বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মতিউর রহমান: সিদ্ধান্ত পাল্টে কী করলেন তখন?

কাজী জাহেদুল: আমাদের কলেজের সব ছাত্রই খুব মেধাবী ছিল। আমি যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম এবং ডাক্তারি করার আশাও বাদ দিলাম, ফলে ভর্তি হলাম আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট)। ১৯৫৮ সাল। পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগ থেকে পাস করে বের হলাম ১৯৬২ সালে। ওই বছরই কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় হয় এবং আমরাই প্রথম ব্যাচ।

মতিউর রহমান: ১৯৫৮ সালে ঢুকলেন, ১৯৬২ সালে বের হলেন। আপনার রেজাল্ট কী ছিল? প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, দ্বিতীয়, না তৃতীয়?

কাজী জাহেদুল: না। প্রথম, দ্বিতীয় ছিলাম না। ভুলে গেছি আসলে। যত দূর মনে পড়ে সপ্তম বা অষ্টম অবস্থান ছিল। কলেজ থেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয় হলো, তখন এখানে স্থাপত্য বিভাগ খোলার বিষয়ে খুব আলোচনা হয়। বিভাগটি খোলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) তখন ভালো উদ্যোগ ছিল। তাঁরা চারজন মার্কিন স্থপতি-শিক্ষক পাঠান। তাঁদের চিন্তা ছিল এখানকার কয়েকজনকে স্থাপত্যবিদ্যায় বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসতে হবে, যাঁরা পরে এসে যোগ দেবেন এখানে। আমার আঁকাআঁকির অভ্যাস ছিল, কিন্তু বাস্তবে স্থাপত্য সম্বন্ধে কিছু জানতাম না। জানার বেশি সুযোগও ছিল না। তোপখানা রোডে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যসেবা কেন্দ্র (ইউসিস) ও পুরানা পল্টন মোড়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে পড়াশোনা করা যেত। সেখানে গিয়ে নতুন বই দেখতাম। আমরা ছয়জন পুরকৌশলী যুক্তরাষ্ট্রে গেলাম পড়তে। আমি সুযোগ পেলাম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের কোর্সে।

মতিউর রহমান: শেষ করে দেশে ফিরে এলেন?

কাজী জাহেদুল: হ্যাঁ। ফিরে এলাম ১৯৬৭ সালে। বুয়েটে যোগ দিলাম শিক্ষকতায়। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম তত দিনে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে বিকাল সন্ধ্যায় কাজ শুরু করে দিলাম। কিন্তু তখন তো একটা অন্য রকম সময়। ছয় দফার পথ বেয়ে উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হলো। ১৯৭২ থেকেই একটা গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। কোথায়, কী করা যায়—ভাবতে ভাবতে ১৯৭৩ সালে আবার গেলাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে। আমার স্ত্রী হার্ভার্ডে পিএইচডি করবেন।

হার্ভার্ডের শিক্ষক বিখ্যাত স্থপতি বেন টমসনের ডিজাইন অফিসে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল । ওখানে থাকার সময় একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম হাভার্ডের আমাদের স্থাপত্য বিভাগের সামনে দিয়ে । অধ্যাপক সোলতান নামের এক শিক্ষক, হাঙ্গেরির লোক তিনি, আমাকে কাজী বলে ডাকতেন। হঠাৎ বললেন, ‘কাজী, ওপরে এসো। জরুরি কথা আছে।’ গেলাম। তিনি বললেন সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ শুরু হবে। যোগ দেব কি না। আমি যোগ দিলাম। বাচ্চারা তখন ছোট। তারা তখন যুক্তরাষ্ট্রে। তিন বছর ছিলাম সেখানে। পরে এক স্থাপত্য কোম্পানিতে যোগ দিই তিন বছরের জন্য। ওখানে ছিলাম ’৭৮ থেকে ’৮৪ সাল পর্যন্ত।

মতিউর রহমান: এরপর কি দেশে ফিরে এলেন?

কাজী জাহেদুল: বলতে গেলে তা-ই। ফিরে এসে একটা স্থাপত্য ডিজাইন ফার্ম দিলাম। সোনারগাঁও হোটেলের কাছে একটি হোটেলের ডিজাইনের কাজ পেলাম, সেটার নকশা শেষ করতে পারিনি। পরে অন্যরা করেছে। এই সময়ে আরেকটা ঘটনা ঘটে গেল। আমার ছোট ভাইয়ের এক বন্ধু বললেন, বিদেশ থেকে যেহেতু কিছু টাকাপয়সা নিয়ে এসেছেন, পোশাক খাতের ব্যবসায়ে নামতে পারেন। এতে বাড়তি আয় হবে। প্রস্তাবটা মনে ধরল। ভাবলাম এটা করা যায়, সাধ্যের মধ্যে আছে। কারখানা করতে আমার শ্বশুরের টিকাটুলীর পুরোনো একটি বাড়ি নতুন করে সাজালাম। ভালোই চলছিল। দেশে এই সময় মাত্র গোটা ৫০ পোশাক কারখানা ছিলো।

মতিউর রহমান: পোশাক কারখানা চলছিল ভালো?

কাজী জাহেদুল: হ্যাঁ। হঠাৎ একদিন পোশাক কারখানার কিছু পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পুড়ে যায়। আমার ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক। ব্যবসায়ী হিসেবে তখন আমিও নতুন, ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকও নতুন। ইসলামী ব্যাংকের একজন বললেন, ‘মাল পুড়ে গেলেও আপনি বিমার টাকা পাবেন না।’ আমি তো হতাশ হয়ে গেলাম। বড় ক্ষতি হয়ে গেল। বিমার টাকা পেতে কোনো চেষ্টাও করিনি। পরে শুনলাম বিমা কোম্পানি থেকে টাকাটা আমি পেতে পারতাম। এই ক্ষতি পূরণের জন্য পরে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। একটা সময় কারখানা বন্ধ করে দিলাম।

মতিউর রহমান: পোশাকশিল্প ব্যবসা ভালো করছিলেন?

কাজী জাহেদুল: হ্যাঁ, তবে পুরকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার কারণে যে বিষয়টা আমার মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সেটা ছিলো মনে হতো সব কাজ আমিই সবচেয়ে ভালো করতে পারি। এমন ধারণা আসলে ঠিক ছিল না। ম্যানেজমেন্ট হচ্ছে অন্যদের দিয়ে কাজ করানো। পোশাক কারখানাটির নাম ছিল কাজী ফ্যাশনস লিমিটেড। বিদেশি ক্রেতারা আমাকে খালি কারখানা বড় করতে বলতেন। সেটা করতে পারিনি। কারণ মনে করতাম যে আমার ভালো ম্যনেজার নেই।

মতিউর রহমান: পোশাক ছেড়ে পোলট্রি খাতে তাহলে কবে থেকে?

কাজী জাহেদুল: এটা ১৯৯৫ সালের ঘটনা। ভারতের দিল্লিতে গেলাম। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের এক বন্ধু ছিলেন ওখানে। বেশ কিছু টাকাপয়সা রোজগার করে তিনি ও তাঁর স্ত্রী তখন মোটামুটি কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে দিল্লী চলে আসেন। তাঁরা তখন ব্রিজ (তাস) খেলে ও নানা আনন্দ করে সময় কাটাতেন। তাঁরা একদিন তাঁদের এক বন্ধুর কাছে যাওয়ার আমন্ত্রণ করলেন। সেখানে পরিচয় হলো পোল্ট্রি শিল্প মালিকের সঙ্গে। তিনি তার শিল্প দেখতে আমন্ত্রণ জানালেন। গাড়িতে তিন ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে হরিয়ানা রাজ্যে গেলাম। মরুভূমির মধ্যে ফার্মের চারদিক সবুজ। ভালো একটা লাঞ্চ করলাম ওখানে। একজন বাবুর্চি ছিলেন পাঁচ তারকা হোটেলের বাবুর্চির চেয়েও ভালো। ওই ফার্ম দেখে মনে হলো বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা আছে ভালো। পোলট্রি ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম, যা নিয়ে আমার কোনোরকম ধারণাই ছিল না।

মতিউর রহমান: এ ব্যবসায়ের শুরুর দিকটা যদি একটু বলতেন...

কাজী জাহেদুল: আমি বিদেশ থেকে এক দিনের মুরগির বাচ্চা উড়োজাহাজে করে এনে বিক্রি করতাম। যেদিন আনতাম, সেদিনই বিক্রি হয়ে যেত। পরে ভাবলাম, দেশেই কেন মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করি না। আত্মবিশ্বাস ছিল যে আমি পারব। ফরে দেশে উৎপাদন শুরু করলাম। ভালো সাড়াও পেলাম। আমার একটা ধারণা ছিল যে এই খাত একদিন বড় হবে। হলোও তা–ই। বেশি দিন সময় লাগেনি, পোলট্রি খাতের ৩৩ শতাংশ বাজার আমাদের দখলে চলে আসে। এখনো ২৫ শতাংশ বাজার আমাদের। অবস্থানগত দিক থেকে আমরা এখনো প্রথম এবং সবচেয়ে বড়।

মতিউর রহমান: ব্যবসায়ের ধরনটা কী, মানে কী কী করেন?

কাজী জাহেদুল: প্রথমত হচ্ছে মুরগির বাচ্চা। দুই ধরনের বাচ্চা—ব্রয়লার ও লেয়ার। ব্রয়লার থেকে মাংস এবং লেয়ার থেকে ডিম হয়। আরেকটা আছে পোলট্রি ফিড বা মুরগির খাদ্য। মুরগির মাংসের স্থানীয় বাজারে অনেক চাহিদা। এটা এখনো রপ্তানি শুরু হয়নি। তবে প্রক্রিয়াজাত মাংস, সসেজ ইত্যাদি রপ্তানি হয়। পরোটা, বিস্কুট, কেক ইত্যাদি পণ্য তৈরির কারখানাও করেছি। ভালো চলছে এগুলো।

মতিউর রহমান: পরোটা, বিস্কুট ইত্যাদি কি পোলট্রি খাতের মধ্যে পড়ে?

কাজী জাহেদুল: তা পড়ে না। এগুলো ফ্রোজেন ও বেকারি পণ্য। আমরা আসলে ব্যবসাটাকে বহুমুখী করার চেষ্টায় আছি।

মতিউর রহমান: কোনো আক্ষেপ আছে জীবনে?

কাজী জাহেদুল: সে তো আছেই। আসলে নির্মাণ খাত এখনো পুরোনো ধারাতেই রয়ে গেছে। আমাদের এখানে ১০ থেকে ১২ তলা ভবন তৈরি করতে তিন বছরের মতো লেগে যায়। এটা আসলে কয়েক মাসের কাজ। দেশে ভালো ভালো পুরকৌশলীও রয়েছেন। এই দিকটাতে ভালো একটা সম্ভাবনা আছে।

মতিউর রহমান: এদিকটাতে মনোযোগী হবেন বলে ভাবেন?

কাজী জাহেদুল: ভাবি। আমাদের গ্রুপেই ২০০ প্রকৌশলী আছেন। তুরস্কের কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্প্রতি যোগাযোগ হয়েছে। পরিকল্পনা আছে যে এ বিষয়ে কিছু একটা করব। দেখা যাক।

একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ১৫ কোটি টাকা খরচ করে বুয়েটকে একটা সম্মেলন কেন্দ্র করে দেব বলে ঘোষণা দিয়েছিলাম। আমাদের পক্ষ থেকে এটা বুয়েটের জন্য ছিল একটা উপহার। আমরা তিন ভাই-ই যেহেতু বুয়েটের ছাত্র। ২০১২ সালে বুয়েট-এর একটি আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ঘোষণাটা দিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী এটার ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, ‘ভালো কাজ করেছেন, আপনাকে এ জন্য কর অব্যাহতি দেওয়া হবে।’ চুক্তি অনুযায়ী তিন কোটি টাকাও বুয়েটকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সম্মেলনকক্ষ এখনো হয়নি। বুয়েটে যখনই একজন নতুন উপাচার্য (ভিসি) আসেন তখনই পরিকল্পনাটা বদলে যায়। নতুন পরিকল্পনা হয়। তারপর আবার বন্ধ।

মতিউর রহমান: আপনার সন্তানেরা কি ব্যবসায়ের সঙ্গে আছে?

কাজী জাহেদুল: আছে। ছেলেরা কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবসায়ে মনোযোগী। সফটওয়্যার কোম্পানি আছে আমাদের। ছেলেরা পরিবেশবাদী। জানিয়ে দিয়েছে, ফসিল ফুয়েল নিয়ে কিছু করবে না।

মতিউর রহমান: এত বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজ ও পেশার আপনার জীবনে, একটা চ্যালেঞ্জই বটে। এত কিছু সমন্বয় করলেন কীভাবে?

কাজী জাহেদুল: হা হা হা (হাসি)। আমাদের শিক্ষার মানটা খুব ভালো ছিল। আগে তা বুঝতে পারতাম না। শিক্ষার মান ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ের। যখন বিদেশে পড়তে গেলাম, তখন এটা বুঝতে পেরেছি। আর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তাম, তখন দেখতাম কখনো নোবেল বিজয়ী কেউ, কখনো কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বা বিখ্যাত কোনো স্থপতি বক্তব্য দিতে আসতেন। এগুলো আমাদের জন্য একটা জগৎ তৈরি করে দিয়ে গেছে। একটা আত্মবিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল।

আর দুটি জিনিস আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। একটা হচ্ছে যথাযথ বিশ্লেষণ করতে জানা বা সমস্যাটা খুঁজে বের করে আনা। আরেকটা হচ্ছে যথাযথ পরিকল্পনা করতে জানা। যথাযথ বিশ্লেষণ শেষে পরিকল্পনা করে এগোলে কোনো কাজেই খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। মোটকথা, যা-ই করতে চাই না কেন, জ্ঞানটা লাগবে। আমার কথা যদি বলি, পুরকৌশল, স্থাপত্যবিদ্যা, শিক্ষকতা ও দরজিগিরি শেষে এখন ডিম-মুরগির ব্যবসা করি, দোকানদারি করি। তখন ভাবতে ভালোই লাগে।

মতিউর রহমান: পোলট্রি খাতের আলোচনায় যদি আবার ফিরে আসি, ভবিষ্যৎ কী এ খাতের?

কাজী জাহেদুল: এখানে অনেকের একটা ধারণা আছে যে পোলট্রি খাতে খুব বেশি লাভ আছে। ফলে অন্য ব্যবসায় কিছু টাকা জমলে অনেকেই এ খাতে আসতে চান। এটা ঠিক যে দেশে মাথাপিছু আয় বাড়লে এ খাতের আয় বাড়বে। বিদেশে অনেক গবেষণা হয়েছে যে বাংলাদেশের পোলট্রি খাত দ্বিগুণ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে রপ্তানি না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বার্ড ফ্লু'র জন্য চারটা দেশের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ আছে। তবে আমরা রপ্তানি করি পরোটা, ডালপুরিসহ নানা ধরনের পণ্য। গন্তব্যস্থল ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ইত্যাদি দেশে। প্রবাসী বাঙালিরাই প্রধানতম ভোক্তা।

মতিউর রহমান: সরকারের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন?

কাজী জাহেদুল: বলতে গেলে সরকারের তেমন কোনো হস্তক্ষেপ নেই এ খাতে। এটা একটা বড় সুবিধা। করমুক্ত সুবিধা ছিল অনেক বছর। আরেকটা সুবিধা আছে খাতটির। কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক নেই। আমদানি শুল্ক থাকলে স্থানীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেত।

মতিউর রহমান: দেশের অর্থনীতি ও সমাজে উন্নয়ন কতটুকু দেখতে পাচ্ছেন? দেশটাকেই–বা কীভাবে দেখছেন?

কাজী জাহেদুল: আমি দেশ নিয়ে আশাবাদী। সমাজের অবক্ষয় নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। তবে লোকের মধ্যে ভালোভাবে কাজ করার উদ্যমও আছে। অন্তত অধিকাংশ লোকের মধ্যে তা আছে। গ্রামের মানুষ এখন অনলাইনে ব্যবসা করছে। কোথা থেকে, কীভাবে তারা তা শিখল, আমার কাছে অবাক লাগে। তবে এটা ঠিক যে পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটা আশীর্বাদ ছিল। দেশে একটা সময় শুধু ছিল ‘রাখি মালের’ ব্যবসা অর্থাৎ পণ্য মজুতের ব্যবসা। সেই জায়গা থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা করার একটা অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। অন্যান্য খাতেও ভালো করেছে বাংলাদেশ। ধানসহ কৃষিপণ্য, মাছ, গরু, ছাগল, ফলমূল ইত্যাদিতে ভালো করছি আমরা। উৎপাদন বাড়ছে।

মতিউর রহমান: শিক্ষা ব্যবস্থাপনা...

কাজী জাহেদুল: দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষার মানটা কমে গেছে। আমাদের সময় ছিল শিক্ষা অর্জন করতে হবে, এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে। আমাদের একটি কলেজ আছে। মুশকিল হচ্ছে কেউই বিজ্ঞান পড়তে চায় না। ছেলেদের চিন্তা হলো পুলিশের চাকরিতে ঢুকবে। ।ঢাকায় আমরা সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি চালাই। এখানকার ছাত্রীরা শিক্ষায় বিশেষভাবে আগ্রহী।

মতিউর রহমান: আপনাদের এ প্রতিষ্ঠানে কত লোক কাজ করেন?

কাজী জাহেদুল: গ্রুপে কাজ করেন ১২ হাজার লোক। ফার্ম/ হ্যাচারি আছে ৫০-এর বেশি। উত্তরবঙ্গেই বেশি। কারণ, ওখানে সহজে জমি পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় পোশাক খাতের ব্যবসাটা ছেড়ে না দিলেও পারতাম। এখন দক্ষতার সঙ্গে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করে ভালো বেতন-মজুরি দিতে পারতাম।

মতিউর রহমান: জীবন এখন কেমন লাগে?

কাজী জাহেদুল: বিরাট দুঃখ আছে। স্থাপত্যচর্চায় খুব মনোযোগ দিতে পারিনি। একটা ইচ্ছা আছে এখনো স্থাপত্যের কিছু কাজ করব।

মতিউর রহমান: কোনো কষ্ট ছিল তখন?

কাজী জাহেদুল: তখন একটা জিনিস খারাপ লাগত যে পোশাক খাতের ব্যবসাটা আসত মূলত শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়া থেকে। বেশির ভাগই তো ছিল নারী শ্রমিক। এক-দুইটা বাচ্চা থাকত তাঁদের। আর যে মজুরি দেওয়া হতো, তার অনেকটা নিয়ে যেতেন তাঁদের স্বামীরা। আবার যতটুকু মজুরি দেওয়া হতো, তা দিয়ে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার কোনো উপায় ছিল না। আরেকটা বিষয় খারাপ লাগত। উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে গ্রাম থেকে আসা নারীরা ৪ থেকে ৫ বছর পরই জীর্ণ–শীর্ণ হয়ে যেতেন। বিষয়টা আমাকে মানসিকভাবে পীড়া দিত।

মতিউর রহমান: কোনো আনন্দের কথা...

কাজী জাহেদুল: হ্যাচারিতে গিয়ে দেখলাম কপালে সিঁদুর-পরা সুন্দর ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল কিছু মুখ। একজনের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝলাম, তিনি যতটুকু আয় করেন তাতে গ্রামের সমাজে তাঁর একটা দাম আছে। এটা আমার খুব ভালো লাগে। মনে আনন্দ জোগায়।

মতিউর রহমান: আপনাকে ধন্যবাদ।

কাজী জাহেদুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন