১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও নারী উদ্যোক্তা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথকে মসৃণ করার লক্ষ্যে সব মিলিয়ে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ওপর ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হতে যাচ্ছে। এই ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্বারা আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এখন মূল লক্ষ্য।

বর্তমানে বাংলাদেশে নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। কিন্তু এই অনুপাত অনুযায়ী দেশে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। নারীদের ব্যবসাক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে থাকার জন্যও সুস্পষ্ট কারণ আছে। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীসমাজ প্রায়ই এমন সব বাধার সম্মুখীন হয়, যা ব্যবসা শুরুর আগেই তার অনাগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

● নারীদের ব্যবসায়ী হওয়ার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

● সঠিক স্থানে জমি প্রাপ্তি

● গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির লাইন প্রাপ্তিতে বাধা

● যোগাযোগ সুবিধার অপর্যাপ্ততা

অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবেই নারীরা যদি সামাজিক ভুল দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দেওয়ার মতো একটি সুযোগ পান, তাহলে দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকেও অনেক নারী উদ্যোক্তা উঠে আসবেন। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নারীদের জন্য বিশেষভাবে ১০ শতাংশ জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্থাৎ মোট ৩০০০ হেক্টর জমিতে দেশের নারী উদ্যোক্তাদের একক আধিপত্য থাকবে; এবং বাকি ২৭০০০ হেক্টর জমিতেও তাঁদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ আছে এবং তা কাজেও লাগানো উচিত। এখন একজন আগ্রহী নারী, যিনি একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা রাখেন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, বিচক্ষণ কিন্তু প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা নন অর্থাৎ উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁর কী কী করণীয়?

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর অবস্থান বাংলাদেশজুড়ে। একেক অঞ্চল একেক ধরনের ব্যবসার জন্য ভালো। ক্ষেত্র অনুযায়ী জ্ঞান এবং দক্ষতার জায়গাটি ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়।

ছোট একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করি।

যিনি মিরসরাই অঞ্চলে ব্যবসা করবেন, তাঁর যে ধরনের কর্মী বাহিনী, দক্ষতা, পণ্য প্রয়োজন, তার সঙ্গে যিনি নাফ ইকো-ট্যুরিজম পার্ক অঞ্চলে ব্যবসা করবেন, তাঁর পরিকল্পনা কখনোই মিলবে না।

হ্যাঁ, উভয়েই লক্ষ্যে অবিচল, চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, কিন্তু বাংলাদেশে ইকো-ট্যুরিজমের চ্যালেঞ্জ আর লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চ্যালেঞ্জ এক নয়। অর্থাৎ, ব্যবসা করার জন্য নিজের আগ্রহের জায়গাটা আগে নির্বাচন করতে হবে। এটার ওপর প্রাথমিক মূলধনের পরিমাণ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নির্ভর করবে।

প্রতিটি ব্যবসার জন্যই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। একটা ভালো ‘বিজনেস মডেল’ না থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। আর বিজনেস মডেলেও সময় এবং প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন আবশ্যক। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কিছু জিনিস সব সময় মাথায় রাখতে হবে:

● প্রতিযোগী পরিবেশ

● প্রতিযোগীদের ব্যবসার কৌশল

● টেকসই পণ্য/সেবা

● বাজার গবেষণা

● নিজস্ব শক্তি এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করা

● অভিজ্ঞদের মতামত নেওয়া

● সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত সুযোগ কিংবা ঝুঁকি

● ভোক্তা সন্তুষ্টি ইত্যাদি

একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজে কী করতে চাই, সেটা বুঝতে পারা খুব জরুরি। কেননা এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি নিজের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাবেন। ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য এই দক্ষতার জায়গাটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তা অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করে থাকেন। সেই কর্মীদের দক্ষতার উন্নয়নের গুরুভার একজন উদ্যোক্তার কাঁধেই বর্তায়। তাই সফল হওয়ার জন্য একজন নারীর প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে হয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তা না হলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে টিকে থাকা অসম্ভব।

নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা করার জন্য খুব সহজেই অল্প সুদে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে ঋণ নিতে পারেন। আর্থিক সাহায্য ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি সংস্থা, এনজিওগুলো নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মধ্যে এমন উল্লেখযোগ্য কিছু সংস্থা হলো

১. বাংলাদেশ ব্যাংক

২. এসএমই ফাইন্ডেশন

৩. বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)

৪. উইমেন অন্ট্রাপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

৫. বাংলাদেশ ফেডারেশন অব উইমেন অন্ট্রাপ্রেনারস

৬. অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রাসরুট উইমেন অন্ট্রাপ্রেনারস, বাংলাদেশ

৭. অন্ট্রাপ্রেনার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার

৮. বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি

৯. মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেড

১০. চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স

১১. এসএমই ফাউন্ডেশন

১২. কেয়ার বাংলাদেশ

১৩. আশোকা বাংলাদেশ

অঞ্চলভিত্তিক সুবিধা ছাড়াও দেশে নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য এখন একটা নীরব আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিএসএসের সর্বশেষ প্রকাশিত ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরের মধ্যে ২৮,০০০ নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালের বাজেটটিও নারী উন্নয়নকেন্দ্রিক, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অতএব নারী উদ্যোক্তারা যদি এগিয়ে আসতে চান, এখনই সময়!

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি ও অন্ট্রাপ্রেনারশিপ সেন্টার এবং সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

>প্রশ্নোত্তর
যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান, এই বিভাগে তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন বিশেষজ্ঞরা। আপনার প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন স্বপ্ন নিয়ের ই–মেইল [email protected] অথবা ফেসবুক পেজের (fb.com/swapno.nie) ইনবক্সে। আজ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন মো. রাশেদুর রহমান

আমি দ্বাদশ শ্রেণির একজন ছাত্র৷ আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ৷ লেখাপড়ার খরচ বহন করাও আমার মা-বাবার জন্য কঠিন। আমি নিজে ভালো কিছু করে উপার্জন করতে চাই। এমন কিছু করতে চাই, যার মাধ্যমে ক্যারিয়ার গঠন করতে পারি এবং অন্যদের কর্মসংস্থান করতে পারি৷ আমি আমার কাজ দিয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চাই৷ যেকোনো ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আমার আছে। পরিশ্রম করতেও পছন্দ করি। আমি কী করব? কীভাবে একটা ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়? কীভাবে সফল উদ্যোক্তা হওয়া যায়?
মশিউর রহমান দ্বাদশ শ্রেণি, ব্যবসায় শিক্ষা, সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি অ্যান্ড কলেজ, গাজীপুর

তুমি যে এখনই ব্যবসা করার কথা ভাবছ, ক্যারিয়ারের পরিকল্পনা করছ, সে জন্য প্রথমেই তোমাকে সাধুবাদ জানাই। ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, পরিশ্রম করার মানসিকতা ও ইচ্ছা যেহেতু তোমার আছে, এখন প্রয়োজন পরিকল্পনা। কী করতে চাও, কোন ক্ষেত্রে তোমার দক্ষতা আছে, সেটা খুঁজে বের করাও জরুরি। কোনো প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করতে পারলে খুব ভালো হয়। আগে পড়ালেখার পাশাপাশি কোথাও কাজের সুযোগ খোঁজো। তাহলে এখন থেকেই তুমি পরিবারকে সাহায্য করতে পারবে। কাজ করতে করতেই হয়তো ব্যবসার ‘আইডিয়া’ তুমি পেয়ে যাবে।

উদ্যোক্তা হতে চাই। আমার জিজ্ঞাসা, কোথায় গেলে প্রশিক্ষণ নিতে পারব?
সোহেল রায়হান, কুড়িগ্রাম
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও কাজ করছে। ব্যাংকের মধ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, বেসিক; এনজিওর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংক, মাইডাস, ব্র্যাক ইত্যাদি ছাড়াও এন্ট্রাপ্রেনিউর ডেভেলপমেন্ট সেন্টার উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করছে। তা ছাড়া স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট, স্টার্টআপ বাংলাদেশ, জিপি এক্সেলেটর আগামীর বাংলাদেশে তরুণদের মুখ্য ভূমিকায় আনয়নের জন্য কাজ করছে।

শুধু পরিকল্পনা দেখিয়ে কি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া সম্ভব? সম্ভব হলে কোন ব্যাংক?

সালমান সাদাত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একেক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম একেক রকম। বাংলাদেশে এখন প্রায় সব ব্যাংকই উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুযোগ চালু করেছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আইডিএলসি ৫ বছর মেয়াদি স্টার্টআপ ঋণের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটালের’ সংস্কৃতিও অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ববহ ভূমিকা পালন করছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির প্রয়োজনবোধ থেকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূতভাবে ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এসএমই এবং কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। এসএমই ছাড়াও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নির্ধারিত আছে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য।