সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যে কারণে অর্থনীতির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন খাতে আলাদা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাধান পাওয়া যাবে না, বরং হিতে বিপরীতও হতে পারে। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে নীতি সংস্কারের যেসব পরামর্শ দিয়ে থাকে, সেগুলোও অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। যেমন হঠাৎ করে এখন ডলারের দাম বাজারের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে দিলে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা বলা কঠিন।

এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে না থাকতে পারে। আবার আমদানির এলসি খোলার ব্যাপারে কোনো অগ্রাধিকারের পরিষ্কার ঘোষিত নীতি না থাকার জন্য ব্যাংকগুলোতে ডলার কেনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে ধরনের চেষ্টা-তদবির ও কাড়াকাড়ি চলছে, তা প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে ভালো ব্যবহার নিশ্চিত করছে না। যেসব উৎপাদন উপকরণ থেকে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়, সেগুলোর আমদানিই বেশি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সেগুলো যে শুধু রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের কাঁচামাল হতে হবে এমন কথা নেই। কারণ, দেশের রপ্তানি-বিকল্প পণ্যের উৎপাদন সরাসরি রপ্তানির মতোই বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করে।

বাংলাদেশ ২০০২ সালে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে টাকাকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে অবাধে বিনিময়যোগ্যতার ক্ষেত্রে আইএমএফের সমর্থিত নীতি গ্রহণ করে, যা অর্থনীতির উদারকরণের একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল বলা চলে। এই নীতি অনুযায়ী ডলারের বাজার দামে যেকোনো ব্যবসায়ী যত ইচ্ছা আমদানি করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছেড়ে বা তুলে নিয়ে টাকা-ডলারের বিনিময় হার কেবল পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

এযাবৎ এভাবেই চলছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বাজারে ডলার বিক্রি করে ডলারের বাজার দাম ধরে রাখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কিছুটা আগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং কিছুটা ডলারের দামের সমন্বয়ের একটা মাঝামাঝি পথ হয়তো সাময়িকভাবে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজ বিবেচনা অনুযায়ী স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজার পরিবীক্ষণের দক্ষতা প্রয়োজন।

এ ছাড়া আইএমএফ এখনই সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার প্রস্তাব করবে তাতে সন্দেহ নেই। তবে মনে রাখা দরকার যে ১৯৯৮ সালের পূর্ব এশিয়ার আর্থিক বিপর্যয়ের সময় একমাত্র মালয়েশিয়া আইএমএফের পরামর্শ উপেক্ষা করে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে পুনঃপ্রবর্তন করেছিল এবং ওই বিপর্যয় থেকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উঠে এসেছিল। অবশ্য সেটা ছিল মূলত বৈদেশিক লেনদেনের মূলধনি হিসাব নিয়ে।

সুদের হার নিয়েও বড় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের উচ্চ সীমা ধরে রাখতে চায় দৃশ্যত ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা রাখার স্বার্থে, তবে সম্ভবত প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ীদের চাপে। এটা ঠিক যে সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে খুব কাজে আসবে না, কিন্তু আমানতের ওপর কম সুদ ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে অনুৎপাদনশীল ব্যয় উৎসাহিত করে।

এ ছাড়া ঋণের সুদের উচ্চ সীমা চাহিদার তুলনায় বাড়তে না দিলে প্রভাবশালীরা বেশির ভাগ ঋণ নিয়ে নেবে এবং অন্য ব্যবসায়ীরা অপেক্ষাকৃত বেশি উৎপাদনশীল প্রকল্পের জন্যও ঋণ পাবে না। এর ফলে ঋণের সর্বোচ্চ ভালো ব্যবহার হবে না। এটাই সুদের হার বাজারভিত্তিক উদারীকরণের পেছনে আইএমএফের যুক্তি এবং অর্থনৈতিক তত্ত্বও তা সমর্থন করে।

কিন্তু আমাদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত আর্থিক খাতের অন্য একটি সমস্যা এখানে বিবেচনা করা হয় না। যেসব প্রভাবশালী বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আগে থেকেই খেলাপি হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঋণ নেয় এবং জানে যে এ ঋণ শোধ করতে হলেও অনেক বার ঋণ শোধের মেয়াদ বাড়ানো যাবে এবং সুদ মওকুফ পাওয়া যাবে, তাদের কাছে ঋণের সুদ কত তা আসে যায় না; কাজেই উচ্চ সুদের হারে ঋণ নিতে তাদের উৎসাহই বেশি থাকবে।

এ রকম অবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার ঝুঁকি আছে, তবে বিশেষত বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় সুদের এ হার আরও বাড়িয়ে দেওয়ারও যথেষ্ট যুক্তি আছে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা