বাদামতলীতে ফলের জমজমাট ব্যবসা

পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে আমের দরদাম করছেন ক্রেতারা। ছবিটি গতকাল তোলা l প্রথম আলো
পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে আমের দরদাম করছেন ক্রেতারা। ছবিটি গতকাল তোলা l প্রথম আলো

কাভার্ড ভ্যান থেকে ক্যারেটের পর ক্যারেট (প্লাস্টিকের বিশেষ ঝুড়ি, যেখানে ২০ কেজি ফল ধরে) ফল মাথায় করে আড়তে নিয়ে রাখছেন শ্রমিকেরা। সেখান থেকে পাইকারেরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন রাজধানীসহ সারা দেশে। আবার ওয়াইজঘাট থেকে বাদামতলী পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ফল বিক্রি করছেন প্রায় এক হাজার ব্যবসায়ী, যাঁরা স্থানীয়ভাবে ফড়িয়া নামে পরিচিত। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকের হাঁকডাকে সরগরম থাকে পুরো এলাকা।

পুরান ঢাকার বাদামতলী ফলের আড়তে গত রোববার ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেল। ওয়াইজঘাটে দেশি ও বাদামতলীতে বিদেশি ফল বেশি পাওয়া যায়। তবে বছরের এই সময়ে সব জায়গাতেই দেশি আমের রাজত্ব চলছে। এ ছাড়া কলা, নারকেল ও আমড়া পাওয়া যাচ্ছে। বছরের অন্য সময় রাজত্ব করে বিদেশি আপেল, খেজুর, মাল্টা, নাশপাতি ও আঙুর। চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব ফল আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা।

কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, প্রতিদিন ১০-১২ হাজার পাইকার ওয়াইজঘাট ও বাদামতলী থেকে ফল কিনতে আসেন। পুরো এলাকায় বিভিন্ন ভবনে ৪০০-৫০০টি আড়ত আছে। ফড়িয়ার সংখ্যাও হাজারের কম হবে না। দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানি করে। দিনে ১০০-১৫০ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফল নিয়ে জড়ো হয় সেখানে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দিনে বেশ কয়েক কোটি টাকার ফল বেচাবিক্রি হয় দেশের অন্যতম বড় এই পাইকারি আড়তে।

ওয়াইজঘাট এলাকায় আহসান মঞ্জিলের সীমানাপ্রাচীর ঘেষে ফুটপাতের ওপর বেশ কয়েক ক্যারেট ফজলি আম নিয়ে বসে ছিলেন মাদারীপুরের মোহাম্মদ কাউসার। ছয় মাস আগে ফলের ব্যবসায় নেমেছেন তিনি। জানালেন, ৬০-৬৫ টাকার ফজলি আম ৮০ টাকা দরে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ ক্যারেট আম বিক্রি করতে পারেন তিনি। কাউসার বললেন, ‘কোরবানি ঈদের পরের কয়েক দিন পর্যন্ত আম বেচব। তখন আশ্বিনা আম আসবে।’ তারপর কী করবেন জিজ্ঞেস করলে বলেন, তখন অন্য ফল বেচবেন।

কাউসারের কয়েক হাত দূরেই চীনা আপেল বিক্রি করছিলেন সঞ্জয় সরকার। আড়তদারের কাছ থেকে ফল নিয়ে চার বছর ধরে বিক্রি করেন টাঙ্গাইলের এই যুবক। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ১৫০-২০০ ক্যারেট আপেল বিক্রি হয় তাঁর।

জানতে চাইলে সঞ্জয় বলেন, ‘এক ক্যারেট আপেল ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছি। আড়তদারকে দেব ২ হাজার ১৫০ টাকা।’ এতে পোষায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জয় বলেন, ‘হ্যাঁ। ক্যারেটে ৫০ টাকা থাকলেই যথেষ্ট।’

ওয়াইজঘাটের লঞ্চ টার্মিনালের সামনে ট্রাকের নিচে কিছু আপেল নিয়ে বসে আছেন এক ব্যবসায়ী। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এগুলো ‘‘রিজেক্ট’’ আপেল। কম দামে বেচতেছি।’ রিজেক্ট মানে হচ্ছে আকারে ছোট ও মান কিছুটা খারাপ।

কথা প্রসঙ্গে জানা গেল, এই ব্যবসায়ীর নাম মো. মানিক। বাড়ি বরিশাল। ঈদের পর গত রোববারই তিনি প্রথম ব্যবসায় বসেছেন। সব মিলিয়ে বছর দুয়েক ধরে ফলের ব্যবসায় আছেন। দুপুর ১২টার দিকে মানিক জানালেন, সকাল থেকে তখন পর্যন্ত আট কেজি আপেল বিক্রি করেছেন। ট্রাকের নিচে বসেছেন কেন জানতে চাইলে মানিক হাসিমুখে বললেন, ‘গরিবের জীবন এভাবে চললেই হবে।’

মানিক, সঞ্জয় ও কাউসারের মতো ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মূলত ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরা ফল কেনেন। যাঁরা পুঁজির অভাবে চার–পাঁচ কেজি থেকে সর্বোচ্চ এক মণ ফল কিনতে পারেন না। এই খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রায় প্রতিদিনই আসেন।

কয়েকজন আড়তদার জানালেন, আমের মৌসুমে আমের জোগান নিশ্চিত করতে প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করেন আড়তদারেরা। রাজশাহী অঞ্চলের ব্যাপারীদের দাদন (অগ্রিম অর্থ) দিয়ে আমের বাগান কেনেন। পরে সেই বাগানের আম আড়তে পাঠান ব্যাপারীরা। তখন ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন হিসেবে কেটে রাখেন আড়তদারেরা। বছরের অন্য সময় আমদানি করা ফল বিক্রি হয় এসব আড়তে।

চলতি মৌসুমে আমের জন্য ৬০ লাখ টাকা দাদন দিয়েছে এ মজিদ অ্যান্ড সন্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারীর একজন আল আমিন খান বলেন, প্রতিদিন ৩০০-৪০০ ক্যারেট আম বিক্রি হচ্ছে। আমের চাহিদা আরও বেশি আছে। তবে ব্যাপারীরা আম কম পাঠাচ্ছেন।

ভারত থেকে চোষা আম ও আমড়া আমদানি হচ্ছে—এমন তথ্য দিয়ে আল আমিন বললেন, ‘ভারতের আম ও আমড়া আসতে শুরু করায় কয়েক দিনের মধ্যে দেশি আমের দাম পড়ে যেতে পারে। তখন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দেশি আমের ফলের উৎপাদন ভালো হওয়ায় আমদানি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’

বাদামতলীতে ফল সংরক্ষণের জন্য মদিনা গ্রুপের একটি হিমাগার আছে। হিমাগারটির ধারণক্ষমতা ৪ হাজার মেট্রিক টন। এখানে ১৫ কেজি আপেল ও মাল্টা রাখার জন্য প্রতি মাসে ২২ টাকা, ৫-৬ কেজি আঙুরের জন্য ১২ টাকা দিতে হয়। হিমাগারের ইনচার্জ তুহিন মৃধা বললেন, হিমাগারে এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত ফলের গুণাগুণ ঠিক রাখা যায়। রোজার মাসে পুরো হিমাগার খেজুরসহ বিভিন্ন ধরনের আমদানি করা ফলে পরিপূর্ণ থাকে।

বাদামতলীর ফলের আড়ত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফল আমদানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। সে জন্য ফলের বাজারও বড় হচ্ছে। তবে জায়গার অভাবে ওয়াইজঘাট ও বাদামতলী এলাকায় ব্যবসা আর বাড়ানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘ফলের আড়ত সরানোর বিষয়ে আমরা সিটি করপোরেশন থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাইনি। তবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেলে আমাদের যেতে আপত্তি নেই। বিষয়টি নিয়ে করপোরেশনকে অবশ্যই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।’