সিএনজিচালিত অটোরিকশামালিকদের সংগঠন ঢাকা মেট্রোপলিটন সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী–মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় অটোরিকশার ভিন্ন ভিন্ন রং থাকে। অথচ ঢাকা মহানগরে নানা রঙের অটোরিকশা চলতে দেখা যায়। এ ছাড়া ঢাকায় ১৩ হাজারের কিছু বেশি অটোরিকশার চলাচলের অনুমোদন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে চলছে তার চেয়ে অনেক বেশি।

মাসোহারার বিনিময়ে কিছু পুলিশ সদস্য অবৈধ অটোরিকশা চলতে দিচ্ছেন, এমন অভিযোগ করে সিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে অভিযোগ জানানো হলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, ঢাকা নগরে ২০১৩ সালে শেষবারের মতো সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়, সরকারিভাবে যা অনুমোদন পায় ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে।

সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘দুই বছর অন্তর ভাড়া ও জমার হার সমন্বয় হওয়ার কথা থাকলেও বিআরটিএ তা করে না। এদিকে সিএনজির যন্ত্রাংশের দাম ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তা সত্ত্বেও কোনো মালিক যদি অতিরিক্ত জমা নেন, তাহলে আমরাই তাঁর লাইসেন্স ও রুট পারমিট বাতিল করার সুপারিশ করব।’

সিএনজিচালিত অটোরিকশা খাত নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে আরও অনেকের কাছ থেকে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি ও ভোক্তা কণ্ঠের সম্পাদক আবদুল হান্নান বলেন, এই পরিবহন খাত এখন পুলিশ ও বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বাড়তি আয়ের পথ হয়ে উঠেছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

আবদুল হান্নান আরও বলেন, পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের অনেকের পরিবার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রাস্তায় গাড়ি ধরার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, একই অপরাধে কোনো গাড়িকে আটকে রাখা হচ্ছে, আবার অন্য গাড়িকে তদবিরের জোরে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের বৈষম্য বন্ধ না হলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মনির হোসেন বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন অনেক অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। ৯৯৯–এ অভিযোগ আসে, তার প্রতিকার করা হয়। প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা সিএনজিচালিত অটোরিকশা আটক করা হয়। আমরা নিজেদের জায়গা থেকে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

বিআরটিএ কেন ১০ বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করছে না, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিআরটিএর সঙ্গে কথা বলব। এ ছাড়া মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের অনুমোদন দেওয়া হলেও কেন নতুন সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো গণপরিবহনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না, সেটাও দেখার বিষয়।’

সফিকুজ্জামান বলেন, এই সেবার সঙ্গে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সুতরাং সবার দিক দেখতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তার অধিকার সংরক্ষিত হচ্ছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সহকারী পরিচালক ত্রিনয়ন রায় বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নতুন করে নির্ধারণের কাজ চলছে। ঢাকায় আরও এ ধরনের অটোরিকশা চলা উচিত বলেও তিনি মনে করেন। তবে এসব সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিআরটিএ যখন ভাড়া নির্ধারণ করে, তখন সেটা মালিক–শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে করে। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের অংশগ্রহণ থাকে না। যাত্রীরা অটোরিকশায় হয়রানির শিকার হলে পুলিশকে জানালে পুলিশ চালককে জরিমানা করে, কিন্তু তাতে যাত্রীর লাভ হয় না।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি বরাদ্দ না দেওয়া এবং মিটার প্রথা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ অটোরিকশা হালকা যান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা হলে চালকদের আইনের আওতায় আনা হয়, কিন্তু মালিকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। মালিকেরা যেন চালকদের হয়রানি করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা আরও বলেন, ঢাকায় যেসব অটোরিকশা অনুমোদন ছাড়া চলাচল করছে, সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া উচিত। তা না হলে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বাড়বে বলে তাঁরা মনে করেন।

অনুষ্ঠানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।