স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ, নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা
কিডনির রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ক–কর অব্যাহতি।
হৃদ্রোগের চিকিৎসায় রিং বা স্টেন্ট ও চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি।
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার ইতিহাস নেই। বিদায়ী অর্থবছরের (২০২৫–২৬) সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।
শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়, স্বাস্থ্য খাতে নতুন কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও করা হয়েছে। যেমন কিডনির রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে শুল্ক–কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কিডনির রোগের চিকিৎসায় ব্যয় কমবে। দেশে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনশিল্পের বিকাশের স্বার্থে কাঁচামাল আমদানিতে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি সরকার স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতে দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে বলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারগুলো টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশুমৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
ইশতেহার বাস্তবায়নের উদ্যোগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলে আসছে, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। তবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ারও ইতিহাস নেই। এই প্রথমবার ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে এবার স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অতীতে এমনও দেখা যায়নি।
সংশোধিত বাজেটে যেন বরাদ্দ না কমে। আবার বছর শেষে আমরা দেখতে চাই, বরাদ্দ যা ছিল, তা খরচ হয়েছে। তা হলেই কেবল স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির সুফল মানুষ পাবে।সৈয়দ আব্দুল হামিদ, অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ছিল। একবারে ৫ শতাংশে উন্নীত করা কঠিন। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো হয়েছে এবং গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। নিশ্চয়ই পর্যায়ক্রমে তা আরও বাড়ানো হবে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু কাজ সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেন। এর মধ্যে আছে—জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার (ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম) আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ই–হেলথ কার্ড দেওয়া হবে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বাড়ানো হবে, রোগী পরিবহনের জন্য ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে, পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে ইত্যাদি। এ ছাড়া এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাজেটে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) কমানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, হৃদ্রোগের চিকিৎসায় রিং বা স্টেন্ট ও চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হবে। এতে স্টেন্টের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা ও লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা কমে আসবে।
স্বাস্থ্য বাজেট অতীতের বাজেটগুলোর তুলনায় ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, এটা ভালো লক্ষণ। আগে কখনো জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে যেন বরাদ্দ না কমে। আবার বছর শেষে আমরা দেখতে চাই, বরাদ্দ যা ছিল, তা খরচ হয়েছে। তা হলেই কেবল স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধির সুফল মানুষ পাবে।’