দুবার ব্যর্থ চেষ্টা, তৃতীয়বারে সফল স্টার্টআপ ‘জাতিক’
বর্তমানে ‘জাতিক ইজি’ প্ল্যাটফর্মে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ই–কমার্স, এফ–কমার্স ও উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে।
ব্যবসা সহজ ও ডিজিটাল করতে ২০২২ সালে দুই দফায় দুটি উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয়েছিল স্টার্টআপ ‘জাতিক’–এর যাত্রা। উদ্যোগ দুটির নাম ছিল পকেট পে ও ডিজিটাল ক্যালকুলেটর। কিন্তু শুরুর পর দুই বছরে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা লোকসান করে প্রতিষ্ঠানটি। তারপরও দমে যাননি জাতিকের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান মনি। ২০২৪ সালে নতুন উদ্যোগ জাতিক ইজি ও জাতিক প্লাস বাজারে আনেন তিনি। সফলও হয় এ উদ্যোগ।
মূলত ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যবসায়িক সেবা দেয় জাতিক। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, বিপণন, পণ্য মজুতের তথ্য, পণ্য সরবরাহ, গ্রাহকের তথ্য ব্যবস্থাপনাসহ মোট ২৫ ধরনের সেবা দেয় জাতিক। জাতিকের দুই ধরনের সেবা রয়েছে। একটি জাতিক ইজি। এটি মূলত ছোট ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে সেবা দেয়। অন্যটি জাতিক প্লাস, যারা বড় এন্টারপ্রাইজ ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে সেবা দেয়।
যেভাবে শুরু ‘জাতিক’
জাতিকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালে। তিনজন প্রতিষ্ঠাতা থাকলেও মূলত স্টার্টআপটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুলতান মনির হাত ধরেই জাতিকের শুরু। সুলতান মনি জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা দুবাইয়ে। ২০১২ সালে পড়াশোনার জন্য পাড়ি দেন কানাডায়। সে সময় কানাডায় ‘অন গ্রোসারি’ নামে একটি স্টার্টআপ শুরু করেন। ছোট থেকে স্বপ্ন ছিল প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা হওয়ার। তাই উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নেন কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস)। কানাডায় পড়াশোনার সময়ই কার ওয়াশ, ফুড, হেলথ, পণ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতের ১০টির বেশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে তিনটি স্টার্টআপ সফল হয়। ২০২২ সালে কানাডা থেকে দেশে ফেরেন সুলতান মনি।
যেসব সেবা দেয় জাতিক
* জাতিক ইজি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৫০০ টাকায় তাৎক্ষণিক সাব–ডোমেইন ওয়েবসাইট তৈরি করে দেয়। * এ ছাড়া পণ্য মজুতের তথ্য, স্থানীয় পেমেন্ট গেটওয়েসহ মোট ২৫ ধরনের সেবা দেয় জাতিক ইজি। * জাতিকের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাসে বিক্রি হয় ২৬ কোটি টাকার পণ্য।
সুলতান মনি জানান, মূলত দেশের এক ভেঞ্চার ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতার অনুরোধে তিন মাসের জন্য তিনি দেশে আসেন। ফিরতি টিকিটও কাটা ছিল। দেশে এসেছিলেন বাজারের চাহিদা বোঝার জন্য। সে লক্ষ্যে ছোট একটি দল নিয়ে ছুটে বেড়ান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মুদিদোকান ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের কাছে। শুরুতেই তিনি ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার ডিভাইস বা যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেন।
শুরুতে চারজনের একটি দল দিয়ে নিজের গুলশানের বাসায় যাত্রা শুরু হয় জাতিকের। ২০২২ সালের আগস্টে শুরু করেন ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাযন্ত্র ‘পকেট পে’। ওই সময় কানাডার এক অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পায় জাতিক। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি ব্যবসাসফল হয়নি।
আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়ও সেবা দিচ্ছি। বর্তমানে দুবাইয়ে সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে নিবন্ধন করেছে। এ ছাড়া দুটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা চলছে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসার বিনিয়োগে সহায়তা করা হবে।
প্রথম উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৩ সালে দ্বিতীয় উদ্যোগ ‘ডিজিটাল ক্যালকুলেটর’ নিয়ে কাজ শুরু করে জাতিক। দোকানের হিসাব, বিক্রয়, পণ্যের মজুতসহ সব হিসাব এই ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। শুরুতে ভালো সাড়া পায় এই ডিজিটাল ক্যালকুলেটর। ২০ হাজারের বেশি ক্যালকুলেটর বিক্রি করে জাতিক। আরও ৩০ হাজারের ক্রয়াদেশ ছিল। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যায়। এতে ক্যালকুলেটর তৈরির খরচ ৩ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার টাকা। এতে মার খায় দ্বিতীয় উদ্যোগটিও।
শুরু হয় জাতিক ইজি
জাতিকের সিইও সুলতান মনির স্ত্রী মুমতাহিনা আনিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা করতেন। এই ব্যবসা করতে গিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি, আর্থিক লেনদেন, পণ্য সরবরাহ, মজুতসহ নানা ক্ষেত্রে প্রায়ই তাঁকে ঝামেলা পোহাতে হতো। নিজের এসব সমস্যা থেকেই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ই-কমার্স বিল্ডার প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণাটি আসে। সেই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় ‘জাতিক ইজি’।
জাতিক ইজির মাধ্যমে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা চাইলে ৫০০ টাকা খরচে তাৎক্ষণিক একটি সাব–ডোমেইন ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারেন। এ ছাড়া পণ্য মজুতের তথ্য, অর্ডার ট্র্যাক, গ্রাহকের তথ্য ব্যবস্থাপনা, স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল রসিদ, ডেলিভারি স্প্রেডশিট, স্থানীয় পেমেন্ট গেটওয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ততা, বিপণনের সেবাসহ মোট ২৫ ধরনের সেবা দেয় জাতিক ইজি। সবই ওই ৫০০ টাকার মধ্যে।
জাতিকের সিইও সুলতান মনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুর দিকে আমাদের লক্ষ্য ছিল দিনে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন। অর্থাৎ মাসে ৩০টি প্রতিষ্ঠান। তবে শুরুর মাসেই প্রতিদিন গড়ে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। বর্তমানে “জাতিক ইজি” প্ল্যাটফর্মে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ই–কমার্স, এফ (ফেসবুক) কমার্স ও উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত রয়েছে। জাতিকের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তৈরি করা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মাসে ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি ক্রয়াদেশ আসে এসব প্রতিষ্ঠানে। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে এসব প্রতিষ্ঠান জাতিকের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ২৬ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে। প্রতি মাসে গড়ে জাতিকের সেবার আওতায় আট হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত হচ্ছে।’
যেসব সেবা দেয় জাতিক
জাতিকের ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে খুব কম সময়ের মধ্যে ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়। এ ছাড়া ওয়েবসাইটে ডিজিটাল পেমেন্ট মাধ্যম যুক্ত করা যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন কুরিয়ার ও পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যায় জাতিকের সেবার মাধ্যমে। এ ছাড়া মার্কেটিং টুলস হিসেবে এসএমএস, ই–মেইল, ফেসবুক ইন্টিগ্রেশনসহ নানা সেবাও পাওয়া যায় জাতিক ইজিতে নিবন্ধনের মাধ্যমে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য জাতিক চালু করেছে জাতিক একাডেমি। যেখানে উদ্যোক্তাদের জন্য রয়েছে ফ্রি কোর্স, ওয়েবিনার ও ওয়ার্কশপ। বিনিয়োগ ও পণ্য ছাড়াই ব্যবসা শুরু করার জন্য ‘জাতিক ক্যাপিটাল’ নামে আরেকটি সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে জাতিক।
জাতিকের সিইও সুলতান মনি বলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়ও সেবা দিচ্ছি। বর্তমানে দুবাইয়ে সব মিলিয়ে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে নিবন্ধন করেছে। এ ছাড়া দুটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা চলছে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসার বিনিয়োগে সহায়তা করা হবে।’