তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানি
রডের ব্যবসায় চাঙা ভাব
চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথমার্ধে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিএসআরএমের আয় বেড়েছে ৫০ শতাংশ।
রডের মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের দেওয়া প্রণোদনায় করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে রড উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। ফলে করোনার মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফায় বড় ধরনের উত্থান হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক রড কোম্পানির অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার রড বিক্রি হয়। বাজারে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে বিএসআরএম, একেএস স্টিল, কেএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাত। বাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশই এ চার কোম্পানির দখলে। এর মধ্যে বিএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত।
দেশে রডের বাজারে এক নম্বর প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম স্টিল। রডের বাজারের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠানটির দখলে। কোম্পানিটির গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এটির আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর মুনাফা বেড়েছে ৬৩ শতাংশের বেশি।
আর গত ছয় মাসে জিপিএইচ ইস্পাতের বিক্রি বা আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ।
কোনো কোম্পানির আয় থেকে সব ধরনের খরচ ও কর বাদ দেওয়ার পর কোম্পানির হাতে যে আয় থাকে, সেটি হলো নিট প্রফিট বা প্রকৃত মুনাফা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে কোম্পানিগুলো আবারও ব্যবসায় ভালো করতে শুরু করেছে। বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর সরকারি বড় প্রকল্পগুলোর কাজেও বেশ গতি এসেছে। বেসরকারি পর্যায়েও নির্মাণকাজ বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর রডের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে দেশে। চাহিদা সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে কোম্পানিগুলোকে। চাহিদা হঠাৎ যেভাবে বেড়ে গিয়েছিল, উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি।
এ ছাড়া বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং জাহাজের সংকট চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। এ সময় যেসব কোম্পানির হাতে পর্যাপ্ত কাঁচামাল মজুত ছিল, তারা ব্যবসায় বেশি ভালো করেছে।
কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার প্রথম ধাক্কা সামাল দিয়ে ভালো ব্যবসা করার পেছনে বাড়তি চাহিদা যেমন বড় ভূমিকা রেখেছে, তেমনি সরকারের দেওয়া প্রণোদনারও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। দুইয়ে মিলে কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে। তবে আয় যে হারে বেড়েছে, সে হারে মুনাফা বাড়েনি। কারণ, কাঁচামাল ও জাহাজভাড়া বাবদ কোম্পানিগুলোর খরচ অনেক বেড়েছে। তারপরও কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল রডের মূল্যবৃদ্ধি এবং করপোরেট কর ও ব্যাংকঋণের সুদ কমে যাওয়া।
তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিএসআরএম গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর ছয় মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিএসআরএমের আয় ১ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটি যে পরিমাণ আয় করেছে, তার ৯১ শতাংশই উৎপাদনের পেছনে খরচ হয়েছে। আগের বছর এ খরচ ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ। তাই আগের বছরের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেশি আয়ের তুলনায় মুনাফায় বড় ধরনের উত্থান হয়নি। এ সময়ে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে রডের দাম বাড়ানোর পুরো সুফল পায়নি কোম্পানিটি।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘সরকার করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বল্প সুদে যে প্রণোদনা ঋণ সুবিধা দিয়েছে, তা ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতে বড় ধরনের সহায়তা করেছে। এ ছাড়া করোনার প্রথম ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নির্মাণকাজে বেশ গতিসঞ্চার হয়েছে। এর ফলে আমাদের বিক্রি অনেক বেড়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা সেই তুলনায় খুব বেশি বাড়েনি।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের খরচ যতটুকু বেড়েছে, রডের দাম সেই তুলনায় বাড়েনি।
তালিকাভুক্ত আরেক রড কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। আগের বছর একই সময়ে ব্যবসা করেছিল ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে কোম্পানিটির আয় ৮৬৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে তাদের মুনাফা বেড়েছে ২৫ কোটি টাকা বা ৩৬ শতাংশ।