সিইওর কথা
ব্যাংকার থেকে খাদ্যপণ্য কোম্পানির প্রধান নির্বাহী
দীর্ঘদিন ব্যাংকে কাজ করার পর কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যুক্ত হন তানভীর হায়দার চৌধুরী। ৯ বছরের মধ্যেই হিমায়িত খাদ্যপণ্যের বাজারে কাজী ফুডকে শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছেন তিনি। সফল এই সিইও কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
বিখ্যাত বাবার সন্তান তানভীর হায়দার চৌধুরী। বাবা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা মিলে বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার যে নীলনকশা বাস্তবায়ন করে, তারই অংশ হিসেবে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকেও অপহরণ করা হয়। তার পর থেকে তাঁর আর খোঁজ পায়নি পরিবার।
ছোটবেলা থেকে বাবার মতো শিক্ষাবিদ (একাডেমিশিয়ান) হওয়ার স্বপ্ন ছিল তানভীর হায়দার চৌধুরীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক এলাকায় বড় হয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। তারপর ঢাবির অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। হঠাৎ ছন্দপতন, মা তাহমিনা মনোয়ারা চৌধুরী মারা গেলেন। তখন সবে সম্মান তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ হয়েছে।
শিক্ষাবিদ হতে হলে দীর্ঘ পড়াশোনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, তাতে বড় ভাই তাসনিম হায়দার চৌধুরীর ওপর আর্থিক চাপ পড়বে—তাই পরিকল্পনা বদলে ফেললেন তানভীর হায়দার চৌধুরী। দ্রুত কর্মজীবন শুরু করতে আইবিএ থেকে এমবিএ করলেন।
কর্মজীবনের শুরুর কথা
এমবিএ শেষ করার পর ১৯৯৪ সালে বেসরকারি একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। মাসে বেতন আট হাজার টাকা। দাতা সংস্থার অর্থে গবেষণায় স্বচ্ছতা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে চাকরি ছেড়ে দেন। তখন বারডেমের অধীনে জাতীয় ডায়াগনস্টিক নেটওয়ার্কের কাজ কেবল শুরু হয়েছে। সেখানে প্রকল্প সমন্বয়কারী হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখানে কয়েক মাস কাজ করার পর ব্র্যাকের স্থপতি পদে কর্মরত এক বন্ধুর পরামর্শে সংস্থাটির আরইডি বিভাগের স্টাফ ইকোনমিস্ট পদের জন্য সাক্ষাৎকার দিলেন। সাক্ষাৎকারের শেষ পর্বে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের মুখোমুখি বসেন। স্যার তানভীরের শিক্ষাগত সনদ দেখে বললেন, ‘তুমি তো অনেক কিছু করতে পারো। এখানে এসেছ কেন?’ তানভীর বললেন, ‘আমি দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’ স্যার তখন বললেন, ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার মনটা নরম। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হলে যেমন নরম মন লাগে, তেমনি শক্ত মাথাও লাগে।’ তানভীর হায়দার চৌধুরী বললেন, ‘স্যারের এই কথা পরবর্তী সময়ে আমার কর্মজীবনে নানাভাবে কাজে লেগেছে।’
ব্র্যাকে যোগ দিলেন তানভীর। বেসরকারি এই সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রভাব মানুষের ওপর কতটা পড়ে, তা দেখতে প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে লাগলেন। এভাবে তিন মাস কাজ করলেন। পরে এক বন্ধুর জোরাজুরিতে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি পদে আবেদন করলেন। তানভীর বললেন, ‘আমি কোনোরকমে নিজের একটা সিভি বানালাম। সেই বন্ধুই কাভার লেটার লিখে দিল। তখন প্রায় প্রতিদিনই হরতাল চলছে। রিকশা নিয়ে দুই বন্ধু মতিঝিলে গেলাম। আমি রিকশায় বসে রইলাম। বন্ধুই ব্যাংকে গিয়ে সিভি জমা দিয়ে এল।’
সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর ব্যাংকের চাকরি হয়ে গেল। কী করবেন দোটানায় পড়ে গেলেন। নিজের জীবন ভালোভাবে গড়তে হলে ভালো খুঁটি দরকার। এমন ভাবনা থেকে ১৯৯৬ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে যোগ দিলেন তানভীর হায়দার চৌধুরী। ২০০১ সালে ব্যাংকটির বিপণন বিভাগের প্রধান হন। এরই মধ্যে গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক একীভূত হলো। আবার নতুন করে চাকরির জন্য আবেদন করলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণও হলেন। ২০০৩ সালে তিনি রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের ডিস্ট্রিবিউশনের প্রধান হলেন। ২০০৯ সালে করপোরেট ব্যাংকিং বিভাগের ট্রানজেকশন ব্যাংকিংয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
২০১১ সালের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার সময় উড়োজাহাজেই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তানভীরের বড় ভাই। সেই শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগল তাঁর। তানভীর বললেন, ‘তখন আমার মনে হলো, এবার একটা পরিবর্তন দরকার।’ সেই সময় কাজী ফার্মস গ্রুপের পরিচালক কাজী জাহিন হাসানের সঙ্গে তানভীর হায়দার চৌধুরীর কথা হয়। তখন তাঁরা ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিলে রাজি হয়ে যান।
কাজী ফুডসের সঙ্গে পথচলা
কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে ২০১৩ সালে যোগ দেন তানভীর হায়দার চৌধুরী। বেলিসিমো নামে প্রিমিয়াম আইসক্রিম দিয়ে কাজী ফুডসের যাত্রা শুরু। এরপর একে একে বাজারে আনতে থাকে চিকেন কাটলেট, চিকেন নাগেটস, চিকেন সসেজ, চিকেন বার্গার, সমুচা, শিঙাড়া, পরোটা, ডালপুরি, আলুপুরিসহ বিভিন্ন ধরনের হিমায়িত খাবার। বর্তমানে ৩৮ জেলায় কাজী ফুডসের ১৫২টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সব মিলিয়ে কাজী ফুডসে কাজ করেন ১ হাজার ২০০ কর্মী।
কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রির সিইও বলেন, ‘আমরা যখন হিমায়িত খাদ্যপণ্যের বাজারে আসি, তখন বাজারের আকার ছিল ১৫০ কোটি টাকার। এখন সেটি বেড়ে ৩৭০-৪০০ কোটি টাকা হয়েছে। তার মধ্যে চলতি বছর আমাদের হিস্যা ১০৫-১১০ কোটি টাকা হবে। এই বাজারে কাজী ফুডই শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে আইসক্রিমের ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বাজারের মধ্যে চলতি বছর আমাদের ব্র্যান্ডের ব্যবসা দাঁড়াবে ১২ শতাংশের মতো।’ এর বাইরে কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রি ১৩টি দেশে বেকারি পণ্য রপ্তানি করছে বলে জানালেন তিনি।
দিনের কর্মব্যস্ততা
আগের দিনের বিক্রির তথ্য সাতসকালেই পৌঁছে যায় মোবাইল ফোনে। সেগুলো পর্যালোচনা করে দিন শুরু হয়। তারপর বিক্রয় বিভাগের কোথায় কোন সমস্যা, তা নিয়ে কথা বলেন। প্রতিদিনই উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, বিপণনসহ বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে সভা করতে হয়। তার মধ্যে কিছু সভা অনলাইনেও হয়। সপ্তাহে এক-দুই দিন কারখানায় যান।
তানভীর হায়দার চৌধুরী বলেন, নানা কারণে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। সেটিকে কতটা কমানো যায়, তাই নিয়েই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে। কারণ, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া মানেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া।
অবসর কাটে যেভাবে
অবসরে প্রচুর বই পড়েন তানভীর হায়দার চৌধুরী। ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, সাহিত্যসহ নানা বিষয়ে পড়েন। তানভীর বলেন, ‘আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্ত বলা যায়। তবে দেশে-বিদেশে আরও অনেক লেখক আমার পছন্দের তালিকায় আছেন।’
ঘুরতেও পছন্দ করেন কাজী ফুডের এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। করোনাকালে একটু বিরতি গেছে। এর আগে দেশে-বিদেশে ঘুরেছেন। স্ত্রী ইভা রহমান একাধারে ব্যাংকার ও সমাজকর্মী। তাঁকে নিয়ে সময় পেলেই ঘুরতে বের হন তানভীর হায়দার চৌধুরী। বললেন, সুন্দরবন অসম্ভব ভালো লেগেছে। উত্তরবঙ্গটা সেভাবে ঘুরে দেখা হয়নি এখনো। যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
তরুণদের উদ্দেশে
১. প্রতিদিনই নতুন কিছু করার উদ্যোগ থাকতে হবে। যাতে আগের দিনের চেয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখা যায়। সেটি খুবই সাধারণ কাজ হতে পারে, যা আগে কখনো করা হয়নি।
২. যে কাজটি করছি, সেটি ভালোবেসে করতে হবে। ব্যাংকের কাজ করার ইচ্ছা আমার ছিল না। তবে যখন আমি ব্যাংকে কাজ করতে শুরু করলাম, তখন ভালোবেসেই করলাম।
৩. তারুণ্যের বয়সটা খুব ছোট হলেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে যা কিছু শিখব, তা যেন অপ্রয়োজনীয় মনে না করি। সবচেয়ে ভালো হয়, এমন কিছু শেখা যেখানে নিজের আগ্রহ আছে। সত্যিকারের আগ্রহের জায়গা খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী পড়াশোনা করলে বেশি কাজে দেবে।
গত মঙ্গলবার ধানমন্ডিতে কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রির প্রধান কার্যালয়ে তানভীর হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম আলোর দীর্ঘ আলাপ হয়। সবশেষে সফল এই সিইও জানান, বাবার মতো শিক্ষাবিদ হতে না পারলেও খুব একটা অতৃপ্তি নেই। প্রতিদিনই বিশাল এক কর্মী বাহিনীর কনিষ্ঠ থেকে জ্যেষ্ঠ কর্মীর কাছ থেকে তিনি শিখছেন। নিজের যতটুকু দেওয়ার আছে, সেটুকু মন খুলে দিচ্ছেন।