বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে চাকরি করে কতটা এগোনো যাবে তা নিয়ে দ্বিধা ছিল নাজমা খাতুনের। চাকরি করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে যা পায় ঘর ভাড়া দিয়ে খেয়ে পড়ে চলে যায়। তাহলে বড় হব কী করে। নিজের কিছু করতে হবে। কিন্তু অন্য কোনো কাজই তো জানেন না। তাই যুব উন্নয়ন থেকে অনেক ধরনের প্রশিক্ষণ নিলেন। যেমন মুরগির খামার, মাছ চাষসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। কেবল ব্যবসা করার ইচ্ছে ছিল, বড় হওয়ার ইচ্ছে ছিল।

২০০৫ সালে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের পর্বটা হয়েছিল একদম শূন্য থেকে। তাঁর স্বামী মিজানুর রহমান তখন জুতা বিপণননের কাজ করতেন। এ থেকে নাজমার মাথায় বুদ্ধি আসে জুতা তৈরি করার। তবে কি থেকে কী করতে হবে কিচ্ছু জানা ছিল না দুজনেরই। পুঁজিও ছিল নামমাত্র। এ ক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন তাঁর সাবেক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা। তিনি নাজমাকে এক বছর কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ দিয়েছিলেন। তবে ব্যবসা করতে যে ট্রেড লাইসেন্স লাগে। আর তার জন্য প্রতিষ্ঠানের যে একটা নাম লাগে সেটাও জানা ছিল না নাজমা খাতুনের। ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে সেখানকার কর্মকর্তারা কোম্পানির কি নাম জানতে চান। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। পরে হুট করেই বলেন কুসুমকলি। দুই মেয়ের নাম জোড়া দিয়েই নাম দিয়ে দেন।

২০১৯ সালে সেরা মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান নাজমা। ওই বছরই নামি সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন নিজের ব্র্যান্ড চালুর দিকে। তার ব্যবসায়িক নীতিটাই হলো ক্রেতাকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো পণ্য দেওয়ার। নাজমার জুতার ব্র্যান্ড দুটো ভিনকা ও ড. মার্ক।

৫ থেকে ৬ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে একটা সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় জুতা ব্র্যান্ডগুলোর জন্য জুতা বানাতে শুরু করে নাজমা খাতুনের প্রতিষ্ঠান। তবে ২০১০-১১ সাল নাগাদ যখন নিজেকে একটা ভালো জায়গায় দাঁড় করালেন তখনই পুড়ে ছাই হয়ে যায় স্বপ্নের কারখানা। ২০১২ সালের ২৫ জুন দিনটি যেন এখনো দগ্ধ করে নাজমা খাতুনের হৃদয়কে। তবে ওই যে মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন কখনো পিছপা হবেন না, সেটায় তাকে এগিয়ে নিয়েছে আবারও শূন্য থেকে শুরু করতে। মাত্র ১৬ জন কর্মী নিয়ে, আরেকজনের কারখানা একটু জায়গা করে আবার শুরু করলেন কুসুমকলি।

২০১৪ সালে কুসুমকলি নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেন নাজমা। বরাবরই দেশ পেরিয়ে বিদেশেও নিজের ব্যবসার প্রসারের কথা ভাবতেন নাজমা। ইচ্ছে ছিল আশপাশের কোনো একটি দেশে গিয়ে তাদের বাজারটা দেখবেন। তারা কীভাবে কাজ করে। কীভাবে ব্যবসা চালাচ্ছে। সেই ইচ্ছে থেকে একাই মালয়েশিয়া যান। সেখানে একটি ব্যবসা সম্মেলনে যোগ দেন। তারপর ১৪ দিন কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন বিপনিবিতানে ঘুরে ঘুরে ব্যবসার গতিপ্রকৃতি বুঝে নেন। পরে সেখানে ১০০ ভাগ বিদেশি বিনিয়োগ কোটায় নিবন্ধন করে ‘ভিনকা’ নামে নিজের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠান খোলেন। নিজেই ঘুরে ঘুরে খুঁজে বের করেন শো–রুমের জায়গা। চালু করেন নিজের দোকান। যেখানে কুসুমকলি থেকে রপ্তানি করে বিক্রি করা হয় বাংলাদেশের জুতা। শো–রুম ছাড়াও কুয়ালালামপুরের স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয় তাঁর ভিনকা ব্র্যান্ডের জুতো।

এক নজরে
কুসুমকলি শু ফ্যাক্টরি লিমিটেড
প্রতিষ্ঠা: ডিসেম্বর, ২০০৫ সাল
কারখানা: গাজীপুরে
কর্মী সংখ্যা: ৪০০ জন
জুতার ব্র্যান্ড: ভিনকা ও ড. মার্ক
বিক্রয়কেন্দ্র: কুয়ালালামপুর (২০১৪), ঢাকার বসুন্ধরা সিটিতে (২০২১)
বিক্রি: ডিলারের মাধ্যমে সারা দেশে জুতা বিক্রি হয়।

২০১৯ সালে সেরা মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান নাজমা। ওই বছরই নামি সব ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন নিজের ব্র্যান্ড চালুর দিকে। তার ব্যবসায়িক নীতিটাই হলো ক্রেতাকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো পণ্য দেওয়ার। নাজমার জুতার ব্র্যান্ড দুটো ভিনকা ও ড. মার্ক। ভিনকা হচ্ছে সবার জন্য, মূলত স্যান্ডেল ধরনের জুতা। আর ড. মার্ক মেডিকেডেট জুতো। সারা দেশে অসংখ্য ডিলারের মাধ্যমে বিক্রি হয় তার কুসুমকলি শু ফ্যাক্টরি লিমিটেডের জুতা।
তবে ব্যবসার প্রসারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছিলেন নাজমা খাতুন। গাজীপুরের লতিফপুরে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের পাশে জমি কিনে ২০১৯ সালে করেছেন নিজের ‘কমপ্লায়েন্স কারখানা’।

সবকিছুই ঠিকঠাক মতো চলছিল। এবারে নাজমার জীবনে ধাক্কাটা দিল করোনা। গত বছর বড় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত কুয়ালালামপুরে বন্ধ আছে তার ভিনকা শো রুম। রপ্তানির যে লক্ষ্য নিয়েছিলেন তাও আটকে গেছে। খুবই অল্প পরিমাণে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে এখন। তবে সমস্যা নিয়ে যে বসে থাকার মানুষ নন নাজমা। করোনার এই সময় দেশের মধ্যে নানা জায়গায় বিক্রির পরিধি বাড়িয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, বরিশালের নানা মফস্বল শহরে ব্যাপক বিক্রি হয়েছে কুসুমকলির জুতো। এ বছরের জুলাইতে বসুন্ধরা সিটিতে খুলেছেন নিজেদের ভিনকা ব্র্যান্ডের দ্বিতীয় শো রুম। করোনার সংক্রমণ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। আর এর মধ্যেই দুবাইতে নিজেদের আরেকটি শো–রুম খুলতে বেশ আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন নাজমা খাতুন। রপ্তানির সঙ্গে বিদেশি কিছু ক্রেতাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে তার। সব মিলিয়ে আবার পুরোদমে এগিয়ে চলেছেন তিনি। ব্যবসায়িক মন্দায় পড়া সত্ত্বেও করোনার মধ্যে সরকারকে ২৫ লাখ টাকা আয়কর দিয়েছেন তিনি।

নাজমা খাতুন জানান, করোনার মধ্যে বেশ কিছু দিন কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ সময়েও কাউকে ছাঁটাই করেননি। ৪০০ কর্মীর সবাইকে নিয়মিত বেতন–বোনাস দিয়েছেন। তার কারখানায় কর্মরতদের ৮০ শতাংশই নারী। এমনকি কোনো কর্মীর বাড়িতে বৃদ্ধ মানুষ থাকলে, যাদের ভরণ পোষণ কঠিন হয়ে পড়ে কর্মীর জন্য, তাদেরও নিয়মিত সহায়তা করেন তিনি।

নারীদের জন্য কিছু করতে চাই। অনেক মেয়েকেই দেখি সন্তান হওয়ার পর কাজ ছেড়ে দিতে হয়। নিজের কোম্পানিতে একটি দিবাযত্নকেন্দ্র খুলব। আর এমন একটি স্কুল বানানোর ইচ্ছে রয়েছে, যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাচ্চাদের যা যা প্রয়োজন সব মেটানোর ব্যবস্থা থাকবে।
নাজমা খাতুন, প্রতিষ্ঠাতা, কুসুমকলি

নাজমার জীবনের এই পথচলা অনুপ্রাণিত করে অনেককে। নতুনেরা অনেকেই আসেন পরামর্শ নিতে। ২০১২ সাল থেকেই বিসিকের উদ্যোক্তা উন্নয়নের কোর্সে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন নাজমা। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। এই শিক্ষার্থীরা অনেকেই আবার নাজমার কারখানায় যান শিখতে। তাদের পুরোপুরি সহায়তা করা হয়। যত দিন ইচ্ছে তত দিন তারা যুক্ত থাকতে পারেন শেখার জন্য।

নাজমা বলেন, ‘আমি যখন শুরু করি কিছুই জানতাম না। অনেক জায়গায় ঠেকতে হয়েছে। প্রথমে দক্ষ যারা তাদের কাছে জেনে নিয়েছিলাম কি কি লাগবে। এমন প্রায় ১৫–২০ জনের সঙ্গে কথা বলেছি, একটা কারখানা করতে কি লাগবে, চলতি মূলধন কত লাগবে বুঝতে। এরপর কী কী লাগবে তার একটি তালিকা করি। কিছু পুঁজি নিয়ে এগিয়ে গেছি। দক্ষ কারিগর খুঁজে বের করেছি। তবে যদি যে কাজটা করব বা যে ব্যবসা করব সে সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান থাকে, তাহলে শুরুর পথটা সহজ হয়। আমাকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে সব বুঝতে। এমনকি আমি নিজের হাতে জুতাও তৈরি করেছি।’

সামনের স্বপ্নটা কী জানতে চাইলে নাজমা বলেন, নারীদের জন্য কিছু করতে চাই। অনেক মেয়েকেই দেখি সন্তান হওয়ার পর কাজ ছেড়ে দিতে হয়। নিজের কোম্পানিতে একটি দিবাযত্নকেন্দ্র খুলব। আর এমন একটি স্কুল বানানোর ইচ্ছে রয়েছে, যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাচ্চাদের যা যা প্রয়োজন সব মেটানোর ব্যবস্থা থাকবে। যাতে তাদের মায়েরা নিশ্চিতে কাজ করতে পারেন। কারণ দিন শেষে পরিবারটায় সবচেয়ে বড়। সব সফলতায় উপভোগ করা যায় সন্তানদের ভালো দেখলে।’

শাকিলা হক: সাংবাদিক

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন