বাণিজ্য স্বার্থে বাংলাদেশ ও নেপালকে ভারতের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে: বিনোদ কে চৌধুরী
নেপালের শতকোটিপতি (বিলিয়নিয়ার) ও সিজি-কর্প গ্লোবালের চেয়ারম্যান বিনোদ কে চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল আরও বড় পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে চায়। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতিবাচক ভূমিকা পালন না করলে সেটি সম্ভব নয়।
বিনোদ চৌধুরী বলেন, ‘মাঝেমধ্যে আমাদের ভাগ্য ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই আমি মনে করি, ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক দিকটি টেনে আনার প্রয়োজন নেই। উভয় দেশকেই ভারতের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে, যাতে সবার স্বার্থগুলো বাস্তবায়িত হয়। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিন দেশের (বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারত) মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
আজ শনিবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বিলিয়নিয়ার বিনোদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে তাঁর লেখা ‘মেড ইন নেপাল: লেসনস ইন বিজনেস বিল্ডিং ফ্রম দ্য ল্যান্ড অব এভারেস্ট’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
ফোর্বস সাময়িকীর তালিকা অনুসারে, বিনোদ কে চৌধুরী নেপালের একমাত্র বিলিয়নিয়ার। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সার্বিয়াসহ ৩০টির বেশি দেশে ব্যবসা আছে তাঁর। তিনি নেপালের চৌধুরী গ্রুপের কর্ণধার। সেবা, শিল্প, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক খাত, ভোগ্যপণ্য, পর্যটনসহ নানা খাতের ব্যবসা আছে।
আজকের অনুষ্ঠানে আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান সঞ্চালনা করেন। এতে অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু; বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি; আইসিসিবির সহসভাপতি নাসের এজাজ বিজয় ও কার্যনির্বাহী সদস্য কুতুবুদ্দিন আহমেদ; সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উত্তরা গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বিনোদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দেশের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারব না। আমাদের (নেপাল) যদি বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হয়, তবে ভারতের সাহায্য প্রয়োজন। কারণ, আমরা শুধু ভূবেষ্টিত দেশই নই, আমরা মূলত ভারতবেষ্টিত দেশ। এটা ভুলে গেলে চলবে না।’
একই প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে কথা বলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। আধুনিক অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথের ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘বইটিতে বলা হয়েছে, আপনি যদি আপনার সমাজের উন্নতি করতে চান বা দেশকে সমৃদ্ধ করতে চান, তবে আপনাকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করতে হবে। আপনি হয়তো আপনার কাছে থাকা কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদ দিয়ে কিছুটা উন্নতি করতে পারেন, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে বাণিজ্য না করলে প্রকৃত সমৃদ্ধি আসবে না।’
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘রাজনীতিতে আপনার অবস্থান যা-ই থাকুক না কেন, সম্পদ বৃদ্ধি, উন্নত ব্যবসা ও অর্থনীতির জন্য দূরবর্তী কোনো দেশের চেয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোই মৌলিকভাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিশ্চিত যে বর্তমান সরকার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। কারণ, আমাদের সব প্রতিবেশীর সঙ্গেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করা প্রয়োজন।’
আবদুল আউয়াল মিন্টু আরও বলেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে ভালো রাজনীতি ও অর্থনীতি প্রয়োজন। এই দুইয়ের সম্পর্ক পরস্পর যমজ ভাইয়ের মত। ভালো রাজনীতি ছাড়া ভালো অর্থনীতি সম্ভব নয়, আবার ভালো অর্থনীতি ছাড়া ভালো রাজনীতির নজিরও পৃথিবীর কোথাও নেই। এই দুইয়ের অভাবেই দারিদ্র্য ও বৈষম্য তৈরি হয়। বাধ্য হয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বাংলাদেশ ও নেপাল এ বাস্তবতার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। নতুন বাস্তবতায় রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে জেনজি(জেনারেশন জেড) নেতৃত্বে আবার গণঅভু্ত্থান হতে পারে।
‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে’
গত ৩০ বছরে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব একটা এগোয়নি বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন বিনোদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সম্প্রতি নেপাল বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু করেছে। এ ছাড়া আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ও নেপাল বড় আকারের সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলতে পারে। আমি চাই, আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি পাক, বিশেষ করে নেপালের রপ্তানি বৃদ্ধি পাক।
ছাত্র–জনতার নেতৃত্বে জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের দেড় বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। নেপালেও জেন-জিদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে বিনোদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি একটি দারুণ সুযোগ। কারণ, উভয় দেশেই এখন নতুন সরকার। আমি যতটুকু বুঝেছি, উভয় দেশের নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য বা এজেন্ডা হলো বেকারত্ব সমস্যা এবং অতীতে দেশ দুটির মোকাবিলা করা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা। আর এই প্রেক্ষাপটেই কিন্তু জেন-জি আন্দোলন হয়েছে।’
বিনোদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই আশাবাদী। পুরো পৃথিবী এখন বাংলাদেশের দিকে অনেক শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকিয়ে আছে। তবে চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে একগুচ্ছ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর একটি যৌক্তিক সমাধান বেরিয়ে আসবে। আর আমি মনে করি, বাংলাদেশ এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখে।’
‘জেন-জি আন্দোলন’ নিয়ে যা বললেন
বিনোদ চৌধুরী ব্যবসায়ের পাশাপাশি নেপালের রাজনীতিতে আছেন। দেশটিতে তিন দফায় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি। বিনোদ চৌধুরী মনে করেন, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসা উচিত। এ প্রসঙ্গ টেনে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অনেক সফল ব্যবসায়ী মনে করেন, রাজনীতিতে সরাসরি আসা উচিত নয়। কিন্তু আমি মনে করি, সত্যিকারের বড় পরিবর্তন আনতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বা রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ও নেপালে কাছাকাছি সময়ে সরকার পরিবর্তন আন্দোলন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের ঘটনা ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে টেনে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ বিনোদ চৌধুরী বলেন, নেপালে জেন-জি আন্দোলনের পর চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। সেখানে কোনো সহিংসতা ছিল না, নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে কোনো অনিয়ম বা কারচুপির অভিযোগ ছিল না। এটি ছিল অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া এবং সব দল এতে অংশ নিয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জেন-জি আন্দোলন থেকে নতুন সরকার নির্বাচনের মধ্যে একটি বড় সময়ের ব্যবধান ছিল। অনেক দুর্বলতাও ছিল। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিজ্ঞতা বিএনপিকে একধরনের জনসমর্থন দিয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য (নুডলস) ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (বিওয়াইডি) খাতে সিজি-কর্পের বিনিয়োগ রয়েছে। তবে বেশির ভাগ দেশে প্রতিষ্ঠানটির পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা থাকলেও বাংলাদেশে এই খাতে তাদের বিনিয়োগ নেই।
এ প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে একজন ব্যবসায়ী জানতে চাইলে বিনোদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে বছরে গড়ে ছয় লাখ পর্যটক আসেন। নেপালে নানা সংকটের মধ্যেও ১২ লাখের বেশি পর্যটক আসেন। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশকে একটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে দেখা হয় না। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের পুরো পর্যটন নীতিটি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। চিকিৎসা, শিক্ষা, চা–বাগানসহ নানা খাতে পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। যেমন কক্সবাজার থেকে সরাসরি নেপালে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। তাতে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গে যাওয়ার সুযোগ পাবেন পর্যটকেরা।