default-image

এ যুগের মানুষ হিসেবে আমরা জানি, ১৯৩৬ সালে অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনসের ‘দ্য জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি’ শীর্ষক রচনার মধ্য দিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচনা হয়। এর পরবর্তী ইতিহাসকে তিনটি যুগে বিভক্ত করা যায়।

প্রথমত, ১৯৪০-এর দশক, যে দশক কেইনসের চিন্তা দ্বারা নির্দেশিত হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়, কেইনসীয় চিন্তা যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। এরপর ১৯৮০-এর দশকে মুদ্রানীতির যুগ শুরু হয়, পৌরোহিত্য করেন মিল্টন ফ্রিডম্যান। এরপর ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে অর্থনীতিবিদেরা এই মনোভঙ্গির মিশেল ঘটান। আর এখন করোনাভাইরাসের আঘাতে যখন সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন যুগের সূচনা হচ্ছে। সেই যুগ আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে?

বিজ্ঞাপন
default-image

কেইনসের অর্থনৈতিক চিন্তার মূল ধারণা ছিল ব্যবসায়িক চক্রের ব্যবস্থাপনা। সেটা হলো, মন্দা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে এবং সিংহভাগ মানুষকে কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ চিন্তা আরেকটু সম্প্রসারণ করে অর্থনৈতিক নীতির শিরোমণি করা হয়।

কেইনসের অর্থনৈতিক চিন্তা ২০ শতকের অন্যান্য অর্থনৈতিক চিন্তার মতো নয়, এ তত্ত্বে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক বড়। মহামন্দার অভিজ্ঞতা কেইনসীয় তাত্ত্বিকদের এই মর্মে আশ্বস্ত করেছিল যে অর্থনীতি প্রাকৃতিকভাবে নিজের ত্রুটি দূর করতে পারে না।

সরকারকে বিপুল অঙ্কের ঘাটতি বহন করতে হবে, অর্থাৎ খারাপ অবস্থার সময় যত টাকা রাজস্ব আদায় হবে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করতে হবে এই আশায় যে ভালো সময় এলে ঋণভার হ্রাস পাবে। তবে এই তত্ত্ব পরবর্তীকালে খাটেনি। ১৯৭০-এর দশকের দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ বেকারত্ব মূলধারার অর্থনীতিবিদদের এলোমেলো করে দেয়। তখন দৃশ্যপটে আসেন মিল্টন ফ্রিডম্যান।

বিজ্ঞাপন

আর এখন শুরু হয়েছে করোনাভাইরাসের প্রকোপ। সরবরাহব্যবস্থা ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে দাম বাড়ছে। তবে মহামারির সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গেছে চাহিদার ওপর। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়বে, তেমনি সুদের হারও কমবে। মানুষের বিনিয়োগের প্রবণতা কমে গেছে। দেশে দেশে ধনী মানুষেরা আয়ের বড় একটি অংশ সঞ্চয় করতে শুরু করেছেন।

পাশাপাশি মহামারির কারণে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত অসমতা একদিকে যেমন খোলাসা হয়ে গেছে, তেমনি তার মাত্রাও বেড়েছে। শোভন কাজ যাঁরা করেন, তাঁরা বাড়িতে থেকে কাজ করতে পারছেন; কিন্তু সরবরাহকারী, আবর্জনা পরিষ্কারকারীর মতো অতি জরুরি কর্মীদের তো মাঠে কাজ করতে হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের কাজ করতে হচ্ছে, যদিও এ কাজের জন্য তাঁদের মজুরিও খুব কম। আর পর্যটনশিল্পে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাজ হারানোর হার অন্যান্য খাতের তুলনায় সামঞ্জস্যহীনভাবে বেশি।

এ পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বাড়াতে হবে। কিন্তু এর আবার নানা ঝুঁকি আছে। যেসব দেশের সরকারের মাথায় এখন বড় ঋণ আছে, তারা ভাবতে পারে যে ঘাটতি নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই, এ ব্যাপারে তারা বরাবরই ব্যর্থ হবে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা—তাতে কিছু আসে যায় না।

এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। সেটা আবার তখন খুবই বেদনাদায়কভাবে পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচি উল্টো ফল দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অধিকতর পুনর্বণ্টন করতে গেলে ভীতির সৃষ্টি হতে পারে। এতে হঠাৎ করেই অর্থনীতির পতন হতে পারে। আবার করের হার বাড়িয়ে দিলে কর্মসংস্থান, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন ব্যাহত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
default-image

অর্থনীতি নিয়ে নতুন চিন্তা করার সুযোগ এনে দিয়েছে কোভিড-১৯। তবে একটা ব্যাপারে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। সেটা হলো বেকারত্ব কমলে বা সিংহভাগ শ্রমিকের হাতে কাজ থাকলে তাঁদের মজুরি বাড়ত বা তাঁরা আরও দর-কষাকষি করার সুযোগ পেতেন। তখন আর সম্পদ পুনর্বণ্টনের প্রয়োজন হতো না। সরকারি ঋণ নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করলে জলবায়ুবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ত। সরকারের পক্ষেও অর্থায়নের নতুন খাত বের করা সম্ভব হতো, যেখানে থাকবে অধিকতর উদ্ভাবন। সেই বাস্তবতায় অর্থায়নের ব্যয়ও কমে যেত। আর তখন মুদ্রানীতি বাস্তবায়নেও নগদ টাকার ঘাটতি বাধা হয়ে দাঁড়াত না। একটা ব্যাপার পরিষ্কার, সেটা হলো পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামো ক্ষয়ে গেছেই বলে মনে হচ্ছে। যেভাবেই হোক না কেন, পরিবর্তন আসছে।

দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে

মন্তব্য পড়ুন 0