ভালো বীজ ব্যবহারে এক দশকে সবজি উৎপাদন বেড়েছে ১ কোটি টন

  • ভালো বীজ ব্যবহার করলে উৎপাদন প্রায় ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

  • দেশে বছরে বীজের চাহিদা ৩,০৬০ টন। এর মধ্যে সরকারি সংস্থা ১১৪ টন ও বেসরকারি কোম্পানি ২,৪৮৫ টন সরবরাহ করে। কৃষকেরা তৈরি করেন ৪৬১ টন।

  • নিম্নমানের বীজ আমদানি হওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন।

  • বিশ্বে বছরে সবজি উৎপাদন হয় ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি টন।

একসময় দেশের বাজারে শুধু শীত মৌসুমেই শিম, টমেটো, লাউ ও মিষ্টিকুমড়ার মতো সবিজগুলো পাওয়া যেত। এখন কিন্তু সারা বছরই লাউ, শসা, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, লালশাক, পালংশাক ও পুঁইশাক এসব শাকসবজি মিলছে। শাকসবজি কেবল বারো মাস উৎপাদনই হচ্ছে না, ফলনের পরিমাণও বেড়েছে। গত এক দশকে শাকসবজি উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১ কোটি টন, যা ভোক্তাদের সুষম খাদ্য গ্রহণ ও খাদ্য নিরাপত্তায় শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলছে। এ ক্ষেত্রে উন্নত জাতের বীজ মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বলে অভিমত কৃষিবিশেষজ্ঞদের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এক দশক আগে ২০১৫–১৬ অর্থবছরে দেশে মোট সবজির উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৫২ লাখ টন। তা পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২০–২১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টন। পরের ৫ বছরে সবজি উৎপাদন আরও ৫৩ লাখ টন বাড়ে। বদৌলতে সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে সবজি উৎপাদন ২ কোটি ৫০ লাখ বা আড়াই লাখ টনে উন্নীত হয়। অর্থাৎ গত এক দশকে শাকসবজি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১ কোটি টন।

বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে ভোক্তাদের মধ্যে সবজি খাওয়ার আগ্রহ ও সচেতনতা বেড়েছে, অন্যদিকে কৃষকেরাও মোটামুটি ভালো দাম পাওয়ায় আবাদ বাড়িয়ে চলেছেন। তাঁরা দেশি–বিদেশি নতুন নতুন জাতের বীজ ব্যবহার করার ফলে সবজির ফলন গত দুই দশকে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ নিয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি করা অনেক জাতের সবজিবীজ আমাদের দেশে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। তাই এখন সারা বছর সবজি পাওয়া যাচ্ছে। তরুণেরাও বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ জন্য ঋণও পাওয়া যাচ্ছে। প্রচুর বিনিয়োগ আসছে। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ বেড়েছে। অবার উৎপাদিত সবজির দামও ভালো।এগুলো আমাদের অনেক বড় অর্জন।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সবজিবীজের বার্ষিক চাহিদা ৩ হাজার ৬০ টন। এর মধ্যে শীতকালে ১ হাজার ৭২৩ টন, আর গ্রীষ্মে ১ হাজার ৩৩৭ টনের চাহিদা থাকে। কিন্তু মোট চাহিদার বিপরীতে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ সরবরাহ করা হয় মাত্র ১১৪ টন। বেসরকারি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করে ২ হাজার ৪৮৫ টন। অর্থাৎ সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ বীজ সরবরাহ করে থাকে। বাকি ১৫ শতাংশ বা ৪৬১ টন বীজ কৃষকেরা নিজেদের ফলন থেকে সংগ্রহ করে থাকেন।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে বীজের বাজারের আকার আনুমানিক ৩ হাজার কোটি টাকার। যদিও একেক জাতের বীজ একেক দামের হওয়ায় এটার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন বলে জানান বীজ ব্যবসায়ীরা।

দেশে সবজিবীজের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে লালতীর, সুপ্রিম, এসিআই, মেটাল, মাসুদ, এআর মালিক, ইউনাইটেড, ব্র্যাক সীড, ইস্পাহানি ও জামালপুর সীড। আরও আছে জাপানি–তাকি–সাকাতা। এই প্রতিষ্ঠাগুলোর দখলেই রয়েছে সবজিবীজের বাজারের প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ।

দেশে সবজিবীজ সরবরাহে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত বেসরকারি খাতের লালতীর। এটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। কোম্পানিটি ২০২১ সালে ‘অ্যাকসেস টু সিড ইনডেক্স’–এ সপ্তম স্থান পায়, যা ছিল দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের প্রথম স্বীকৃতি। সবজির বাজারে প্রতিষ্ঠানটির হিস্যা এখন প্রায় ৩০ শতাংশ। ৩৫টি সবজির প্রায় ২১৬টি জাত সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে লালতীর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বীজ রপ্তানি করে।

জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আওয়াল মিন্টু প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেকোনো ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান উপাদান বীজ। যতই সার–কীটনাশক আর শ্রমের জন্য ব্যয় করা হোক, ভালো বীজ ছাড়া কিন্তু উৎপাদন বাড়বে না।’

বীজ ব্যবসা শুরুর স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘আগে বিদেশে গিয়ে দেখতাম তাদের সবজি সুন্দর আকৃতির। আমাদের সবজি থাকত বাঁকা ও পোকায় খাওয়া। পরে আমরা সবজি নিয়ে কাজ শুরু করি।’ তিনি বলেন, ‘দেশে ২০০০ সালে মাথাপিছু সবজি গ্রহণের হার ছিল মাত্র ৭০ গ্রাম। এখন তা বেড়ে ১৭০ গ্রামে পৌঁছেছে। তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মানদণ্ডে এটা একজন মানুষের জন্য ২৫০ গ্রাম হতে হবে। আশা করছি, আগামী কয়েক বছরে আমরা সে অবস্থানে চলে যাব।’

আন্তর্জাতিক খাদ্য এবং কৃষি ব্যবসা ব্যবস্থাপনা সমিতির (আইএফএএমএ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০–এর দশকে দেশে সবজির বীজে বেসরকারি খাতের অবদান ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। এখন ১৫০টির বেশি বীজ কোম্পানি এবং ১৭ হাজারের বেশি বীজ ডিলার রয়েছে। আর বীজের বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ হিস্যা এখন বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হাতে।

দেশে বীজের বাজারে আরেক বড় প্রতিষ্ঠান এসিআই সীড। ১৯৯৮ সালে বীজের ব্যবসা শুরু করেছিল তারা। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১৩টি ফসলের ৪০টি হাইব্রিড জাত অবমুক্ত করেছে। আরও প্রায় ২৫টি জাত অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির অ্যাগ্রিবিজনেসেস বিভাগের প্রেসিডেন্ট এফ এইচ আনসারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের লাউবীজ সারা বছর চাষ করা যাচ্ছে। লাউবীজের ৪০ শতাংশ হিস্যা আমাদের। আমরা শীতকালীন সবজি মিষ্টিকুমড়া থেকে গ্রীষ্মকালে আবাদের উপযোগী বীজ উদ্ভাবন করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বে বীজের প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে চাই আমরা। আমাদের বীজ এখন শ্রীলঙ্কা ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হচ্ছে।’

বীজের বাজারে আরেক পরিচিত নাম সুপ্রীম সীড কোম্পানি লিমিটেড। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। প্রতিষ্ঠানটি এখন ৩০টি সবজির ১৫০টি জাত নিয়ে কাজ করছে। তাদের জনপ্রিয়তা পাওয়া জাতের মধ্যে রয়েছে টপ লেডি পেঁপে, সুলতান পেঁয়াজ, অসিম ঝিঙে, গ্রিন ম্যাজিক লাউ ও থান্ডারবল মিষ্টিকুমড়া।

সুপ্রীম সীড কোম্পানির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোহা. মাহতাব উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবজিবীজের বাজারে সেরা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমরা একটি। আমাদের ক্যাপসিকাম ও ব্রকলি বীজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ বছর আমরা বিট রুট, চেরি টমেটো ও চায়নিজ ক্যাবেজের বীজ বাজারে ছাড়তে যাচ্ছি।’

সবজির উৎপাদন বাড়লেও কাঁচা পণ্য হওয়ায় এটির বাজার নিয়ে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে সবজির বাজারের আকার এখন প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার।

শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই সবজির উৎপাদন বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী সবজি উৎপাদন হয়েছিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন বা ১২০ কোটি টন, যা ২০১০ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। আর ২০২৩ সালে সবজির মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় টমেটো, যার পরিমাণ ছিল ১৯২ মিলিয়ন টন। তারপর সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়েছিল পেঁয়াজ, শসা, বাঁধাকপি ও বেগুন।

দেশে স্বাধীনতার আগে থেকেই জাপান, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস থেকে বীজ আমদানি ও সরবরাহ করছে এআর মালিক সীডস ইভেট লিমিটেড। এখন তারা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করছে। দিনাজপুরে গড়ে তুলেছে নিজস্ব গবেষণাকেন্দ্রও।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউস সোপান মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ২৬টি সবজির প্রায় ১৩৫টি জাতের বীজ রয়েছে। হাইবব্রিড বীজের বাজারে আমাদের বাজার হিস্যা প্রায় ১০ শতাংশ। তবে এ বছর আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।’

এদিকে বিজ্ঞানীরা অভিযোগ তুলেছেন, বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে ভালো জাতের বীজের পাশাপাশি কিছু নিম্নমানের বীজও দেশে প্রবেশ করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সবজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় ৩০ শতাংশ বীজ এখনো আমদানি করা হয়। যেখানে ভালো মানের বীজের পাশাপাশি কিছু বীজের সঙ্গে অনেক রোগবালাইও প্রবেশ করছে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় এ ধরনের বীজের কারণে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েন।’

সার্বিকভাবে বাংলাদেশ সীড অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০০ সালের আগে দেশে বীজের বাজার কৃষক ও আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর পর থেকে আমদানিকারকেরা প্রযুক্তি রপ্ত করে উৎপাদনে গেছে। দেশেই এখন অনেক জাত উদ্ভাবন হচ্ছে। ফলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসাও সীমিত হয়ে পড়েছে। একসময় হাইব্রিড জাতের বীজ শতভাগ আমদানি হতো। এখন দেশে প্রায় ৫০ ভাগ উৎপাদিত হচ্ছে। ভালো বীজ ব্যবহার করলে উৎপাদন প্রায় ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।