্ষিক আয়

প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা

রপ্তানি আয়

৪ কোটি ডলার

শওকত হোসেন: ওয়ালটনের উত্থানের এক যুগের গল্পটা কেমন?

গোলাম মুর্শেদ: ওয়ালটনের গল্পটাই হচ্ছে মূলত পাঁচ ভাইয়ের স্বপ্নপূরণের গল্প। পাঁচ ভাইয়ের স্বপ্নই ওয়ালটনকে ইলেকট্রনিকস পণ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। ইলেকট্রনিকস পণ্যে বাংলাদেশ ছিল আমদানিনির্ভর। নামীদামি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে বাজার ছিল ভরা। ১২ বছরেই ওয়ালটন যে কেবল অভ্যন্তরীণ বাজার দখল করেছে তা-ই নয়, বরং রপ্তানিও শুরু করেছে।

প্রথম দিককার একটা গল্প বলি। কারিগরি ত্রুটির কারণে একদম শুরুতেই বিক্রি হওয়া প্রায় দুই শ ফ্রিজ ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল। আমাদের প্রকৌশলীরা তখন নতুন। তাঁরা গবেষণা করেছেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন দেশের ফ্রিজ তৈরির কারখানা ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। তারপরও শুরুর দুই শ ফ্রিজে সমস্যা দেখা দেয়। তবে পাঁচ ভাইয়ের সাহস ছিল। তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, কোনো খারাপ পণ্য বাজারে ছাড়া হবে না। ফলে প্রতিটি ফ্রিজ বলতে গেলে কোলে করেই ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

আসলে শুরু থেকেই উদ্যোক্তা পাঁচ ভাই ধৈর্য ধরে লেগে ছিলেন বলেই ওয়ালটন ফ্রিজের বাজারে সফলভাবে ঢুকতে পেরেছে। এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন, শীতাতপযন্ত্র বা এয়ারকন্ডিশন, ওভেন, রাইসকুকারের মতো ব্যবহার্য অন্যান্য সামগ্রী (হোম অ্যাপ্লায়েন্স) উৎপাদনে যায় ওয়ালটন। আর এখন ওয়ালটনের বড় পণ্য হচ্ছে ওয়াশিং মেশিন ও লিফট। আমরা কিন্তু শুরুর দিকে এই দুই পণ্য নিয়ে কাজ করিনি। কারণ, আস্তে আস্তে আমরা শিল্পটাকে তৈরি করছিলাম। ফলে লিফটের মতো পণ্যও আমরা এখন বাংলাদেশে তৈরি করছি, যা ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

শওকত হোসেন: বাজারে আপনাদের অবস্থান কী এখন?

গোলাম মুর্শেদ: একটা সময় ইলেকট্রনিকসে চীনা পণ্যে ভরপুর ছিল বাংলাদেশের বাজার। আর এখন ফ্রিজের বাজারের ৭০ শতাংশই ওয়ালটনের দখলে। এ ছাড়া টেলিভিশনের বাজারের ৩৫ শতাংশ, এয়ারকন্ডিশনের প্রায় ৪০ শতাংশ বাজার ওয়ালটনের। এটা ঠিক টেলিভিশনের বাজার আমরা পুরোপুরি দখল করতে পারছি না। টেলিভিশনের বাজার এতটাই অনানুষ্ঠানিক বা গ্রে মার্কেটের দখলে যে এখান থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। টেলিভিশনে স্টিকার বা লোগো লাগানো খুব সহজ। কোনো এক জায়গা থেকে যেকোনো মানের একটা টেলিভিশন এনে একটি লোগো লাগিয়ে দিলেই হয়। সুতরাং টেলিভিশনের বাজারটা এখনো চ্যালেঞ্জিং আমাদের জন্য।

এয়ার কন্ডিশনের (এসি) বাজারে আমাদের অবস্থান ভালো। মাত্র তিন বছরেই আমরা বাজারের শীর্ষে চলে এসেছি। শব্দে নিয়ন্ত্রণ করা যায় (ভয়েস কনট্রোলড) এমন এসি আমরা বাজারে নিয়ে এসেছি। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা বাংলায় কথা বলাব। অর্থাৎ বাংলায় ভয়েস কনট্রোলড এসি বাজারে আনব।

এই হচ্ছে মূলত ওয়ালটনের ইতিহাস। ওয়ালটনের বাজার মূলধন এখন ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আর এখন ওয়ালটন হাইটেকের বার্ষিক আয় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা) কাছাকাছি। আর লক্ষ্য হচ্ছে আমরা এই আয় ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০০ কোটি ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া। আর আমরা যদি তা করতে পারি তাহলে ওয়ালটন হবে আয়ের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষ ৫টি ব্র্যান্ডের একটি।

শওকত হোসেন: ইলেকট্রনিকস পণ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর মান। এই মান নিয়ন্ত্রণ আপনারা কীভাবে করলেন?

গোলাম মুর্শেদ: যেসব ব্র্যান্ড সারা পৃথিবীতে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তাদের সঙ্গে শুরু থেকেই আমাদের যোগাযোগ ছিল। তাদের কুলিং প্রকৌশলী, ডিজাইন প্রকৌশলী, স্ট্রাকচারাল প্রকৌশলীদের সঙ্গে আমাদের একটা সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল। আমরা কখনোই চাইনি যে কেউ বলুক বাংলাদেশের পণ্যের মান ভালো না। আমরা সব সময়েই আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে চেয়েছি। তাই শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সহায়তা নিয়েছি। ‘কোয়ালিটি ফার্স্ট’ এটি আমরা প্রথম থেকেই নিশ্চিত করতে চেয়েছি। এ কারণেই চার বছর আগে একটি বড় ব্র্যান্ডের কুলিং বিভাগের প্রধানকে আমরা নিয়োগ দিয়েছি। আরেকটি বড় ব্র্যান্ডের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) বিভাগের প্রধানকে নিয়ে এসেছি। মান ঠিক রাখার জন্য ‘কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স’ নামে আমাদের একটি বিভাগ আছে, তাদের বাইরে নিয়ে গিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টেলিজেন্স’ নামেও আমাদের একটি টিম আছে। পাঁচ বছর পরে, ১০ বছর পরে বিভিন্ন পণ্যে নতুন নতুন কী যুক্ত হবে, এটা নিয়েই তারা কাজ করে। একটা সময় ছিল ইউরোপ-আমেরিকায় যা হয়, এই উপমহাদেশে আমরা তা পাঁচ বছর পরে পেতাম। এটা যাতে আর না হয়, সেটা ঠিক করাই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টেলিজেন্স’ বিভাগের কাজ।

শওকত হোসেন: দেশীয় প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাটা কেমন?

গোলাম মুর্শেদ: আমাদের প্রকৌশলীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে তারা নিজের হাতে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এত এত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ভেতরে আছে, যা এই উপমহাদেশে কমই আছে। ছোট-বড় ১০ হাজার যন্ত্রপাতি আছে আমাদের কারখানায়। সুতরাং কাজ শেখার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর পাবেন না তাঁরা। আমি নিজেই একজন প্রকৌশলী। এসি প্ল্যান্ট আমার নিজের হাতে করা। প্রতিটি যন্ত্রপাতিই আমাদের প্রকৌশলীরাই বসিয়েছেন। এমনকি আমরা যে কম্প্রেসর প্ল্যান্টটা ২০১৭ সালে কিনে এনেছি, বিযুক্ত যন্ত্রপাতি এনে দেশে তা স্থাপন করেছেন দেশীয় প্রকৌশলীরাই। দুই শ প্রকৌশলী টানা তিন মাস কাজ করেছেন বিদেশে, তারপর দেশে আরও টানা তিন মাস কাজ করে এই প্ল্যান্ট বসিয়েছে। বিশ্বের মাত্র ১৫টি দেশ কম্প্রেসর বানায়, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। আর দক্ষিণ এশিয়ার অষ্টম দেশ হিসেবে কম্প্রেসর বানাচ্ছে বাংলাদেশ। সুতরাং এ ধরনের শিল্প যদি দেশেই থাকে, তাহলে দেশ থেকে মেধা পাচারও হবে না। আমরা জোর গলায় বলি, বাংলাদেশের যদি উন্নয়ন দেখতে চাও, তাহলে ওয়ালটনে চলে যাও। এখন ৭০০ একরেরও বেশি জায়গাজুড়ে ওয়ালটনের কারখানা। বিশাল জায়গায় ৩০টি কারখানায় ৫৪ ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়। আর মডেল আছে এক হাজারেরও বেশি।

শওকত হোসেন: কর্মসংস্থানে আপনাদের কী ভূমিকা?

গোলাম মুর্শেদ: আমরা কর্মকর্তা বা কর্মচারী বলি না, বলি ওয়ালটন পরিবার। এই পরিবারের সদস্য এখন ৩০ হাজার। এই ৩০ হাজার পরিবারের তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা আছে কারখানার মধ্যেই, আর দুবেলা নাশতা। সুতরাং বাজার করা বা রান্নার কোনো চিন্তা করতে হয় না। আমাদের চাওয়া হচ্ছে খাবারের কোনো চিন্তা নেই, সুতরাং কাজটা সবাই মনোযোগ দিয়ে করুক।

শওকত হোসেন : নতুন কী করছেন?

গোলাম মুর্শেদ: আমরা অটোমোবাইল বা গাড়ি উৎপাদনে যেতে চাচ্ছি। আসলে আমরা চাচ্ছি আমরাই প্রথম বাংলাদেশের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রনিক ভেহিকেল তৈরি করব। এটা এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে আছে। পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন দিয়েছে। আমরা গবেষণা করছি, সহযোগিতাও খুঁজছি। সময় লাগবে। হুটহাট করে নেমে ব্র্যান্ডের বা দেশের ক্ষতি করতে চাই না।

শওকত হোসেন : রপ্তানির সম্ভাবনাটা কেমন দেখেন?

গোলাম মুর্শেদ: আমরা রপ্তানির প্রতি নজর দিয়েছি। গত আর্থিক বছরে আমাদের রপ্তানি ছিল ১৪ লাখ ডলার। আর এই অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৪ কোটি ডলারের। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে হবে ৫ কোটি ডলার। আর আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ২০২৩ সালে রপ্তানি ১০ কোটি ডলারে, আর ২০৩০ সালে ১০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া। বর্তমানে আমরা সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করছি টেলিভিশন। ওয়াশিং মেশিনও রপ্তানি হচ্ছে। পাশের দেশ ভারতের বাজারে এসি ও ওয়াশিং মেশিন যাচ্ছে নিয়মিতভাবেই। আমাদের পণ্যের চাহিদা এখন প্রচুর। অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। আমরা তুরস্কে একটি মেলায় অংশ নিয়েছিলাম। সেই মেলার পরে যে পরিমাণ আদেশ পাচ্ছি, তাতে আরেকটি কম্প্রেসর প্ল্যান্ট বসানোর কথাও ভাবছি।

শওকত হোসেন : এবার আপনার নিজের গল্পটা জানতে চাই।

গোলাম মুর্শেদ: বিশেষ কিছু না। আমি ওয়ালটনে যোগ দিয়েছিলাম ২০১০ সালে। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে যান্ত্রিক প্রকৌশল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রি নিই। আমাদের কনভোকেশন হয় ৩ ডিসেম্বর, আর ওয়ালটনে যোগ দিই ২০ ডিসেম্বর। এই ১৭ দিনই কেবল বেকার ছিলাম। আমি কাজ শুরু করেছিলাম এসি বিভাগের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) বিভাগে। এক জায়গায় বসে নির্দিষ্ট একটি কাজ করতে চাইতাম না। বিভিন্ন জায়গায় যাব, সবার সঙ্গে কথা বলব, নানা ধরনের কাজ করব—এটাই ছিল আমার চাওয়া। তখন আমার অনুরোধে উৎপাদন অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টে আমাকে পাঠানো হলো। সেখানে নানা ধরনের কাজ হয়। সারাক্ষণই কাজ চলে, নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, সমাধান করতে হয়, মেশিনে সমস্যা হলে তা ঠিক করতে হয়। আসলে সবকিছুর কেন্দ্রেই হচ্ছে এই উৎপাদন প্ল্যান্ট। তিন বছর পরে আমি ফ্রিজ বিভাগে চলে আসি। এরপর তৎকালীন এমডি আমাকে ব্যবসা কৌশল বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়ে এলেন। এটা ছিল আমার জন্য টার্নিং পয়েন্ট। অর্থাৎ আমাকে উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনা—দুই দিকটিই দেখতে হবে। কারখানা ও করপোরেটের মধ্যে একটা সংযোগের কাজ আমাকে দেওয়া হলো। এখানে আসার পরে বিক্রি, বিপণন, অর্থায়ন, হিসাব, কৌশল—সবকিছু নিয়েই আমার ধারণা তৈরি হলো। এরপর ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ওয়ালটন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন অনুযায়ী মালিক ও পরিচালনা আলাদা করতে হয়। ফলে মূল উদ্যোক্তা পাঁচ ভাই এবং পরের প্রজন্মের তিনজন পরিচালনা পর্ষদে চলে গেলেন। ২০১৯ সালে আমি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পাই। আর ২০২০ সালের অক্টোবরে এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আমি কাজটি উপভোগ করছি। পরিচালনা পর্ষদ আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছে। আর আমি স্বাধীনতা দিয়েছি সবাইকে। আমার কাজ ভালো-মন্দ দেখা, পরিকল্পনা করা। এখানে আসলে সবাই সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাজ করে। আমিও এভাবে কাজে বিশ্বাসী।

শেষ কথা

‘উইন্ড অব অলটারেশন’ থেকে এসেছে ওয়ালটন নামটি। বাংলায় বলা যায় পরিবর্তনের হাওয়া। পিতা ও তাঁর পাঁচ সন্তানের স্বপ্ন ছিল দেশের শিল্পে পরিবর্তন আনতে হবে, হাওয়া বদল করতে হবে। গোলাম মোর্শেদ বললেন, এই হাওয়া বদলের কাজটিই তাঁরা করে চলেছেন।


শওকত হোসেন : প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন