আইএমএফের কাছে গত জুলাইয়ে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণ নিয়ে আলোচনা করতেই সংস্থার দলটি এখন ঢাকায়। গতকালের বৈঠকে অর্থ বিভাগের তিন অতিরিক্ত সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আরফিন আরা বেগম এবং সিরাজুন নূর চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দল অংশ নেয়।

লোকসানি সংস্থাগুলোকে ঘাড় থেকে নামানোর দরকার। পরিচালনা পর্ষদে সরকারি কিছু লোক বসে সুবিধা ভোগ করেন, এ ছাড়া এগুলোর কোনো দরকারই নেই।
আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ ।

আইএমএফকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখন একটা ক্রান্তিকাল চলছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছে আগামী ২০২৬ সালে। এর আগে ভর্তুকির বিষয়ে বড় ধরনের সংস্কারে হাত দেওয়া মুশকিল। আইএমএফ তারপরও বলেছে, সরকার যাতে ২০২৩ সালের মধ্যে এ ব্যাপারে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।

সফররত দলটি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত খরচের প্রবণতা জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে জ্বালানি তেলসহ বিদ্যুৎ, সার ও গ্যাসে দেওয়া ভর্তুকি ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে।

সূত্র জানায়, অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের ভর্তুকি কমাতে হলে দাম বাড়াতে হবে। গত আগস্টে এক দফা দাম বাড়ানো হয়েছে এ–বিষয়ক একটি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। বিদ্যুতের বিষয়েও একই ধরনের রেওয়াজ রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ বিষয়ে মূল ভূমিকা পালন করে। জানা গেছে, আলোচ্যসূচিতে থাকলেও আইএমএফের দল সারের ভর্তুকি নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। ভর্তুকির বেশির ভাগই জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের জন্য রাখা। ভর্তুকিকে ‘ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা’ বলে থাকে আইএমএফ। ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় নগদ ঋণ নামে একটি অধ্যায় রয়েছে, যা শেষ বিচারে ভর্তুকিই। এ ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইত্যাদি সংস্থাকে। কিন্তু বিপিসি ও পিডিবি সরকারকে তা ফেরত দেয় না।

বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার জন্য পিডিবিকে ঋণ দেয় সরকার। এ ঋণও ভর্তুকি। কারণ, সরকার তা ফেরত পায় না। আইএমএফের প্রতিনিধিদল এ ব্যাপারে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছে। এসব ঋণ আদায় করার কথা বলে আইএমএফ ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

লোকসানি সংস্থা কবে বেসরকারি হবে

বিদায়ী অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানের লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পিডিবির পাশাপাশি লোকসানি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি), বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)।

সংস্থাগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে আর তা মেটানো হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। সংস্থাগুলোর ২০২১ ও ২০২২ সালের আর্থিক চিত্রের পাশাপাশি ২০২৩ সালের প্রক্ষেপণও আইএমএফের দলের কাছে তুলে ধরা হয়। আইএমএফের প্রতিনিধিদল বলেছে, এ লোকসান কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং ধীরে ধীরে এদের কয়েকটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো হবে।

গতকালের বৈঠকে নতুন শিল্পনীতি এবং রুগ্‌ণ শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপারে সরকারের কাছে হালনাগাদ তথ্যও চেয়েছে আইএমএফ দল।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বিশ্লেষণ

জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় বরাবরই কম বাংলাদেশের। সূত্র জানায়, বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোনো ঝুঁকি বিশ্লেষণ আছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে আইএমএফের দল। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বিশ্লেষণ থাকে বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০২৩-২৬ সময়ের জন্য বাজেটের অর্থায়ন কৌশল প্রণয়ন করা, মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো (এমটিএমএফ) অনুযায়ী অর্থনীতির সূচকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সঙ্গে এমটিএমএফের সমন্বয় সাধন, এমটিএমএফের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সংশ্লেষ, সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ এবং রাজস্ব ঝুঁকি বিষয়ে তথ্য চেয়েছে আইএমএফ।

চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা আছে। এ বরাদ্দ থেকেই রয়েছে স্বাস্থ্য খাত ও শিক্ষা খাতের অংশ। আইএমএফের প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগকে বলেছে, এ দুই খাতের ব্যয়গুলো যাতে যথাযথ হয় এবং যেসব ক্ষেত্রে বৃত্তি বা অনুদানের বিষয় রয়েছে, সেগুলো যাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া হয়। তা ছাড়া প্রকৃত উপকারভোগী যেন সহায়তা পায়।

আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘জ্বালানি খাতে আপাতত পুনর্বিন্যাসের দরকার নেই। তবে বিদ্যুতে দরকার।’ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ালে কি তা আরও বেড়ে যেত না, এমন প্রশ্নের জবাবে আহসান মনসুর বলেন, ‘এখন যে সরকার খরচ মেটাতে পারছে না, তার চেয়ে দাম বৃদ্ধি ভালো। দুটি বিকল্প আছে, “বিদ্যুৎ চাই না, নাকি বেশি দামে চাই।” আমার মনে হয়, অনেকেই বলবেন যে বেশি দামে হলেও বিদ্যুৎ চাই।’

প্রাকৃতিক গ্যাস এত সস্তা দামে রাখা এবং রাসায়নিক সার এত কম দামে রাখারও বিপক্ষে আহসান এইচ মনসুর। বলেন, ‘রাসায়নিক সার এত সস্তা না হলে জৈব সারের একটা বড় বাজার তৈরি হতো। ভর্তুকি কমিয়ে আমাদের সে পথে যেতে হবে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি বিশ্লেষণ নিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘এ–বিষয়ক বিশ্লেষণটা বরাবরই অসম্পূর্ণ। আয় হয় না, তাই ব্যয় কম করে অর্থাৎ কেটেকুটে ভারসাম্য আনা হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ খুবই পারদর্শী।’

লোকসানি সংস্থাগুলোকে নিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বসে না থাকার পরামর্শ দিয়ে আহসান মনসুর বলেন, বোঝাগুলো ঘাড় থেকে নামানো দরকার। পরিচালনা পর্ষদে সরকারি কিছু লোক বসে সুবিধা ভোগ করেন। এ ছাড়া এগুলোর কোনো দরকারই নেই।