রেফ্রিজারেটরের বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমবে যেভাবে
বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মধ্যে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজই একমাত্র সরঞ্জাম, যা বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই সচল থাকে। মাসের শেষে দেখা যায় বিদ্যুৎ বিলের একটি বড় অংশই খরচ হয়েছে এই অবিরাম চলতে থাকা যন্ত্রটির পেছনে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিয়ে তাই জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এই সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করছে ‘ইনভার্টার কম্প্রেসর’ প্রযুক্তি। এটি যেমন বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী, তেমনি পরিবেশবান্ধব ও ব্যবহারকারীর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক।
ইনভার্টার কম্প্রেসর যেভাবে সাশ্রয় নিশ্চিত করে
ইনভার্টার কম্প্রেসরের কাজের ধরন বুঝতে হলে আমাদের প্রচলিত বা সাধারণ কম্প্রেসরের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। সাধারণ ফ্রিজের কম্প্রেসর মূলত একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলে এবং এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় ‘অন’ এবং ‘অফ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ফ্রিজের ভেতর যখন কাঙ্ক্ষিত শীতলতা তৈরি হয়, তখন কম্প্রেসরটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আবার তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেই এটি পূর্ণ শক্তিতে পুনরায় চালু হয়। একটি গাড়ি জ্যামে পড়ে বারবার স্টার্ট দিলে যেমন বেশি জ্বালানি অপচয় হয়, ঠিক তেমনি কম্প্রেসর বারবার চালু হওয়ার সময় প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ খরচ করে।
অন্যদিকে ইনভার্টার কম্প্রেসর প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। এই প্রযুক্তির কম্প্রেসর কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এটি ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রার ওঠানামা এবং ভেতরে থাকা খাবারের পরিমাণ বুঝে নিজের গতি কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেয়। যখন ফ্রিজের ভেতরে খুব বেশি ঠান্ডা করার প্রয়োজন থাকে না, তখন কম্প্রেসরটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ইনভার্টার প্রযুক্তির ফ্রিজ সাধারণ ফ্রিজের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম; অর্থাৎ মাসে যদি আগে ৫০০ টাকা বিল আসত, এই প্রযুক্তির ব্যবহারে তা অনায়াসেই ৩০০ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।
বাড়তি সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা
বিদ্যুৎ বিলের বিশাল অঙ্কের সাশ্রয় ছাড়াও এই প্রযুক্তির আরও কিছু বিশেষ গুণ রয়েছে, যা সাধারণ ফ্রিজে পাওয়া সম্ভব নয়। যেহেতু ইনভার্টার কম্প্রেসরটি বারবার চালু বা বন্ধ হওয়ার মতো কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় না, তাই এর ভেতরের যান্ত্রিক যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ কম হয়। ফলে যন্ত্রটি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সহজে নষ্ট হয় না। কোম্পানিগুলোও সাধারণত ইনভার্টার কম্প্রেসরের ওপর দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়ে থাকে।
এ ছাড়া এই ফ্রিজগুলো চলে খুব নীরবে। সাধারণ ফ্রিজের মতো হঠাৎ বিকট শব্দ করে চালু হওয়ার কোনো বালাই নেই। তাপমাত্রার সমতা নিখুঁতভাবে বজায় থাকে বলে ভেতরের ফলমূল, মাছ-মাংস ও শাকসবজি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সতেজ থাকে। যদিও কেনার সময় ইনভার্টার ফ্রিজের দাম সাধারণ ফ্রিজের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে, কিন্তু বছর দেড়েকের বিদ্যুৎ বিলের সাশ্রয় হিসাব করলে দেখা যায়, সেই অতিরিক্ত দামটি অনায়াসেই উঠে এসেছে।
ব্যবহারের সঠিক কৌশল ও সচেতনতা
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ব্যবহারকারীর সঠিক সচেতনতা। ফ্রিজটি ঘরের এমন স্থানে রাখা উচিত, যেখানে সরাসরি রোদ পড়ে না এবং দেয়াল থেকে ৬ থেকে ১০ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় থাকে। এতে কম্প্রেসরের গরম বাতাস সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। খাবার আগে সাধারণ তাপমাত্রায় এনে তারপর রাখা ভালো। অপ্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ দরজা খোলা রাখলে বাইরের গরম বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে, ফলে কম্প্রেসরকে আবার তাপমাত্রা কমাতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফ্রিজের ভেতরে খাবারগুলো সাজিয়ে রাখুন, যাতে ঠান্ডা বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ না হয়। বর্তমানে সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক জীবনযাপনে ইনভার্টার প্রযুক্তি তাই কেবল একটি শৌখিনতা নয়; বরং একটি সচেতন ও বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ।