ঢাকার বাইরের আবাসনে বাড়ছে মানুষের আগ্রহ যেসব কারণে
একসময় উন্নত আবাসনের কথা উঠলেই চলে আসতো শুধুই ঢাকার কথা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক নানা সুবিধার কারণে রাজধানীকেন্দ্রিক জীবনযাপন বেছে নিতে চাইতেন সবাই।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র কিছুটা বদলাচ্ছে। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও বাড়ছে মানুষের বসবাসের আগ্রহ। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ, জমি ও ফ্ল্যাটের তুলনামূলক কম দাম এবং অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা এ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রাজধানীতে জমি ও ফ্ল্যাটের দামও অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যানজট, পরিবেশদূষণ, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অতিরিক্ত জনঘনত্বও নগরজীবনে চাপ তৈরি করছে। ফলে অনেক পরিবার, বিশেষ করে যাঁরা ঢাকার বাইরে কাজ বা ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরা বিকল্প হিসেবে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে বসবাসের ঠিকানা বানাচ্ছেন।
যোগাযোগ বদলে দিচ্ছে আবাসনের চিত্র
ঢাকার বাইরে আবাসনের সম্ভাবনা তৈরির ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ হয়েছে। বিভিন্ন মহাসড়কের উন্নয়ন, রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং নতুন সড়ক অবকাঠামো তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, সময়ের হিসাবেও কমে এসেছে।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সচিব মনদীপ ঘরাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে আবাসনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এর পেছনে নাগরিক জীবনের বিভিন্ন চাহিদা ও সুযোগ-সুবিধার বিস্তারের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রেলপথ, মহাসড়ক ও নৌপথের উন্নয়নের ফলে ঢাকার বাইরে যাতায়াত সহজ হচ্ছে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র থেকে বাইরে, বিশেষ করে শহরতলি বা সাব-আরবান এলাকাগুলোতে আবাসনের দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ঢাকার বাইরে থাকা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থারও উন্নয়ন হচ্ছে।’
কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার প্রভাব
রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য শহরের আবাসন ব্যয়ের পার্থক্যও মানুষকে ঢাকার বাইরে বসবাসে উৎসাহিত করছে। একই পরিমাণ অর্থে ঢাকায় যে আকারের ফ্ল্যাট পাওয়া যায়, অনেক জেলা বা বিভাগীয় শহরে তুলনামূলক বড় জায়গা পাওয়া সম্ভব। জমির ক্ষেত্রেও চিত্রটা একই। বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, ব্যবসা ও সেবা খাতের কার্যক্রম বাড়ছে। জেলা শহরগুলোর কিছু এলাকাতেও নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হওয়ায় সেসব এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা এবং অনলাইন ব্যবসা, ওয়ার্ক ফ্রম হোম ও ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই ঢাকায় থেকে কাজ করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে তাঁরা ঢাকার দ্রুতগতির জীবনের চেয়ে বেছে নিচ্ছেন ‘স্লো লাইফ’। অন্যদিকে, ঢাকায় থাকলেও গ্রামে বা জেলা শহরে জমি ও সম্পত্তি রয়েছে অনেকের। ফলে অবসরকালীন বা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য সেসব জায়গাকেও নতুন করে বিবেচনা করছেন কেউ কেউ।
আবাসন খাত ঢাকার বাইরে কোন অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে
গত এক দশকে ঢাকার বাইরে অনেক শহরেই আবাসন খাত বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে এমন শহরগুলোতে, যেখানে একদিকে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও রয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর, বরিশালের মতো বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি কুমিল্লা, বগুড়া, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরেও আবাসন প্রকল্পের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে প্রতিটি শহরের সম্ভাবনা এক রকম নয়। কোথাও শিল্প ও ব্যবসার কারণে কোথাও আবার শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রিক কার্যক্রমের কারণে আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় নতুন সড়ক বা রেল যোগাযোগের কারণেও তৈরি হচ্ছে আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
পরিকল্পনা ছাড়া বাড়তে পারে ঝুঁকি
ঢাকার বাইরে আবাসনের সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো, আবাসন–ব্যবস্থা কতটা পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে? ঢাকার অভিজ্ঞতা এখানে বড় একটি শিক্ষা। অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলে পরবর্তী সময়ে জলাবদ্ধতা, যানজট, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কোনো এলাকায় একের পর এক ভবন তৈরি হলেও যদি পর্যাপ্ত সড়ক, ড্রেনেজ, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে সেখানে আবাসন তৈরি হলেও বসবাসের মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নাও থাকতে পারে।
বাংলাদেশে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও আবাসন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে নিচু জমি ভরাট করে আবাসিক এলাকা তৈরি করলে ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ভূমিকম্পের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে।
শুধু আবাসন নয়, তৈরি করতে হবে বসবাসযোগ্য শহর
ঢাকার বাইরে আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধি দেশের নগরায়ণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
মনদীপ ঘরাই বলেন, ‘ঢাকার বাইরে নতুন আবাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু ভবন নির্মাণের দিকে নজর দিলেই হবে না। স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বিদ্যালয়, কর্মস্থল, উপাসনালয়সহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ভবন নির্মাণ করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলাকে আমরা সাফল্য হিসেবে দেখি না। একটি আবাসনকে পূর্ণাঙ্গ করতে হলে সেখানে একটি কার্যকর কমিউনিটি গড়ে ওঠার সুযোগ থাকতে হবে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়—এমন আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাই প্রয়োজন।’
পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে রাজধানীর বাইরে নতুন আবাসনকেন্দ্রগুলো একদিকে মানুষের জন্য বিকল্প বসবাসের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে দেশের নগরায়ণকেও আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে পারে। ঢাকার বাইরে আবাসনের সম্ভাবনা ও নতুন প্রকল্পের খোঁজে আগ্রহ বাড়ায় আবাসন মেলার মতো আয়োজনও হয়ে উঠছে ক্রেতা ও আবাসন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।