ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
রপ্তানিমুখী পোশাক খাতকে উৎসাহিত করতে ও প্রতিযোগিতা সক্ষম রাখতে আশির দশক থেকে সুতা আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। দেশের বস্ত্রকল মালিকেরা চান না এ সুবিধা আর বহাল থাকুক। কারণ, প্রতিবেশী দেশ কম দামে বাংলাদেশে সুতা রপ্তানি করছে। ফলে অস্তিত্বের সংকটের মুখে তাঁরা। ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও বলছে, প্রতিবেশী দেশ থেকে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার হোক।
তবে বন্ড-সুবিধা থাকবে কি থাকবে না—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১২ জানুয়ারি এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য সব ধরনের সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধার প্রত্যাহার চায়নি, চেয়েছে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার ওপর। বন্ডের আওতায় এ দুই ধরনের সুতাই বেশি আমদানি হয়ে থাকে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) প্রথমে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও পরে ২৯ ডিসেম্বর দুই দফা আবেদন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বিটিটিসি, যা সংস্থাটি গত ৬ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে। এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে এ কথাও উল্লেখ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান গতকাল শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করছি। সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, দেশের যে ৮৪ শতাংশ রপ্তানি আয় আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, তার ৫৫ শতাংশ অবদান নিট পোশাকের। নিট পোশাকের অন্যতম কাঁচামাল হচ্ছে এই ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা, যা আমদানি করা হয় মূলত প্রতিবেশী দেশ (ভারত) থেকে।
বিটিএমএ বলছে, দেশে এক কেজি সুতার উৎপাদন খরচ ৩ ডলার। অন্যদিকে একই মানের সুতা ভারত উৎপাদন করে ২ ডলার ৮৫ সেন্ট থেকে ৯০ সেন্টে। ভারত সেই সুতা বাংলাদেশে এখন ২ দশমিক ৫ ডলারে রপ্তানি করছে।
কাউন্ট কী
সুতার সূক্ষ্মতা বোঝাতে ‘কাউন্ট’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কোন সুতা কতটা হালকা বা ভারী, তা বোঝা যায় ওই সুতা কত কাউন্টের তা দিয়ে। কাউন্ট নম্বর বেশি হলে সুতা চিকন হবে, আর কাউন্ট নম্বর কম হলে সুতা হবে মোটা।
বন্ড-সুবিধা কেন
রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা দেয় বাংলাদেশ। এ ব্যবস্থায় শুল্ক ও কর ছাড় পেয়ে কম খরচে কাঁচামাল আনতে পারেন উদ্যোক্তারা, যা উৎপাদন ব্যয় কমায় এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। আমদানি করা সুতা দিয়ে তৈরি পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি করতে হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত বন্ডেড গুদামে সুতা সংরক্ষণ করা যায়।
দেশি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত কীভাবে
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে জানিয়েছে, বন্ড-সুবিধায় সুতার আমদানি দুই অর্থবছরে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে কমে গেছে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রি। দেশীয় সুতা কারখানাগুলো বর্তমানে তাদের উৎপাদনক্ষমতার ৬০ শতাংশ সুতা উৎপাদন করছে। তবে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টি কারখানা। বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে চালু কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে বলে উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা।
চালু কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবও এনবিআরের কাছে তুলে ধরেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয় বলেছে, এতে নিকট ভবিষ্যতে নিট পোশাক উৎপাদনকারী কারখানাগুলো আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে দেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, লিড টাইম বাড়বে, মূল্য সংযোজনের পরিমাণ কমবে ও কমবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভারতীয় সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশটির সরকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে নিতে পারে। তাতে উভয়দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি আশঙ্কা আছে। ইতিমধ্যে আমরা স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করলেও লাভ হয়নি। উল্টো ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে।
মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী আরও বলেন, বিশ্ব বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা ১৫-১৬ শতাংশ কমে গেছে। টিশার্ট উৎপাদনে দেড় ডলার খরচ হলেও বিদেশি ক্রেতারা সেই দাম দিতে চাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎস থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে কাঁচামাল আমদানি করে টিকে আছি। সেই সুযোগ বন্ধ বন্ধ হলে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁর প্রশ্ন, তখন কার কাছে সুতা বিক্রি করবে দেশীয় স্পিনিং মিল। ফলে পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
বিটিএমএর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্য ১ হাজার ৮৬৯, যার মধ্যে সুতা উৎপাদনকারী সদস্য ৫২৭। প্রাথমিক বস্ত্র খাতে তাদের বিনিয়োগ ২ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বিনিয়োগের বর্তমান বাজারদর প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ১৩ শতাংশের বেশি।
অন্যদিকে বিটিএমএর সহসভাপতি মো. শামীম ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার যদি সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার করে, তাহলে বস্ত্র খাত কিছুটা নিষ্কৃতি পাবে। সাধারণত ভারতের সঙ্গে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে ১০ থেকে ১৫ সেন্টের ব্যবধান থাকে। এ ব্যবধান এখন হয়ে গেছে ৫০ সেন্ট। আমরা চাই, আপাতত বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার হোক। সরকার চাইলে পরে আবার পর্যালোচনা করতে পারে।’
মূল্য সংযোজন লাগবে ৪০%
চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে—এ কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, উত্তরণের পর বাংলাদেশি পণ্যের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যস্থলগুলো থেকে শুল্ক-সুবিধা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে যাবে। প্রধান গন্তব্যগুলো হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ইত্যাদি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে জানিয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে গেলে রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খাতে মূল্য সংযোজনের হার হতে হবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি। ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিস্তরবিশিষ্ট মূল্য সংযোজনও (প্রথমে একটি রূপান্তর, পরে তার ওপর আরেকটি রূপান্তর) করতে হবে। আর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য-সুবিধা (জিএসপি) প্লাস সুবিধা পেতে গেলেও মূল্য সংযোজনের দরকার পড়বে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ। এসব বিবেচনায় নিট পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে।
গত ২৮ ডিসেম্বর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ জানিয়েছিল, ৫০টি কল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বস্ত্রকলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত। চলতি অর্থবছরের বাজেটে একদিকে বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে, অন্যদিকে করপোরেট কর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করেছে। এ ছাড়া নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ভারত নানাভাবে এ খাতকে প্রণোদনা দিয়ে উজ্জীবিত রেখেছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও বিটিটিসির সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহার হলে রপ্তানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, যে আঘাত সইবার মতো ক্ষমতা এই সময়ে বাংলাদেশের নেই। আমার প্রশ্ন, রপ্তানিকারকেরা কি বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে বাড়তি দাম নিতে পারবেন?’
মোস্তফা আবিদ খান আরও বলেন, সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহারের বদলে এই সময়ে অন্য কী উপায়ে বস্ত্র খাতকে প্রণোদনা দেওয়া যায়, আগে সেই বিকল্প বের করা দরকার।