বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় সেলিম নাকি বাউন্ডেলে ছিলেন। বাবা ছিলেন সাম্যবাদী। সেলিম রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো স্কুল পলাতক। এ স্কুল থেকে বের করে দিলে আরেক স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হলেন। সেখানেও টিকলেন না। আরেক স্কুল থেকে শেষে পরীক্ষা দিলেন। স্কুল পালাইলেই রবীন্দ্রনাথ হওয়া যায় না, কিন্তু সেলিম হওয়া যায় দেখছি!

তো আমাদের কৈশোর-তারুণ্যের বন্ধু এবং পারিবারিক বন্ধু সফিকুল ইসলাম সেলিমকে নিয়ে এত গৌরব করছি কেন?

শুধু এ কথা বললেই হবে না যে, ২০২০-২০২১ সালে সেলিম শতরঞ্জি রপ্তানি করে দেশে এনেছেন ৩০ মিলিয়ন ডলার। দাঁড়ান, টাকার অঙ্কে বলি। ৩ কোটি ডলার, মানে প্রায় ২৫৫ কোটি টাকা। (ব্যাংক থেকে একবারে যারা দুই হাজার-তিন হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়ে কেটে পড়েন, তাঁরা বলবেন, এটা কোনো টাকা হলো?) কিন্তু আমি গর্বভরে বলব, আমাদের বন্ধু সেলিমের কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান, এর ৫টি মূল কারখানায় কাজ করেন ৭ হাজার ৫০০ কর্মী। এদের মধ্যে ৮৫ ভাগ নারী। বাড়িতে বসে কাজ করেন ১২ হাজার। তাদের শতভাগই আবার নারী। এবার আমার গর্বের কারণ নিশ্চয়ই আপনারা বুঝতে পারছেন।

সফিকুল আলম সেলিম ১০ বছর ধরে প্রতিবার জাতীয় রপ্তানি ট্রফিতে স্বর্ণ জিতে চলেছেন। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ১ম পুরস্কার ও অনন্য সম্মাননা পেয়েছেন। ১০ বছর থেকে সিআইপি সম্মান পেয়ে আসছেন।

সফিকুল আলমের মুখে শুরুর গল্প:

‘শুরুটা ছবি দিয়ে। ফ্রেমে বাঁধানো ক্যানভাসের ওপর গমের খড় দিয়ে তৈরি হাজার দেড়েক ছবি বানিয়ে হাজির হলাম রাজধানীর শিল্পমেলায়। সময়টা ১৯৮৬ সাল। কিন্তু বিক্রি নেই দেখে হতাশ লাগল।

‘এমন সময় একটা নতুন আইডিয়া খেলে গেল মাথায়। “আপনি কি আপনার নিজের ছবি গমের খড় দিয়ে বানাতে চান?”—এই কথাগুলো একটা কাগজে হাতে লিখে স্টলে টাঙিয়ে দিলাম। ফল পেতে শুরু করলাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। স্টলে ভিড় বাড়তে লাগল। মেলা শেষে ফিরে এলাম রংপুরে। ১৯৯১ সালে রংপুরে ‘কারুপণ্য’ নামের একটি হস্তশিল্প বিপণনকেন্দ্র খুলি। বিসিকের বন্ধ থাকা শতরঞ্জি প্রকল্প লিজ নিয়ে পুরোনো কারিগরদের সংগঠিত করি। নতুন করে কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্প পরিসরে শতরঞ্জি উৎপাদন ও বিপণন শুরু করি। রংপুরের প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য শতরঞ্জিশিল্পকে পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখি। বুঝতে পারি, সে জন্য সবকিছুর আগে দেশজুড়ে শতরঞ্জির নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে। উঠেপড়ে লাগলাম এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজে। অর্ডার আসতে শুরু হলো।

এবার ভাবলাম, শতরঞ্জি বিক্রির জন্য ব্যাপক প্রচারণায় নামতে হবে। শতরঞ্জি বানিয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় স্টল দিতে শুরু করলাম। শতরঞ্জির কদর ও চাহিদা বাড়তে থাকে। একসময় বুঝতে পারলাম, দেশের বাইরে, শীতপ্রধান দেশগুলোতে শতরঞ্জির এক বিশাল বাজার অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। ২০০২ সালে জার্মানিতে ডোমোটেক্স নামে কার্পেট এক্সপোতে অংশগ্রহণ করি কারুপণ্যের শতরঞ্জি নিয়ে। ওইখানেই খুলে গেল সম্ভাবনার জানালা। যে শতরঞ্জি প্রায় হারাতে বসেছিল জনপদ থেকে, প্রায় ২৫ বছরের অগ্রযাত্রায় সেই শতরঞ্জি আজ রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়াসহ পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশে।

একনজরে

কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড

কারখানার সংখ্যা: ৫টি

কর্মীর সংখ্যা : ৭,৫০০

নারী শ্রমিকের অনুপাত ৮৫%

রপ্তানি শুরু : ২০০২ সাল

রপ্তানি গন্তব্য : ৭৫ দেশ

প্রধান রপ্তানি গন্তব্য : ইউরোপ (৬০%)

রপ্তানি ট্রফি ১০ বছর

রপ্তানি আয়

২০১৮-১৯ অর্থবছর ১.৭ কোটি ডলার

২০১৯-২০ অর্থবছর ১.৯ কোটি ডলার

২০২০-২১ অর্থবছর ৩.০ কোটি ডলার

সেলিমের কারুপণ্যের কারখানা দেখতে গিয়েছিলাম। বহুতল ভবন। পুরোটাই গাছে ঢাকা। নিচে ১৫ হাজার বর্গফুট জলাধার। পানির ওপর দিয়ে বাতাস গিয়ে ঢোকে কারখানায়। প্রাকৃতিকভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের আরেক জুনিয়র বন্ধু স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব নকশা করেছেন, আর আমাদের বড় ভাই সাইদুল হক এটাকে শিল্পশোভন অনন্যসুন্দর করেছেন। বাইরে থেকে ৬-৭ তলা এই ভবনটা দেখলে মনে হবে, গাছে ঢাকা একটা বিশাল পাহাড়। শুধু এই স্থাপত্যকর্ম করার দুঃসাহসের জন্যই সেলিমকে এবং এটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বায়েজিদ মাহবুবকে আমি এক শবার সালাম জানাই। ইন্ডাস্ট্রি করতে গিয়ে কেউ আর্ট আর পরিবেশবাদ করার সাহস পায়?

গত মাসে সফিকুল আলম সেলিমকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি উত্তর দিয়েছেন। নিচে তুলে ধরছি:

প্রশ্ন: জীবনের টার্নিং পয়েন্ট?

উত্তর: ডোমোটেকস হ্যানোভর ২০০২, জার্মানিতে অংশ নিয়ে ব্যর্থতা ও অপমানবোধ। অতঃপর দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলা। ২০০৫ বিশ্বখ্যাত হোম ফার্নিশিং রিটেল জায়েন্ট আইকেয়ার সঙ্গে ব্যবসা শুরু করা।

প্রশ্ন: কার প্রেরণা নেপথ্যে কাজ করেছে?

উত্তর: ছোটবেলা থেকে সমাজবদলের সংগ্রাম, মানুষের সঙ্গে থেকে একসঙ্গে একটু ভালো জীবনযাপনের অব্যাহত প্রচেষ্টা, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মানসিকতা, একধাপ এগিয়ে ধাক্কা খাওয়া এবং বুকে পাথর বেঁধে আবার এগিয়ে চলা, থেমে না থাকা। আমার কর্ম ও জীবনসঙ্গী সুরাফা হোসেন শীলার সাহসিকতা আমাকে কঠিন সময়গুলোতে সাহস জুগিয়েছে। আমার সহকর্মী সিদ্ধার্থ। লাহিড়ী সেই ২০০৩ থেকে ছায়া হয়ে আছে পরম ভালোবাসায়।

প্রশ্ন: করোনাকালে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

উত্তর: গত বছরের মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুন মাসে প্রচুর লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে বর্তমানে ভালো ক্রয়াদেশ আছে।

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

উত্তর: দেশের কারুশিল্প ব্যবসাকে আরও জনপ্রিয় করা। যাতে নতুন নতুন বাজারে পণ্যটির চাহিদা আরও বাড়তে থাকে। বিদেশি ক্রেতাদের মধ্য আরও বড় পরিসরে বাংলাদেশের কারুশিল্পের সম্মান ও যোগ্যতা তুলে ধরতে চাই। দেশের পাট, ঝুট কাপড়, কাশ-খড়ের-হোগলাপাতার পাশাপাশি কচুরিপানা, কলাগাছের বাকল,ভুট্টার খোসা, ধানের খড়, নারকেলের ছোবড়া ও সব ধরনের নবায়নকৃত আঁশ থেকে হস্তশিল্প উৎপাদন করে রপ্তানি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রজন্মের জন্য আকর্ষণীয় করতে কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ আরও উন্নত ও নিরাপদ করতে উদ্যোগ নেব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগেও কারুশিল্পের বাস্তবতা যেন সমুন্নত থাকে সে জন্য সময়োপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে। যেন দেশের মানুষ বেকার না হয়ে যায়। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি করা। প্রচলিত কৃষিকে আধুনিক, বিজ্ঞানমুখী ও লাভজনক করা প্রয়োজন। যাতে নতুন প্রজন্ম সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী হয়। আমরা মনে করি, বিজ্ঞানমুখী আধুনিক কৃষিব্যবস্থা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের পথ দেখাবে।

সেলিমের মাথায় দেশহিতৈষণা আর নতুন নতুন বুদ্ধি গিজগিজ করে। করোনা মহামারির মধ্যে ফোন করে অবাস্তব সব পরিকল্পনা পাঠাতেন। আমি জানি আমার কাছে এসব অবাস্তব মনে হলেও তাঁর মতো স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বাস্তবের কারিগরেরা এসব অসম্ভবকেই সম্ভব করেন।

সেলিমেরা বড় স্বপ্ন দেখেন। বাস্তবায়ন করেন। স্মল ইজ বিউটিফুল। লার্জ ইজ নেসেসারি।

যুগে যুগে সেলিমরাই জয়ী হন। দেশকে জয়ী করেন।

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক

ছবি: সেলিম ভাই (ঢাকায় সফিকুল আলম সেলিমের ছবি তুলেছেন)। কারখানার ছবি রংপুরের মঈনুল ভাই

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন