মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনের মতো অর্থনীতিতেও সংস্কার অপরিহার্য: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনের মতো অর্থনীতিতেও সংস্কার অপরিহার্য: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ক্যাপশন— এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার ও গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিরা। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার পল্টনে ইআরএফ মিলনায়তনেছবি: ইআরএফ

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, মানবদেহে রক্ত সঞ্চালন যেমন অপরিহার্য তেমনি অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতেও সংস্কার অপরিহার্য। সংস্কারকে কখনোই সমাপ্ত বা চূড়ান্ত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। কেউ যদি মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারপ্রক্রিয়াও শেষ হয়ে গেছে, তা হবে ভ্রান্ত ধারণা।

রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আজ বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার ও গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এবং ইআরএফ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। আরও বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ–এর সম্পাদক নূরুল কবীর, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ এবং প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।

অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও ইআরএফের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। সে অনুযায়ী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে সরকারের সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম নজরদারি করবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কার কোনো স্থির বা এককালীন প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি চলমান ও অব্যাহত প্রয়াস। অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে ধারাবাহিকভাবে সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। এই প্রক্রিয়া থেমে গেলে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে চেতনা এল, তার ভেতর দিয়ে সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা আরও বেশি প্রকাশ্যে এসেছে—এমন মন্তব্য করে দেবপ্রিয় বলেন, কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামগ্রিক কাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও সংস্কার অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘সংস্কারের উদ্যোগ বিভিন্ন সময়েই হয়েছে এবং গত সরকারের আমলে আমি মাঝেমধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলতে গিয়ে অন্তরীণ সরকার বলে ফেলেছি। কেউ কেউ আমাকে বলেছে অন্তরীণ সরকার বলেন কেন?’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ যখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তখন সংস্কারের প্রয়োজন পড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এবং সেই সময় পরিত্যক্ত অবস্থা থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতিতে সত্যিকারের সংস্কারক হিসেবে অবশ্যই প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নাম বলতে হবে। তাঁর দুটি সংস্কার ইতিহাসের পাতায় থাকবে। একটি হলো ভ্যাট চালু, আরেকটি মুদ্রার নমনীয় বিনিময় হারের প্রচলন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সংস্কার সব সময় ভালো কিছু দেয়। সেই পথে এগোচ্ছি। আমরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেগুলো নিয়ে কাজ করব। তিনি বলেন, ‘হত্যা, মিথ্যা মামলা, গুমসহ সব ধরনের নির্যাতিত সাংবাদিকেরা যেন প্রতিকার পান, সে জন্য একটা কাঠামো করতে চাচ্ছি। অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের ভাতা দেওয়ার চিন্তাও রয়েছে।’

গণমাধ্যমের সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরির কাজটি বিবেচনাধীন বলে জানান তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সার্কুলেশন নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও সামষ্টিক প্রতারণা বন্ধ করতে হবে।

সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘সরকারের সর্বোচ্চ সমালোচনা বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করুন। সরকার এতে উপকৃত হবে। আগের সরকার থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। খারাপ কাজ করলে কতটা নির্মম এবং অপমানজনক হতে পারে, তা আমাদের চিন্তায় রয়েছে।’

যা বললেন সাংবাদিকেরা

নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘দুই ধরনের সাংবাদিকতা চলছে। একটি হচ্ছে লিপ্ততার, আরেকটি নির্লিপ্ততার। আমাদের বেছে নিতে হবে লিপ্ততার সাংবাদিকতা, যেখানে সব অনিয়ম অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংবাদিকেরা লিখবেন। জাতির সংকটকালে সাংবাদিকদের অ্যাকটিভিজম করার দরকার আছে। তবে নজর রাখতে হবে, সেটা যাতে দলীয়করণ না হয়।’

ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বলেন, ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ২০২৫ সালের মার্চে দিয়েছি। এতটুকু সংস্কারও হয়নি। আমি হতাশ। কারণ, আমি এর অংশ ছিলাম।’

প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, সাইফুর রহমানের পর অর্থমন্ত্রী হিসেবে এলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। তখন যেন একটা প্রতিযোগিতা ছিল অর্থাৎ কে, কার চেয়ে বেশি সংস্কার করতে পারেন।