রেকর্ড দিয়ে যাত্রা শুরু শেয়ারবাজারে

রাজধানীর বসুন্ধরায় গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়
ছবি: প্রথম আলো

দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রথম মুঠোফোন কোম্পানি গ্রামীণফোন। দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানার এ কোম্পানি শেয়ারবাজারে যুক্ত হয়েছিল ২০০৯ সালে। সে সময় এটিই ছিল শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় মূলধনি কোম্পানি। ফলে গ্রামীণফোন তালিকাভুক্ত হওয়ার পর দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচকের যেমন বড় উল্লম্ফন ঘটেছিল, তেমনি বাজার মূলধনেও হয়েছিল রেকর্ড।

নতুন নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে দেশি-বিদেশি নতুন অনেক বিনিয়োগকারী নিয়ে এসেছে গ্রামীণফোন। তালিকাভুক্তির পর থেকে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের কোনো লোকসান গুনতে হয়নি। কারণ, বছর বছর ধারাবাহিকভাবে ভালো লভ্যাংশ দিয়ে গেছে কোম্পানিটি।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই ৫ বছরে গ্রামীণফোনের গড় লভ্যাংশের পরিমাণ ছিল ২২৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৫ বছর ধরে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে গ্রামীণফোন বিনিয়োগকারীদের গড়ে প্রায় ২৩ টাকা করে লভ্যাংশ দিয়ে গেছে। এ কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য পছন্দের শেয়ারগুলোর মধ্যে গ্রামীণফোন বা জিপি অন্যতম।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বরে শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয় জিপির। তার আগে কোম্পানিটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে প্রায় ৬ কোটি ৫৭ লাখ শেয়ার বিক্রি করে ৪৮৬ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। আর প্রাক্‌আইপিও প্লেসমেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিল আরও ৪৮৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শেয়ার ছেড়ে কোম্পানিটি ৯৭২ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছিল।

জানা যায়, গ্রামীণফোনের আইপিওতে দ্বিগুণের বেশি আবেদন জমা পড়ে। বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির আইপিওতে আবেদন করায় এটির আইপিও লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে। আইপিওতে গ্রামীণফোনের প্রতিটি শেয়ার ৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। এই ৭০ টাকার মধ্যে ১০ টাকা ছিল কোম্পানিটির শেয়ারের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু। বাকি ৬০ টাকা শেয়ারের প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য। ২০০৯ সালের ৭০ টাকার আইপিও শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য ৩২৯ টাকা।

শেয়ারবাজারে যেদিন গ্রামীণফোনের লেনদেন শুরু হয়, সেদিন এক দিনেই ডিএসইর প্রধান সূচকটি বেড়েছিল ৭৬৫ পয়েন্ট। এর মধ্যে এককভাবে গ্রামীণফোনের জন্য সূচক বেড়েছিল ৭১৭ পয়েন্ট। গ্রামীণফোন তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে আর কোনো কোম্পানির কারণে এক দিনে সূচকের এত বড় উত্থান আর হয়নি। গ্রামীণফোনের তালিকাভুক্তির মাধ্যমেই ডিএসইর তৎকালীন প্রধান সূচকটি প্রথমবারের মতো ৪ হাজার পয়েন্টের মাইলফলক ছাড়িয়েছিল। পাশাপাশি তালিকাভুক্তির দিনেই কোম্পানিটিতে ডিএসইর বাজার মূলধনে যোগ করেছিল প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।

লেনদেন শুরুর প্রথম দিনে ৭০ টাকার আইপিও শেয়ারের বাজারমূল্য উঠেছিল ১৭৭ টাকায়। সারা দেশের প্রায় ৩ লাখ ৪৭ হাজার ১৯৭ জন বিনিয়োগকারী আইপিওতে গ্রামীণফোনের শেয়ার পেয়েছিল লটারিতে। প্রতি লটে ছিল ২০০ শেয়ার।

ধরা যাক, ২০০৯ সালে একজন বিনিয়োগকারী আইপিওতে গ্রামীণফোনের ২০০ শেয়ার পেয়েছিলেন। সে জন্য তাঁকে বিনিয়োগ করতে হয়েছিল মাত্র ১৪ হাজার টাকা। সেই ১৪ হাজার টাকা দামের শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৬ হাজার টাকা। ২০০৯ সালের অক্টোবরে গ্রামীণফোনের আইপিওর চাঁদা গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে কোম্পানিটির আইপিও শেয়ার যাঁরা পেয়েছিলেন, তাঁদের টাকা প্রায় ১২ বছরে ৫ গুণ হয়ে গেছে। আর বছর বছর মুনাফাও মিলেছে প্রচলিত ব্যাংক সুদের হারের চেয়ে বেশি। তাই এ কথা বলাই যায়, গ্রামীণফোনের শেয়ার শুধু শেয়ারবাজারের উন্নয়নে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি বিনিয়োগকারীদেরও করেছে লাভবান।

জানতে চাইলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, গ্রামীণফোনের তালিকাভুক্তি এ দেশের শেয়ারবাজারের জন্য একটি মাইলফলক। এটি বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে নতুন নতুন অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে যুক্ত হয়েছেন। বাজারের আকার অনেক বড় হয়েছে। বিদেশে এ দেশের শেয়ারবাজারের পরিচিতি বেড়েছে। সর্বোপরি দেশি–বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আসার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছে কোম্পানিটি।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘গ্রামীণফোনের মতো ভালো মানের কোম্পানি আমাদের শেয়ারবাজারে যত বেশি আসবে, বাজারের গভীরতা তত বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারে কারসাজির ঘটনা কমে আসবে। তাই নানা ধরনের সুযোগ–সুবিধা দিয়ে হলেও বাজারে এ ধরনের কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো উচিত।’