এমএফএসে গ্রাহক এখন বেশি স্বচ্ছন্দ

একটা সময় ছিল যখন বাজারে যাওয়ার আগে মানিব্যাগ চেক করতে হতো—পর্যাপ্ত নগদ টাকা আছে তো? এখন আর সেই দিন নেই। মানিব্যাগের বদলে এখন মানুষের হাতে হাতে ঘুরছে স্মার্টফোন, আর তাতেই চলছে যাবতীয় আর্থিক লেনদেন। শহরের বড় শপিং মল থেকে শুরু করে পাড়ার মুদিদোকান, এমনকি রাস্তার পাশের চায়ের দোকানেও এখন শোভা পাচ্ছে কিউআর কোড। চুরি বা ছিনতাইয়ের ভয়ে পকেটভর্তি নগদ টাকা নিয়ে ঘোরার দিন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। ডিজিটাল ওয়ালেট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) মানুষের আস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্য এখন এতটাই বেড়েছে যে দেশের লেনদেনব্যবস্থায় এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে।

এখন কেনাকাটায় এমএফএস ও কিউআর পেমেন্টের দাপট চলছে। মোবাইল ব্যাংকিং বলতে একসময় মানুষ শুধু এজেন্ট পয়েন্ট থেকে ‘ক্যাশ ইন’ বা ‘ক্যাশ আউট’কে (টাকা জমা দেওয়া ও তোলা) বুঝত। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে। ডিজিটাল লেনদেনকে এখন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে ভাগ করা যায়। নগদ টাকার ব্যবহার এড়িয়ে মানুষ এখন সরাসরি মার্চেন্ট পেমেন্টে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

দেশের ডিজিটাল কেনাকাটায় এখন প্রতি মাসে গড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি এমএফএসে লেনদেন হচ্ছে। এর মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলো যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ নানা প্রতিষ্ঠানের অবদান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। গত মার্চ মাসের পরিসংখ্যান বলছে, শুধু মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা ও সেবা বিল পরিশোধ বাবদ লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। ঈদের মতো বড় উৎসবগুলোতে এই লেনদেনের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। কিউআর কোড স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই সময় বাঁচছে।

দৈনন্দিন সেবা শতভাগ ডিজিটাল হওয়ার পথে

কেনাকাটার বাইরে অন্যান্য নাগরিক সেবায় এমএফএসের ব্যবহার মানুষের জীবনকে অভাবনীয় রকম সহজ করে দিয়েছে। অন্য সব ডিজিটাল সেবার ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও মোবাইলে ব্যালান্স রিচার্জ করার ক্ষেত্রে মানুষ এখন প্রায় শতভাগ এমএফএসনির্ভর। আগে যেখানে পাড়ার দোকানে মোবাইল অপারেটরদের এজেন্টদের কাছে গিয়ে রিচার্জ করতে হতো, এখন তা আঙুলের এক ক্লিকেই সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ এবং প্রিয়জনকে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠানো (সেন্ড মানি) এখন পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বিল দেওয়ার ভোগান্তি এখন অতীত।

রেমিট্যান্সেও এমএফএসের নতুন দিগন্ত

কেবল দেশের ভেতরের লেনদেনই নয়, প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত আয় বা রেমিট্যান্স দেশে আনার ক্ষেত্রেও এমএফএস বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। আগে ব্যাংকিং চ্যানেলের দীর্ঘসূত্রতা বা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে গিয়ে প্রবাসীদের যে ঝুঁকি পোহাতে হতো, মোবাইল ব্যাংকিং সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। এখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি বিশাল ও উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি চলে আসছে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা স্বজনদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে। এর ফলে ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা ছাড়াই গ্রাহকেরা মুহূর্তের মধ্যে টাকা হাতে পেয়ে যাচ্ছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি গতি সঞ্চার করছে।

নিরাপত্তা ও খুচরা টাকার সমাধান

মানুষ কেন নগদ টাকার বদলে ডিজিটাল ওয়ালেটকে বেশি নিরাপদ মনে করছে? এর প্রধান কারণ হলো নিরাপত্তা। পকেটে বড় অঙ্কের টাকা বহন করা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তাঘাটে পকেটমার বা ছিনতাইকারীর ভয় এখন আর ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারকারীদের তাড়া করে না। মোবাইল হারিয়ে গেলেও পিন কোড ছাড়া অন্য কারও পক্ষে টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া কেনাকাটায় ‘ভাংতি’ বা খুচরা টাকার যে নিত্যদিনের ঝামেলা ছিল, এমএফএস পেমেন্ট সেটির নিখুঁত সমাধান দিয়েছে। বিল ১০০ টাকা ৫ পয়সা হলে ঠিক ততটুকুই ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে পরিশোধ করা যাচ্ছে।

আগামীর ক্যাশলেস বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি সহায়তা এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর নিত্যনতুন সেবার কারণে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। নাগরিকদের জীবনে নগদ টাকার ব্যবহার কমে আসার এই চিত্র প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ এখন প্রযুক্তিকে শুধু গ্রহণই করেনি, দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নিয়েছে। এভাবেই নগদ টাকাবিহীন বা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই চিত্র ফুটে উঠেছে ডিজিটাল লেনদেনে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি দেশের কার্ডভিত্তিক (এটিএম, পস, ই-কমার্স ও সিআরএম) লেনদেনের প্রবৃদ্ধিও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।