স্মার্ট হোম: নিরাপত্তার পাশাপাশি যেখানে জীবনযাপন আরও সহজ

স্মার্ট হোম মানে শুধুই প্রযুক্তি যুক্ত করা নয়। এসব সুবিধা বাসিন্দাদের জন্য কতটা সহজ, কার্যকর, নিরাপদ ও দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণছবি: ফ্রিপিক

একটি বাসা বা বাড়ি কেমন হওয়া উচিত? প্রশ্নটির উত্তর একসময় ছিল বেশ সরল। পর্যাপ্ত জায়গা, আলো-বাতাস, নিরাপত্তা আর শহরের সুবিধাজনক এলাকায় অবস্থান—আবাসন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মূলত এসব বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া হতো। এখন শুধু একটি সুন্দর ফ্ল্যাট নয়; বরং সেখানে জীবনযাপন কতটা আরামদায়ক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে আবাসন খাতে যুক্ত হচ্ছে ‘স্মার্ট লিভিংয়ের’ ধারণা। ঘরের আলো, তাপমাত্রা কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কমানো, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর বিষয়গুলোও এখন আধুনিক আবাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

এশিয়ান ডুপ্লেক্স টাউন লিমিটেডের ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার সাকিব হোসেন অর্ক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের আবাসন খাতে গত কয়েক বছরে মানুষের জীবনযাপন, প্রত্যাশা ও চিন্তায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ক্রেতারা নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, কমিউনিটি ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই পরিবর্তিত প্রত্যাশার ফলেই আবাসন খাতে স্মার্ট লিভিং ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।’

ঘরের নিয়ন্ত্রণ হাতের মুঠোয়

স্মার্ট হোমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঘরের বিভিন্ন ব্যবস্থা সহজে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ। মুঠোফোন বা ভয়েস কমান্ডের সাহায্যে ঘরের বাতি জ্বালানো-নেভানো, পর্দা খোলা বা বন্ধ করা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা কিংবা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ধরে রাখার মতো সুবিধা পাওয়া সম্ভব। কেউ বাসায় না থাকলেও মুঠোফোনের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্মার্ট লক ও ভিডিও ডোরবেলের মতো নিরাপত্তাব্যবস্থাও। কে দরজায় এসেছে, কখন দরজা খোলা হয়েছে কিংবা বাসায় কেউ প্রবেশ করেছে কি না; এসব তথ্য দূরে থাকলেও মুঠোফোনেই জানা সম্ভব। বাসার বিভিন্ন জায়গায় ধোঁয়া, গ্যাস কিংবা পানির লিকেজ শনাক্ত করার সেন্সর যুক্ত থাকে স্মার্ট হোমে। এতে দুর্ঘটনার আগেই সতর্ক হওয়া যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক বা একা বসবাস করা ব্যক্তিদের জন্য এসব প্রযুক্তি বাড়তি নিরাপত্তা দিতে পারে।

আরাম বাড়বে সঙ্গে খরচও কমবে

স্মার্ট হোমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্বালানি সাশ্রয়। কোনো ঘরে কেউ না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী আলোর তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব মুঠোফোনে দেখা—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে দৈনন্দিন খরচ কমানো সম্ভব।

একইভাবে স্মার্ট মিটার বা পানি ব্যবহারের হিসাব রাখার ব্যবস্থা থাকলে কোন খাতে কতটা ব্যবহার হচ্ছে, তা সহজেই বোঝা যায়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনর্ব্যবহার এবং সৌরবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধবব্যবস্থার সঙ্গে এসব প্রযুক্তি যুক্ত হলে একটি আবাসন আরও টেকসই হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘স্মার্ট লিভিং’

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে সীমিত জায়গায় বাড়ছে মানুষের বসবাস। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। ফলে ভবিষ্যতের আবাসন শুধু দেখতে আধুনিক হলেই হবে না; সেটিকে হতে হবে ব্যবহারবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসইও।

এর সঙ্গে দুর্যোগের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ভূমিকম্প, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো ঝুঁকির পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি আবাসন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দেওয়া, নিরাপদে বের হওয়ার পথ নির্দেশ করা কিংবা দ্রুত সংশ্লিষ্টদের জানানোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও ভবিষ্যতের স্মার্ট আবাসনের অংশ হতে পারে।

এ বিষয়ে সাকিব হোসেন বলেন, ‘গেইটেড কমিউনিটি, আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, সবুজ ও খোলা জায়গা, হাঁটার সুযোগ, শিশুদের বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সুবিধা—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ লাইফস্টাইল এখন ক্রেতাদের বিবেচনায় আসছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের মধ্যে “বাড়ি” ও “জীবনযাপনকে” আলাদাভাবে দেখার প্রবণতা কমেছে। তাঁরা এমন একটি আবাসন চান, যেখানে পরিবারের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পাশাপাশি থাকবে কমিউনিটি লাইফ, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সব সুবিধা।’

তবে স্মার্ট হোম মানে শুধুই প্রযুক্তি যুক্ত করা নয়। এসব সুবিধা বাসিন্দাদের জন্য কতটা সহজ, কার্যকর, নিরাপদ ও দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি যেন জীবনকে জটিল না করে বরং সহজ করে, সেটিই হওয়া উচিত স্মার্ট আবাসনের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতের আবাসন তাই শুধু ইট-কংক্রিটের কাঠামো নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। বাংলাদেশের আবাসন খাত এই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত এবং বাস্তবে ‘স্মার্ট লিভিং’ কতটা সহজলভ্য হচ্ছে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।