বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে অবিলম্বে চালু করার দাবিতে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ মিছিল নিয়ে খুলনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন।  খুলনা, ২৭ সেপ্টেম্বর
বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করে অবিলম্বে চালু করার দাবিতে পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ মিছিল নিয়ে খুলনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন। খুলনা, ২৭ সেপ্টেম্বরছবি: সাদ্দাম হোসেন

দেশে ২৫টি সরকারি পাটকল বন্ধ হয়ে গেল। প্রশ্ন উঠেছে, লোকসানি মিল চালু থাকবে কেন? প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্র রাস্তা বানাবে, হাসপাতাল বানাবে, কিন্তু রাষ্ট্র ব্যবসা করবে কেন? রাষ্ট্র লোকসানি খাতের দায় নেবে কেন? বরং পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হোক।

ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল? বেসরকারি খাত মানেই লাভজনক আর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সবকিছুই লোকসানি? অথচ দেশে দেশে রাষ্ট্রের ব্যবসা করার নজির তো বেড়েই চলেছে! নাকি আমাদের ধারণা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পৃথিবী থেকে সরকারি মালিকানাধীন সবকিছুই বিলুপ্ত হয়ে গেছে? রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কমছে না বাড়ছে?

default-image

প্রতিবছর বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর তালিকা প্রকাশ করে ‘ফোর্বস’ বা ‘ফরচুন’-এর মতো পত্রিকাগুলো। ২০০৫ সালে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ৪৯টি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। ২০০৯ সালের ফোর্বসের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে তিনটিই ছিল রাষ্ট্রীয় কোম্পানি। ২০১৯ সালের ‘গ্লোবাল ৫০০’ কোম্পানির তালিকায় চীনের শতাধিক কোম্পানি আছে, এর মধ্যে ৮২টি কোম্পানিই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন!

বিজ্ঞাপন

১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত চীনের সব জমি ও কলকারখানার মালিকানা ছিল রাষ্ট্রের হাতে। শিয়াওপিং-এর আমলে বেসরকারীকরণ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত চীনের জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ২৫ ভাগই দেশটির রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর অবদান। শুধু চীনই নয়, বিশ্বের প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর তালিকায় ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল কিংবা ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর সংখ্যাও দিনে দিনে বাড়ছে। এর মধ্যে যেমন আছে চীনের সিনোপেক, পেট্রো চায়না বা ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন, তেমনি আছে ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস, মেক্সিকোর পেমেক্স, রাশিয়ার রোসনেফ্ট বা গাজপ্রম। চীনের রাষ্ট্রয়ত্ত কোম্পানি ‘চায়না মোবাইল’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর কোম্পানি। আবার বিশ্বের ৭৫ ভাগ তেলের ব্যবসাও করছে রাষ্ট্র।

১৯৩৩ সালের মহামন্দা ও দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূত্র ধরে ৫০–এর দশকে ‘বিগ গভর্নমেন্ট’-এর উত্থান, ’৭০ ও ’৮০–এর দশকে রিগান ও থ্যাচারের সঙ্গে বাজার অর্থনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বব্যাংকের বাজার অর্থনীতিবিদদের দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠা, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ‘থিঙ্ক-ট্যাংক’গুলোতে আমেরিকার সরকারের বিপুল বিনিয়োগ এবং একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়া, এমন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরেছে।

রাষ্ট্রের ব্যবসা করার ইতিহাস শত বছরের পুরোনো। তেল, গ্যাস, রেললাইন, এয়ারলাইন, বাস, টেলিযোগাযোগ ছাড়াও বিভিন্ন কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের ব্যবসা করার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। মুক্তবাজার না মিশ্র অর্থনীতি, সমাজতন্ত্র না পুঁজিবাদ, কেইন্সিয়ান অর্থনীতি নাকি ঢালাও বেসরকারীকরণ—এসব প্রশ্নের কোনো সাদামাটা উত্তর কোনোকালেই ছিল না। অর্থনীতির কতটুকু ব্যক্তিমালিকানায় যাবে, কতটুকু রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকবে, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে বরাবরই কাজ করেছে বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বরাজনীতির যে ধারাটি শক্তিশালী সেই ধারার প্রভাব। ১৯৩৩ সালের মহামন্দা ও দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূত্র ধরে ৫০–এর দশকে ‘বিগ গভর্নমেন্ট’-এর উত্থান, ’৭০ ও ’৮০–এর দশকে রিগান ও থ্যাচারের সঙ্গে বাজার অর্থনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বব্যাংকের বাজার অর্থনীতিবিদদের দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠা, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ‘থিঙ্ক-ট্যাংক’গুলোতে আমেরিকার সরকারের বিপুল বিনিয়োগ এবং একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়া, এমন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্ব অর্থনীতির মোড় ঘুরেছে। কখনো পুঁজিবাদ লাগামছাড়া হয়েছে, কখনো তার লাগাম টেনে ধরা হয়েছে।

default-image

১৯৯৭ সালে এশিয়ার মন্দায় কয়েক কোটি মানুষ পুঁজি ও কর্মসংস্থান হারায়। ২০০৮ সালে আমেরিকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় প্রবল ধাক্কা লাগে। অবিশ্বাস্য হারে ‘বেইল আউট’ দেওয়া হয় লোকসানি কোম্পানিগুলোকে। এসব কিছুর সূত্র ধরেই গত দেড় দশকে বহু প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ব্যবসায় ফিরেছে। বিশ্বে বর্তমানে শত শত রাষ্ট্রীয় কোম্পানি সফলভাবে চলছে, লাভ করছে এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করছে। পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরা কেউ কেউ এ অবস্থাকে বলছেন ‘স্টেট ক্যাপিটালিজম’ বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের পুনরুত্থান। আবার চীনা মডেলের সাফল্য ধরেই স্টেট ক্যাপিটালিজমের ধারণা আরও প্রসারিত হয়েছে।

আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ইয়েন ব্রেমার ২০১০ সালে প্রকাশিত তার বই ‘দ্য এন্ড অব দ্য ফ্রি মার্কেট’–এ খুব প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন করেছেন: বাজার অর্থনীতি যদি বিশ্বের লাখ লাখ বেকারকে চাকরি দিতে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে স্টেট ক্যাপিটালিজমের এ বিপুল বিকাশ কি ঠেকানো যাবে? বেসরকারি করপোরেশনগুলো কি চীন, রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সফল রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে? খেয়াল করুন, ব্রেমার বাজার অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা, কিন্তু ‘রাষ্ট্র কেন ব্যবসা করবে’ বা ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবসা মানেই লোকসানি’ এমন আলোচনা তিনি করেননি। রাষ্ট্রের ব্যবসা করার যে সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিয়ে চালানোর যে কৌশলগত পরিপ্রেক্ষিত আছে, পশ্চিমের বহু বাজার অর্থনীতিবিদকেই সেই বাস্তবতা অস্বীকার করতে দেখি না। অথচ বিশ্ব অর্থনীতির এ নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদেরা কি সব প্রশ্ন করেন, ‘রাষ্ট্র কেন ব্যবসা করবে?’ ‘রাষ্ট্র কেন ভর্তুকি দিয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখবে?’ যেন পৃথিবীজুড়ে ভর্তুকি দিয়ে লোকসানি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার নজির বাংলাদেশেই এই প্রথম তাঁরা দেখলেন!

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রের ভর্তুকি: সরকারি বনাম বেসরকারি

বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের সব রকমের সুযোগ–সুবিধা পেয়েই বড় হয়। নিয়মিত রাষ্ট্রের বিনিয়োগ আছে বলেই এগুলো বিশ্ববাজারে টিকে থাকে এবং লাভ করে। অথচ কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিই কি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়? বাস্তবতা হলো আমেরিকা বা ইউরোপের শত শত বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যুগ যুগ ধরে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পেয়ে আসছে। সেটা জেনারেল মোটরের মতো গাড়ির কারখানা হোক বা জেপি মর্গানের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান হোক। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় আমেরিকার প্রায় হাজারের কাছাকাছি বেসরকারি কোম্পানির লাগাতার রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পাওয়ার চমকপ্রদ সব তথ্য পাওয়া যায় (দেখুন: ‘মেগাডিল’, ২০১৩; ‘সাবসিডাই দ্য করপোরেট ওয়ান পারসেন্ট’, ২০১৪; ‘আংকেল স্যাম্‌স ফেভারিট করপোরেশন’, ২০১৫।) এসব প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি:

  • ২০০০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ১৮ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলার দেওয়া হয়েছে আমেরিকার প্রায় ৫০০ বড় কোম্পানিকে।

  • ৮০–এর দশক থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের মন্দা পর্যন্ত ধীরে ধীরে বাড়ছিল এই ভর্তুকির পরিমাণ। মন্দার পরে এক লাফে দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়েছে ভর্তুকি।

  • বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ কোম্পানির মধ্যে শতকরা ২৫ শতাংশই আমেরিকার কোম্পানি। শতাধিক বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি পাওয়ার রেকর্ড আছে তাদের।

  • চীনা পণ্যের অবাধ প্রসারে আমেরিকার ম্যানুফ্যাকচারিং (উৎপাদন) খাত গত কয়েক দশকে সংকুচিত হয়েছে, লোকসানি হয়েছে। সেই সুবাদে ভর্তুকির ‘টপ টেন’-এর তালিকায় উঠে এসেছে আমেরিকার বৃহৎ শিল্পকারখানাগুলো (জেনারেল মোটর, ফোর্ড, ফিয়াট, নিশান ইত্যাদি)।

default-image

ভর্তুকি নিয়ে টিকে থাকা বাজার অর্থনীতির ‘আইকন’ এসব কোম্পানির মধ্যে কে নেই? আছে বোয়িং, ফোর্ড, জেনারেল ইলেকট্রিক, জেনারেল মোটর। আছে জেপি মর্গান, ফেডেক্স, ওয়াল–মার্ট, ওয়াল গ্রিন, নাইকি ও নেস্‌লে। আছে গুগল, আমাজন, সামস্যাং, আইবিএম, ইন্টেল, আপেল, ও ডেল। অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে দুনিয়া দাপিয়ে বেড়ানো আমেরিকার করপোরেশনগুলোর ফুলেফেঁপে ওঠার ইতিহাস আসলে বাজার অর্থনীতির নয় বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পিঠে ভর করে মুনাফা করার ইতিহাস। এই যে ‘ফ্রি মার্কেটের’ পতাকা ওড়ানো পুঁজিবাদের সবচেয়ে আগ্রাসী মুখপাত্র আমেরিকা পৃথিবীজুড়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো ‘ফ্রি মার্কেট’–এর দর্শন ছড়িয়ে দিতে কয়েক দশক ধরে কত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলল, পারমাণবিক বোমার মজুত গড়ল, অথচ নিজ ভূমিতে গাড়ি হোক বা উড়োজাহাজ, কম্পিউটার হোক বা কেমিক্যাল, পোস্টাল হোক বা পেট্রোলিয়াম—এমন কোনো ব্যবসা নেই, যা সুদীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ভর্তুকি পায়নি। নোয়াম চমস্কি থেকে বার্নি স্যান্ডার্স এ বিপুল ভর্তুকিকে বরাবরই ‘পুঁজিবাদের পতাকার তলায় সমাজতন্ত্র’ বলে আসছেন।

বিজ্ঞাপন

কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি

তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, এয়ারক্রাফট, এভিয়েশন, স্টিল বা এবং রেলের মতো কৌশলগত খাতগুলোতে রাষ্ট্র বিনিয়োগ করে, পারলে নিজস্ব মালিকানায় রাখে, এটাই স্বাভাবিক। যেমন সত্তরের দশকে ফোর্ড বা জেনারেল মটরের মতো আমেরিকার প্রতিটি গাড়ি কারখানাই প্ল্যান্ট বসাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পেয়েছে। আশির দশকে কৌশলগত খাত হিসেবে বোয়িং, এয়ারবাস বা এক্সন মবিলের মতো কোম্পানিগুলো পেয়েছে বিপুল রাষ্ট্রীয় সহায়তা। বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনাকে উৎসাহিত করতে আমেরিকা, চীন আর ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে টেসলা মোটরসকে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। ২০১৪ সালে টেসলা স্বীকারও করে যে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ছাড়া টেসলার পক্ষে লাভ করে টিকে থাকা অসম্ভব।

পাট প্রক্রিয়াজাতকরণে পরিবেশদূষণের সরাসরি ঝুঁকি নেই, বরং প্লাষ্টিক শিল্পের দূষণ কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং এ ক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্প দুটোই প্রস্তুত অবস্থায় আছে, শুধু এ কারণেই পাটশিল্প আমাদের কৌশলগত খাত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।

আবার ব্রাজিলের এয়ারক্রাফট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এমব্রয়ের দীর্ঘ সময় ধরে লোকসানি ছিল এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ভর্তুকি পেয়ে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেছে। পরে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজারে সম্ভাবনাময় বলে এখন পর্যন্ত টানা রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পেয়ে আসছে। ভারতের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক লিমিটেড বর্তমানে এশিয়ার অন্যতম বড় এয়ারক্রাফট উৎপাদনকারী কোম্পানি। কিন্তু সেটা এক দিনে হয়নি। ভারত সরকারকে অর্ধশতাব্দী ধরে বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়েছে এ খাতে। এসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাভ–লোকসান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে গড়ে তোলা, টেনে তোলা বা টিকিয়ে রাখাই ছিল উদ্দেশ্য।
আমাদের কৌশলগত খাত এবং আমাদের শক্তি ও দক্ষতার জায়গা আমাদের কৃষি, আমাদের উর্বর পলিমাটি, আমাদের উৎকৃষ্ট মানের পাট, আমাদের ৩৫ লাখ পাট কৃষক ও কয়েক লাখ পাটশ্রমিক। অর্থাৎ পাট একাধারে কৃষি ও শিল্পের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ‘প্যাকেজ’। বিশ্ববাজারে পাটপণ্যের চাহিদা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সারা দুনিয়া প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজছে। পাটের রমরমা চাহিদা দেখে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার নতুন করে তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বজুড়ে পাটের ব্যাপক চাহিদার দিনে পাট আমাদের কৌশলগত খাত হবে না তো কোনটা হবে? গার্মেন্টস? নাকি বিশ্ব্যব্যাংক এসে বলে দেবে আমাদের কৌশলগত খাত কোনটা হবে?

খেয়াল করুন, পরিবেশদূষণের তালিকায় আমরা ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম! বায়ুদূষণে আমরা বিশ্বের প্রথম সারির দেশ। ইতিমধ্যে রাজধানীর চারটি নদী স্রেফ ধ্বংস হয়ে গেছে আমাদের ডাইং ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কারণে। অর্থাৎ শিল্পায়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করার শৌখিনতার দিন আমাদের শেষ। এদিকে পাট প্রক্রিয়াজাতকরণে পরিবেশদূষণের সরাসরি ঝুঁকি নেই, বরং প্লাষ্টিক শিল্পের দূষণ কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং এ ক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্প দুটোই প্রস্তুত অবস্থায় আছে, শুধু এ কারণেই পাটশিল্প আমাদের কৌশলগত খাত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি বনাম বেসরকারি

বলা হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানায় পাটকল হোক। তাহলে প্রশ্ন করুন, নব্বইয়ের দশকে যেসব পাটকল ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি খাতে, সেগুলোর অবস্থা কী? ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ হলো, খুব কম বেসরকারি উদ্যোক্তার সরকারি পাটকল কিনে সেগুলো নতুন করে চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। বরং তাদের নজর ছিল পাটকলগুলোর জমি ও অন্যান্য সম্পদের দিকে (ইমপ্লিমেন্টেশন কমপ্লিশন রিপোর্ট, জেএসএসি, বিশ্বব্যাংক, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৮)। ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন কমিশন থেকে প্রকাশিত হয় ‘বেসরকারীকরণকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সমীক্ষা’। এতে দেখা যায়, ১৯৯৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া ৭৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টিই বন্ধ পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে সস্তায় জমি ও যন্ত্রপাতি লুট করা হয়েছে, অথবা পরিত্যক্ত জমি দেখিয়ে বিপুল ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, ৩১টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু ৪৪টি কারখানা তো চলছে। এর উত্তরে বলতে হয় জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠা সম্পদ পানির দরে বেচে দেওয়ার পর বেসরকারি কোম্পানি কোটি কোটি টাকা লাভ করলে গণমানুষের লাভটা কী? আর এ দেশে ধনী ব্যবসায়ীদের লাভের টাকায় নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি হয়, নাকি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, সেই তথ্য পাওয়া যাবে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির একের পর এক রিপোর্টে।

default-image

এ বিষয়ে বিখ্যাত কোরিয়ান অর্থনীতিবিদ হা জু চাং-এর বক্তব্য হলো একটি আগাগোড়া দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষেত্রে যেসব লুটপাট ও অনিয়ম হয়, বেসরকারীকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে একই ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে মালিকানা ইস্যু নয়, বরং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর দুর্নীতি এবং দুর্বল জবাবদিহির কারণে বেসরকারি খাতেও ভর্তুকি বাগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আবার সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমরা দেখেছি, প্রস্তুতি ছাড়াই শত শত কারখানা ঢালাও বেসরকারীকরণের ফলে এক বিশাল ধনিক শ্রেণি গজিয়ে ওঠে, যারা সোভিয়েত রাষ্ট্রের কারখানাগুলো পানির দরে কিনে নিয়ে সেগুলো বিক্রিবাট্টা করে রাতারাতি বিদেশে টাকা পাচার করে দেয়। এভাবে আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) পরামর্শে ঢালাও বেসরকারীকরণের ফলাফল ছিল এক দশক ধরে রাশিয়ায় ভয়ংকর বেকারত্ব, রাতারাতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়া এবং আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।

১৯৯৮ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ হলো, খুব কম বেসরকারি উদ্যোক্তার সরকারি পাটকল কিনে সেগুলো নতুন করে চালানোর ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। বরং তাদের নজর ছিল পাটকলগুলোর জমি ও অন্যান্য সম্পদের দিকে (ইমপ্লিমেন্টেশন কমপ্লিশন রিপোর্ট, জেএসএসি, বিশ্বব্যাংক, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৮)।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতাই বলে বেসরকারি খাতে অল্প কিছু পাটকল লাভ করে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু ‘ছালার বস্তা’র গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বিশ্ববাজারে নতুন পাটপণ্যের চাহিদা তৈরি করতে এবং নতুন নতুন দেশে পাটের রপ্তানি বাড়াতে, এ মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ। যেমন উদ্যোগী হয়ে বছর বছর পোশাকশিল্পকে ভর্তুকি দেয় রাষ্ট্র, যেমন উদ্যোগী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আইন করে দেশের ভেতরে শস্য ও চিনির বস্তায় পাটপণ্যের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। যেমন অসংখ্য লোকসানি মোটর কারখানাকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে ইউরোপ বা আমেরিকা। যেমন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে লোকসান থেকে বের করে এনে লাভজনক করেছে রাষ্ট্র। যেমন প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে আধুনিক অ্যাসেম্বলিং কারখানা তৈরি করে দিচ্ছে রাষ্ট্র। এখানে উল্লেখ্য, গত অর্থবছরে ১০১ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রগতি (কালের কণ্ঠ, মার্চ ২৫ ২০২০)।

বিজ্ঞাপন

যে বছর আদমজী বন্ধ হয়েছে, সেই একই বছর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় পাটশিল্প ঘুরে দাঁড়ায়। যন্ত্রপাতি নবায়নে বিপুল টাকা ঢালা হয়, বকেয়া ব্যাংকঋণ মাফ করা হয়, আইন করে পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এ ছাড়া বিজেএমসির ২০১৭-১৮ সালের প্রতিবেদনেও স্পষ্ট উল্লেখ করা ছিল, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ভারত কূটনৈতিক তৎপরতা কাজে লাগিয়ে পাটশিল্পকে যেভাবে নীতিসহায়তা ও ছাড় দিচ্ছে, বাংলাদেশ সেভাবে দিতে পারছে না।’ কিন্তু কেন দিতে পারছে না, সেই অতি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রশ্নটি করব না আমরা?

গত ৫০ বছরে কতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে আমাদের পাটকলগুলোতে? যন্ত্রপাতি নবায়নে? অজুহাত দেওয়া হয়, সরকারি পাটকলের শ্রমিকদের বেতন তিন গুণ বেশি। শুনলে মনে হয়, বেতনের কারণেই বুঝি লোকসান। অথচ সরকারি পাটকলগুলোর শ্রমিকদের মূল বেতন ৮ হাজার ৭০০ টাকা। স্বাধীন দেশের একটি শিল্প খাতের শ্রমিকের বেতন এর চেয়েও কম হবে এমনটাই আশা করি নাকি আমরা? বারবার শ্রমিকের ঘাড়ে দোষ চাপালেও পাটনীতি এবং বিজেএমসির প্রায় প্রতিটি প্রতিবেদনেই স্পষ্ট উল্লেখ করা আছে যে লোকসানের মূল কারণ বছরের পর বছর ধরে পুরোনো মেশিন পরিবর্তন না করা, সময়মতো পাট কেনার বরাদ্দ না পাওয়া এবং বিদ্যুৎ–বিভ্রাট। ২০০২ সালের পাটনীতিতেও স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘এ দেশের পাটশিল্প পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে স্থাপিত মেশিনারি দ্বারা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।... সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হলেও পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য এ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়নি। ফলে পাটকলগুলোর উৎপাদনক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
ইদানীংকালে ২২টি সরকারি মিলের আধুনিকায়নের জন্য নতুন যন্ত্রপাতি কেনা বাবদ মাত্র এক হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল (স্বয়ংক্রিয় তাঁত, নতুন ভিম মেশিন ও ছয় মাসের পাটের মজুত গড়ে তোলা বাবদ।) অথচ পাওয়া গেল না! যে রাষ্ট্র ইউরোপের ডাবল খরচে রাস্তা বানাতে পারে, বিশ্বের সর্বোচ্চ খরচে সমুদ্রবন্দর বানাতে পারে, এক ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও প্রভাবশালী রেন্টাল কোম্পানিগুলোর হাজার কোটি টাকার বিল পরিশোধ করে দিতে পারে, সেই একই রাষ্ট্র শেষ ২৫টি পাটকল বাঁচাতে মাত্র কয়েক হাজার স্বয়ংক্রিয় তাঁত বসাতে পারে না?

২০০২ সালের পাটনীতিতেও স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘এ দেশের পাটশিল্প পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে স্থাপিত মেশিনারি দ্বারা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।... সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হলেও পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য এ পর্যন্ত কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়নি। ফলে পাটকলগুলোর উৎপাদনক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

যে রাষ্ট্র বেসরকারি রেন্টাল খাতে ৯ বছরে ২৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়, সেই একই রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে পাটকলগুলোর মাত্র ২০০ কোটি টাকার পুরোনো চক্রবৃদ্ধি সুদ মওকুফ করতে পারত না? আসল কথা হলো, এ দেশে রাষ্ট্র চাইলেই সেক্টর দাঁড়ায়, রাষ্ট্র না চাইলে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্র ভর্তুকি দিয়েছে বলেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ঘায়ে টলোমলো পোশাকশিল্প খাতও এত দূর এসেছে। রাষ্ট্র চেয়েছে বলেই আগাগোড়া ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখনো টিকে আছে। পাটকলের ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, ‘রাষ্ট্র চায়নি’, তাই এক হাজার কোটি টাকার বরাদ্দও পাওয়া যায়নি। উল্টো পাঁচ হাজার কোটি টাকার বাজেট হয়ে গেছে, অর্ধশতাব্দীর জাতীয় সম্পদ পানির দরে নিলামে ওঠানোর খরচ বাবদ।

default-image

বলা হয়, বেসরকারি মিলগুলোতে কর্মসংস্থান তো হয়েছে। হ্যাঁ হয়েছে, কিন্তু সেখানে মজুরি কত? সরকারি পাটকলের শ্রমিকেরা যে ন্যূনতম সুবিধাগুলো পান, সেই সুবিধাগুলো আছে সেখানে? বেসরকারি পাটকলগুলো বেশির ভাগই অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ করে। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কাজ করলে পাওয়া যায় মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। এদিকে সরকারি পাটকলগুলোর শ্রমিকের বেসিক বেতন ৮ হাজার টাকা। ‘গ্রস’ মজুরি ১২ থেকে ১৪ হাজার। তার ওপর আবার স্কুল–কলেজ ক্লিনিকের সুবিধা আছে! বিনা মূল্যে ডাক্তারি চেকআপ বা ইসিজি করারও সুযোগ আছে! আছে শ্রমিকদের খেলার মাঠ! আছে ভলিবল, হ্যান্ডবল, ফুটবলের টিম! আসল কথা হলো পোশাকশিল্পের মতো তীব্র দারিদ্র্যে টিকে থাকা, ধারদেনা করে মানবেতর জীবন কাটানো শ্রমিক দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে আমাদের।
মাথার মধ্যে অর্থনীতির বই পড়া সব থিওরি ঘুরছে ‘কস্ট কাটিং’ ‘এফিশিয়েন্সি’, ‘বেতন বাড়ালেই লস।’ তাই মানবেতর জীবনযাপন করা শ্রমিক না দেখলে অর্থনীতিবিদদের অস্বস্তি লাগে।পোশাকশিল্পের মালিক জনগণের ট্যাক্সের টাকায় একের পর এক অজুহাতে ভর্তুকি পেলে সমস্যা নেই, কিন্তু পাটকলশ্রমিক সভ্য মানুষের জীবন যাপন করার সুযোগ পেলে কান্নাকাটি করে মনে করিয়ে দিতে হয়, তিন গুণ বেতন! লোকসানি! খেয়াল করুন, বিশ্বব্যাপী একের পর এক মন্দার সময় বিপুল পরিমাণ টাকাপয়সা খরচ করে ধসে পড়া কোম্পানিগুলোকে টেনে তোলে রাষ্ট্র, মূলত কর্মসংস্থান বাঁচাতেই। তার মানে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান বাঁচাতে রাষ্ট্রের ভর্তুকি ঠিক আছে, কিন্তু সরকারি মিলের কর্মসংস্থান বাঁচাতে ভর্তুকি ঠিক নেই? আবার বেসরকারীকরণের উদ্দেশ্যে অঢেল টাকাপয়সা ঢেলে তার অর্ধেকটার হিসাব দিতে না পারলে সেটাও ঠিক আছে!

বিজ্ঞাপন

জনগণের মালিকানার রাজনীতি

খেয়াল করুন, দেশের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজে বিদেশি যে কোম্পানিগুলো কন্ট্রাক্ট (কাজ) পেয়েছে, তারা আসলে কারা? পায়রাবন্দর নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে চায়না স্টেট শিপ বিল্ডিং করপোরেশন। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে চায়নার সিএমসি। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে ভারতের এনটিপিসি এবং ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেড। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত আছে কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন ও চীনের সিনোহাইড্রো। ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের কাজ পেয়েছে চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাশিয়ার রোসাটম। কর্ণফুলী টানেলের কাজ করছে চায়নার কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। বঙ্গোপসাগরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লকের কাজ পেয়েছে ভারতের ওএনজিসি। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে বাদ দিয়ে বাপেক্সের আবিষ্কৃত কূপগুলোই একের পর এক তুলে দেওয়া হয়েছে রাশিয়ার গাজপ্রমকে। প্রশ্ন করুন, এরা কারা? এরা সবাই রাষ্ট্রীয় কোম্পানি।
অর্থাৎ এ দেশের মাটিতে দুনিয়ার তাবৎ রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এসে মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে মুনাফা তুলে নিয়ে যাবে আর আমরা হব নাইজেরিয়া মডেল? সঠিক রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো না করে আমরা করব শিশুতোষ বিতর্ক? অথচ এ সময়ের একটা জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ একটি লুটেরা রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকলে জনগণের আসলেই লাভটা কী? যে রাষ্ট্র আমরা তৈরি করেছি, সেটা এতটাই নিপীড়নমূলক, এতটাই দুঃশাসনে অভ্যস্ত যে আমাদের পাটকল, চিনিকল, পেপার মিল, সার কারখানা, বাপেক্স, বা রেলের টাকা ঘুরেফিরে আমাদের কাছেই ফিরে আসবে, এমন ভাবার আদৌ আর কোনো কারণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র দুর্নীতিগ্রস্ত বলে, রাষ্ট্র নিপীড়নমূলক বলে জনগণের দীর্ঘদিনের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা সম্পদ লুটপাটের মহলে পানির দরে ছেড়ে দিতে হবে? বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদে জনগণের মালিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি চুরি–দুর্নীতি বন্ধ করে জনগণের সম্পদ কী করে জনগণের কাজে লাগবে, সেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতিতে যুক্ত হতে হবে সবাইকে। আগে তো মালিকানার বোঝাপড়া, তারপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং মালিকানা থেকে ন্যায্য পাওনা আদায়ের পথের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা।

মাহা মির্জা, উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক

মন্তব্য পড়ুন 0